আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির খবরে গত তিন মাসের মধ্যে তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির ফলে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর খবরে বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
সোমবার (১৫ মে) বৈশ্বিক তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪.৬% কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৩.৩২ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে মার্কিন ক্রুডের দাম ৫% কমে ৮০.৬০ ডলারে নেমেছে, যা মার্চের শুরুর দিকের পর সর্বনিম্ন। গত এক সপ্তাহে উভয়ের দামই ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০ ডলার কমেছে।
তবে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আগে দামের তুলনায় অপরিশোধিত তেলের দাম এখনও ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০ ডলার বেশি রয়েছে। অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে বলে।
বিশ্লেষকরা হরমুজ প্রণালীকে মাইনমুক্ত করা, জাহাজগুলোকে অবাধে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদন পুনরায় চালু করলে জ্বালানি তেলের দাম আরও কমে আসবে। অন্যদিকে জরুরি পেট্রোলিয়াম মজুদ পুনরায় পূরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি স্থাপনাগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের ওপর জোর দিয়েছেন।
তেল বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম আরও বেশ কিছুদিন ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। যদিও প্রাথমিকভাবে দাম কমতে পারে, তবে চাহিদা আবার বাড়লে জরুরি মজুত পুনরায় পূরণ হলে দাম আবার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ট্রাম্প এবং ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়েই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। ট্রাম্প আরও বলেছেন, হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণ করতে হবে, যেখান দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হতো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি হরমুজ প্রণালী টোলমুক্তভাবে খোলার অনুমোদন দিয়েছেন। ইরানের সংসদের একজন সদস্যের মতে, জাহাজ চলাচলের জন্য গড়ে প্রায় ২০ লাখ ডলার চার্জ করা হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর কী হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বার্তা রয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জব্দ করা বিলিয়ন ডলারের তহবিল ছাড় করার পরেই কেবল ৬০ দিনের পারমাণবিক আলোচনা শুরু হবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা ইরানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও তেল প্রবাহ পুনরায় শুরু হতে সময় লাগবে। যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের তেল কূপগুলো মূলত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং পুনরায় চালু হলে উৎপাদন বাড়াতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট প্রযুক্তিগত বিঘ্নের ফলে কূপগুলো হয়তো যুদ্ধ-পূর্ববর্তী উৎপাদন পর্যায়ে ফিরতে সময় লাগবে।
র্যাপিডান এনার্জির প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি রবিবার এবিসি-র ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে বলেন, যদি এই বিঘ্ন দীর্ঘায়িত হয় এবং মার্কিন কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের মতো সংকট-প্রতিরোধকগুলো নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম আবার বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, আমি খুবই উদ্বিগ্ন, এই গ্রীষ্মের শেষের দিকে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে, যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের মাঝামাঝি থেকে উচ্চ পরিসরে চলে যাবে এবং গ্যাসোলিনের পাম্প মূল্য প্রতি গ্যালন প্রায় ৫ ডলারের সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে ফিরে আসবে।
আমেরিকান অ্যাকাউন্টিং অ্যাসোসিয়শেন তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় মূল্য প্রতি গ্যালন ৪.০৭ ডলারে স্থির হয়েছে। গ্যাসের দাম টানা তিন সপ্তাহ ধরে কমেছে, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় এখনও প্রায় ৩৬.৬% বেশি। এদিকে, স্টক ফিউচার বেড়েছে। ডাও ফিউচার ০.৯% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে এসএন্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক ফিউচার যথাক্রমে ১.২% এবং ২% বেড়েছে। এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ার বাজারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকরা একটি নোটে লিখেছেন, ১০৭ দিন এবং আপাতদৃষ্টিতে অন্তহীন সংখ্যক মিথ্যা আশার পর, অবশেষে যুদ্ধ শেষ করতে এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি হওয়ায় আজ সকালেও বাজারে সেই উচ্ছ্বাস বজায় রয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই শান্তি যেনো টেকসই হয় তা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক চুক্তির পর ‘কঠিন আলোচনা’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: সিএনএন।
কিউএনবি/অনিমা/১৪.০৬.২০২৬/বিকাল ৩:৫৮