আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর তেহরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এই প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞ রাজনীতিক আলী লারিজানি রোববার ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে একটি ‘অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ’ গঠন করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হওয়া এই সংকটময় মুহূর্তে লারিজানি দ্রুতই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন।
গত এক বছরে ইরানের নিরাপত্তা ও কৌশলগত নীতিনির্ধারণে লারিজানির প্রভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। পারমাণবিক আলোচনা, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত আগস্টে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি খামেনির বিশ্বস্ত কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিতি পান।
সম্প্রতি ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ পরমাণু আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদারে একাধিকবার মস্কো সফর—সব মিলিয়ে তিনি ইরানের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে সক্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানকে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। একই হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আব্দুলরহিম মোসাভি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পারমাণবিক ইস্যুতে লারিজানি তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান দেখিয়েছেন। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ যদি কেবল ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে হয়, তবে সে বিষয়ে আলোচনা সম্ভব। তবে একই সঙ্গে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তার ভূমিকা ছিল কঠোর।
গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, সেই দমন-পীড়নে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। লারিজানি আন্দোলনের কিছু অংশকে ‘জনগণের প্রতিবাদ’ হিসেবে স্বীকার করলেও সশস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ‘শহুরে আধা সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা
১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তার রাজনৈতিক জীবন বহুমাত্রিক—
সাবেক রেভোল্যুশনারি গার্ড: লারিজানি একসময় রেভোল্যুশনারি গার্ডের সদস্য ছিলেন।
পরমাণু আলোচক (২০০৫-২০০৭): তিনি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির কট্টর সমর্থক ছিলেন। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রস্তাবকে তিনি ‘একটি মুক্তার বদলে ক্যান্ডি বার নেওয়া’–এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
পার্লামেন্ট স্পিকার (২০০৮-২০২০): দীর্ঘ ১২ বছর তিনি পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। তার সময়েই ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
পারিবারিক পরিচয়: ১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি এক বিখ্যাত আলেম পরিবারের সন্তান। তার ভাইয়েরাও বিচার বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
খামেনির অনুপস্থিতিতে ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় শক্তিকেন্দ্রগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করা লারিজানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সামাল দিয়ে তিনি নিজেকে কতটা কার্যকর ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন—সেদিকেই এখন নজর বিশ্লেষকদের।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
কিউএনবি/আয়শা/০১ মার্চ ২০২৬,/রাত ১০:৪৫