বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ন

ইরানে স্থল আগ্রাসন চালাতে কয় হাজার সেনা মোতায়েন করল যুক্তরাষ্ট্র?

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬
  • ৩২ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের খারগ দ্বীপে স্থল আগ্রাসনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে তেহরানে আক্রমণ শুরু করার পর থেকে ৩২ দিন ধরে আকাশপথে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। এতে আশানুরুপ ক্ষয়ক্ষতি করতে না পেরে এবার স্থল হামলা করতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।

গত সপ্তাহে পশ্চিম এশিয়ায় আড়াই হাজার মেরিনসহ প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।  এতে ওই অঞ্চলে সেনাসংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটি একটি স্পষ্ট সংকেত যে, ইরানে মার্কিন যুদ্ধ এখন অন্যান্য আমেরিকান সামরিক হস্তক্ষেপের পথেই হাঁটছে এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগন আরও ১০ হাজার পদাতিক সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।

সাধারণত পশ্চিম এশিয়া জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ হাজার সৈন্য মোতায়েন থাকে; যার মধ্যে ওই অঞ্চলের যুদ্ধজাহাজের নাবিক এবং কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়া ও জর্ডানের বিমান ঘাঁটিতে থাকা সেনারা অন্তর্ভুক্ত। ইরাক এবং আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই ও অস্থিরতার স্মৃতি উল্লেখ করে সমালোচক-বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে একটি ‘অশুভ লক্ষণ’ হিসেবে দেখছেন। এসবই ছিল সেই ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ যেগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনও যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্পের ভাবনার মাঝেই ঘনিয়ে আসছে স্থল আগ্রাসন

ট্রাম্প যখন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থল হামলার কথা ভাবছেন, ঠিক তখনই গত এক সপ্তাহে মার্কিন সেনা মোতায়েন বহুগুণ বড়েছে। এর কারণটি এখনও অস্পষ্ট; এটি হতে পারে খারগ দ্বীপ এবং এর তেলের মজুদ রক্ষা করা, অথবা ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ (যা দিয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস, ২০২৫ সালের জুনে ফোরদো স্থাপনায় বোমাবর্ষণের পর থেকে এই ইউরেনিয়ামগুলো ‘নিখোঁজ’ রয়েছে।

বর্তমান ও সাবেক সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তৃতীয় একটি কারণ হতে পারে ইরানের দক্ষিণ উপকূল বরাবর সেনা মোতায়েন করা, যাতে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ভাঙা যায়। উল্লেখ্য, বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এর লক্ষ্য হতে পারে ট্যাঙ্কার চলাচলকে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।

আর এসব কারণের নেপথ্যে রয়েছে রেজিম চেঞ্জ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সেই পুরনো ভূত, যা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব আগে থেকেই কথা বলছে। আর এটি বাস্তবায়ন করতে হলে নিশ্চিতভাবেই সরাসরি ময়দানে পদাতিক সেনার প্রয়োজন হবে।

যেভাবেই দেখা হোক না কেন, এটি স্পষ্ট যে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই আমেরিকান সামরিক তৎপরতা—যা ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে বড় বলে মনে করা হচ্ছে—ইঙ্গিত দেয় যে এই যুদ্ধ শেষ হওয়া থেকে এখনও অনেক দূরে। 

অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে ধীরগতির শান্তি আলোচনাকেও ইরান প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে।

উপসাগরীয় যুদ্ধক্ষেত্রে এআরজি, মেরিন ও প্যারাট্রুপারদের ঢল

সেনা মোতায়েনের সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে গত শনিবার; মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক্সে জানিয়েছে যে, ইউএসএস ত্রিপোলি ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সাড়ে তিন সহস্রাধিক নাবিক ও মেরিন সেনা নিয়ে সেখানে পৌঁছেছে।

ইউএসএস ত্রিপোলি হলো এলিট এআরজি বা অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপের অংশ, যাকে মনে করা হয় ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা সবচেয়ে বহুমুখী, নমনীয় এবং শক্তিশালী গ্লোবাল রেসপন্স ফোর্স’। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্স’-এর অংশ হিসেবে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ২ হাজার প্যারাট্রুপারকে পশ্চিম এশিয়ায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। 

রয়টার্সের তথ্যমতে, এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আরও কয়েক হাজার (১ হাজার থেকে ৪ হাজারের মধ্যে) সেনাকে যাত্রার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পেন্টাগন কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তাদের অবস্থান অত্যন্ত গোপনীয়; তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে তারা বলেছেন যে, এই বাহিনী ইরানের ‘খারগ দ্বীপে আঘাত হানার দূরত্বের’ মধ্যেই অবস্থান করবে। এর চার দিন আগে, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের অংশ হিসেবে আড়াই হাজার মেরিন ও নাবিকসহ ইউএসএস বক্সার রওনা হয়েছে এবং বর্তমানে পথে রয়েছে।

ইউএসএস বক্সার একইসঙ্গে এফ-৩৫বি স্টিলথ ফাইটারের বাহক হিসেবেও কাজ করে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ বিলিয়ন ডলারের ফ্ল্যাগশিপ এবং এ যাবৎকালের সবচেয়ে উন্নত রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড বর্তমানে অকেজো হয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানায়, রণতরীটির লন্ড্রিতে আগুন লাগার কারণে মেরামতের জন্য গত শুক্রবার সেটি ক্রোয়েশিয়ায় নোঙর করে। 

তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানি বাহিনী সফলভাবে জাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ১৭ বার আঘাত করেছে। এর অর্থ হলো, ফোর্ডের ৪ হাজার ৫০০ নাবিক আপাতত এই যুদ্ধের বাইরে থাকছেন। তবে আরও সেনা আসছে।

সম্ভবত ফোর্ডের অনুপস্থিতি পুষিয়ে নিতে ওয়াশিংটন তাদের তৃতীয় রণতরী পাঠাচ্ছে—নরফোকের মার্কিন নৌ সদর দপ্তর থেকে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ স্ট্রাইক গ্রুপ রওনা হয়েছে। এর মধ্যে ওই অঞ্চলে আগে থেকে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত নয়।

স্থায়ী ঘাঁটিগুলোই পশ্চিম এশিয়ার ৪০ হাজার সেনার মেরুদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্র কাতার (আল-উদাইদ) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (আল-ধাফরা) প্রধান বিমান ঘাঁটি পরিচালনা করে। কাতারের ঘাঁটিটিতে প্রায় ১১ হাজার কর্মী রয়েছে, এটি সেন্টকমের সদর দপ্তর। এখান থেকে বি-৫২ বোমারু বিমান এবং এফ-৩৫বি ফাইটারের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। বাহরাইনের নৌ-সহায়তা কেন্দ্রে প্রায় ৭ হাজার নাবিক রয়েছে এবং এটি পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর; অন্যদিকে কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে ৮২তম এয়ারবোর্নসহ প্রায় ১৪ হাজার সৈন্য রয়েছে।

আফগানিস্তানের ১ লাখ সেনার সেই দুঃস্বপ্নের প্রতিধ্বনি

বর্তমান সেনা মোতায়েন আফগানিস্তান যুদ্ধের এক অস্বস্তিকর স্মৃতি জাগিয়ে দিচ্ছে। নাইন-ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ৩ হাজার সৈন্য দিয়ে সেখানে অভিযান শুরু করলেও দ্রুত তা বৃদ্ধি পায়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ১ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

সাবেক ইউক্রেনীয় দূত কিথ কেলগ, রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামসহ ট্রাম্পের কিছু মিত্র তেহরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার জন্য সেনা মোতায়েনকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন। তবে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনা নিয়ে এগোলে আরও কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। 

অন্যদিকে, এই যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় দলের মধ্যেই বিরোধিতা বাড়ছে।

উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো: ড্রোনে সয়লাব হয়ে থাকা এই বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্র আগের সংঘাতগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, যেখানে নিজেদের রক্ষা করার জন্য সেনারা পর্যাপ্ত সরঞ্জামে সজ্জিত নাও হতে পারে। এছাড়া ইরান পারস্য উপসাগরে মাইন বিছিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে, যা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার যেকোনো মার্কিন নৌ-অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই যুদ্ধে প্রাণহানির সংখ্যা এখন পর্যন্ত নিহত ১৩ মার্কিন সেনার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি

 

কিউএনবি/আয়শা/৩১ মার্চ ২০২৬,/রাত ৮:৪০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

April 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit