বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪২ অপরাহ্ন

রুশবাহিনীতে যুদ্ধে থাকা ১২ বাংলাদেশী নিহত

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
  • ৪৬ Time View

ডেস্কনিউজঃ রাশিয়ায় বৈধভাবে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া ৩০ জন বাংলাদেশী শ্রমিক রুশ সেনাবাহিনীর ফাঁদে পড়ে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। একই হামলায় আরো চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে তারা সেনা হেফাজতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে বাকি ১৪ জনের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

একজন শ্রমিকের স্বজন দাবি করেছেন, ড্রোন হামলায় মোট ২৬ জন নিহত হয়েছেন এবং মাত্র চারজন জীবিত রয়েছেন। জীবিতদের একজন রাজবাড়ীর আলী হোসেন সোহেল। গুরুতর আহত চার শ্রমিকের একজন স্বজনদের কাছে পাঠানো ভিডিওবার্তায় বাংলাদেশ সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং দ্রুত উদ্ধার না করা হলে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ওই ভিডিওবার্তা প্রকাশের পর জিম্মি শ্রমিকদের পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়।

একটি অডিওবার্তায় আহত শ্রমিক হান্নান নামে পরিচয় দিয়ে বলেন, তার বাড়ি জামালপুরে। তিনি জানান, তাদের প্রথম দলে পাঁচজন এসেছিলেন, যার মধ্যে এখন মাত্র চারজন জীবিত আছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমরা বেঁচে আছি। অনেকে মারা গেছেন। আরিফ, পাটোয়ারী, সাঈদ মোল্লা, ওয়াসিম আকরাম, জামালপুরের মফিজ, সোহেল ভাই, পবিত্র দা, সাব্বিরসহ আরো অনেকের মৃত্যু হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, ১৬ জনের একটি দলকে তিন থেকে চার দিনের ব্যবধানে কয়েক ধাপে যুদ্ধক্ষেত্রে নেয়া হয়েছিল। বর্তমানে জীবিত রয়েছেন মাত্র চারজন– পলাশ, আরমান, রাজবাড়ীর আলী হোসেন সোহেল এবং চাঁদপুরের মঈন উদ্দিন। হান্নানের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার পর রুশ সেনারা তাদের চার থেকে পাঁচ দিন একটি ভূগর্ভের বাংকারে আটকে রাখে। এ সময় তাদের খাবার দেয়া হয়নি এবং প্রতিনিয়ত নির্যাতন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা খুবই খারাপ অবস্থায় আছি। আমাদের কথা সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করুন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরাও বাঁচব না।’

অডিওবার্তায় তিনি আরো জানান, ড্রোন হামলায় আহত মঈন উদ্দিনের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। বর্তমানে তারা সেনা হেফাজতে রয়েছেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা পেলেও কোথায় নেয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে কিছুই জানেন না।

এ দিকে ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় বাংলাদেশী শ্রমিক নিহত হওয়ার খবরের বিষয়ে জানতে গতকাল শনিবার মস্কোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কিছু শ্রমিক নিহত হওয়ার খবর আমিও শুনেছি। তবে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাইনি।’

তিনি জানান, সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশী ও রুশ নাগরিকদের সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধানী দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। তবে তারা এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারেনি। আগামী মঙ্গলবার আরো একটি দল সেখানে যাবে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রকৃত পরিস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, যে এলাকায় যুদ্ধ চলছে, সেখানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা খুবই কঠিন। যদি কেউ নিহত হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের লাশ শনাক্ত করতেও তিন মাস থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া শ্রমিকরা কিভাবে রুশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে গেলেন– এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, তার কাছে আসা তথ্যানুযায়ী শ্রমিকরা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর একটি ড্রোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং প্রতিষ্ঠানটির সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। তিনি দাবি করেন, ওই চুক্তির অংশ হিসেবে প্রত্যেকে প্রায় তিন লাখ রুবল গ্রহণ করেছিলেন।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমি দূতাবাস থেকে এসব শ্রমিকের রাশিয়া যাত্রার জন্য কোনো অনুমোদন দেয়নি। কিভাবে তারা ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং রাশিয়ায় এসেছেন, সেই প্রশ্ন আমারও রয়েছে।

রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, রাশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, বেতন, কর্মপরিবেশ এবং ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করেই বিদেশে কর্মী পাঠানো উচিত। এ ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সি ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

এ দিকে একজন জনশক্তি রফতানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ৩০ শ্রমিক রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকেই রুশ সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিরা তাদের গ্রহণ করে। পরে নির্মাণকাজে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে একটি ড্রোন সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়।

অন্য দিকে আরেকজন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম শাখার তদারকির ঘাটতি ছিল। একই সাথে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া শ্রমিকদের বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়ার বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জড়িত কিছু ব্যক্তি ও মধ্যস্থতাকারীর কৌশলী প্রতারণার কারণেও শ্রমিকরা বিপদের মুখে পড়েছেন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর মধ্যে আরো কঠোর সমন্বয় ও নজরদারি প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, প্রতারণার মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশী যুবককে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

গত ১ জুন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নির্দেশে আর এস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮), জাবাল-ই-নূর (আরএল-২৫০৫) এবং টিএস ওভারসিজ লিমিটেডের (আরএল-১৭৫৫) লাইসেন্স বাতিল এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, দেশের নাগরিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা চক্রকে ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি আরো জানান, আটকে পড়া শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কিউএনবি/বিপুল/১৪.০৬.২০২৬/দুপুর ১.৩২

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit