রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০২:২৬ অপরাহ্ন

এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬
  • ৮৪ Time View

ডেস্ক নিউজ : উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে দেশের ব্যাংক খাত এখন প্রভিশনের ভারে ন্যুব্জ। মন্দ ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য মুনাফা উবে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রায় চার লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকা আয় মুনাফার খাতায় ওঠার কথা থাকলেও এর বড় অংশই প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়েছে। ফলে প্রকৃত লাভের মুখ দেখেনি বেশিরভাগ ব্যাংক।

তবে সব ব্যাংক নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে পারেনি। দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে অনেক ব্যাংক ঘাটতিতে পড়েছে। সর্বশেষ হিসাবে ব্যাংক খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের নিয়মিত বা অশ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে পরিচালন মুনাফার ০.৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত, নিম্নমানের শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ এবং সন্দেহজনক শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ প্রভিশন হিসেবে সরিয়ে রাখে।

মন্দ ও ক্ষতিকর শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংককে ১০০ শতাংশ অর্থ প্রভিশন হিসেবে আলাদা করে রাখতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে এতই অনিয়ম হয়েছে যে এখন আর প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে পারছে না ব্যাংকগুলো। বিতরণকৃত মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি। ফলে মুনাফা তো দূরের কথা, ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণেই হিমশিম খাচ্ছে কিছু ব্যাংক।

দুর্নীতি-অনিয়ম ও অর্থপাচারের কারণে ব্যাংকগুলো অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছে না। ঋণ দিতে পারছে না। আবার বিতরণ করা ঋণ আদায়ও করতে পারছে না। এই মুহূর্তে কার্যকর কৌশল হাতে না নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর শেষে চার লাখ ৪১ হাজার ৯১ কোটি টাকার প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো দুই লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংক। দেশের ব্যাংকগুলো ঘাটতিতে থাকলেও বিদেশি ব্যাংকগুলো ৩৩৮ কোটি টাকার প্রভিশন উদ্বৃত্ত রেখেছে।

খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ৭০ হাজার ৩৬৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এই ঘাটতি আরো বেশি, এক লাখ ২১ হাজার ২১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ঘাটতি তুলনামূলক কম, ২০১ কোটি দুই লাখ টাকা।

ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ ব্যাংককে সংরক্ষণ (প্রভিশন) হিসেবে রাখতে হয়। কিন্তু খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ায় অনেক ব্যাংকই নির্ধারিত হারে সংরক্ষণ রাখতে পারছে না। এতে তাদের প্রকৃত মুনাফা কমে যাচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কাগুজে লাভ থাকলেও প্রকৃত আর্থিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, প্রভিশন ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মূলধন ঘাটতি বাড়লে নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতা আসে, বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রভিশন ঘাটতির এই বোঝা আরো বাড়তে পারে। এতে ব্যাংক খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং আস্থা সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে লাফিয়ে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণে কিছুটা লাগাম এসেছে। বিশেষ পুনঃ তফসিল ও আদায় জোরদারের ফলে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমেছে। মোট ঋণের যা প্রায় ৩১ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। গত বছরের শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। অবশ্য গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় দুই লাখ ১১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বেশি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃ তফসিল ব্যবস্থা চালু হয়। এর পর থেকে নানা শিথিলতায় খেলাপি ঋণ কম দেখানো হচ্ছিল। এ ক্ষেত্রে কখনো ঋণ পরিশোধ না করেই নিয়মিত রাখা, নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পুনঃ তফসিল কিংবা ভুয়া ঋণ নিয়ে দায় সমন্বয়েরও সুযোগ দেওয়া হতো। খেলাপি ঋণ কম দেখাতে সবচেয়ে বড় চুরির সুযোগ দেওয়া হয় ২০১৯ সালে। সাধারণভাবে ঋণ পরিশোধের সময় পার হলেই মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হয়। তবে ২০১৯ সালে এক নির্দেশনার মাধ্যমে মেয়াদি ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের ছয় মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হচ্ছিল।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

কিউএনবি/অনিমা/০৮ মার্চ ২০২৬,/সকাল ৬:৫০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit