ডেস্ক নিউজ : হিমেল হাওয়া আর মিষ্টি রোদে বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। ক্রেতাদের সামলাতে ব্যস্ত বিক্রয়কর্মী। এদিকে মেলায় সন্ধ্যার পর কনসার্টের আয়োজন করায় তরুণ তরুণীদের ভিড় বেশি লক্ষ্য করা গেছে। দল বেঁধে সবাই এসেছেন গান শোনার জন্য। গত ৩ রা জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলার ৩০ তম আসর। হাজার হাজার ক্রেতা-দর্শনার্থী মেলা প্রাঙ্গণে এসেছেন। ঘুরে-ফিরে পছন্দের পণ্য কিনে ঘরে ফিরেছেন।
শুক্রবার মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, জুমার নামাজের পর থেকেই কুড়িলে মেলাগামী বিআরটিসি বাসের টিকিটের জন্য মানুষজনের লম্বা সারি। বাস থেকে নেমে মেলা প্রাঙ্গণে পৌঁছাতেই দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের আরও কয়েকগুণ ভিড় দেখা যায়।
মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে দেখা যায়, দল বেঁধে দর্শনার্থীরা প্রবেশ টিকিট কেটে আসছেন। মেলায় দর্শনার্থীদের এমন আগমনে বিক্রেতাদের মুখে উচ্ছাসের হাসি। মেলায় আসা ক্রেতারা বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে চাহিদা মতো নিজের কাঙ্খিত পণ্যটি কেনার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে কেনাকাটা শেষ করে স্টলে বাইরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। মেলায় আসা ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে কাপড়, প্রসাধনী ও ক্রোকারিজ পণ্যের স্টলগুলোতে। ভীড় দেখা গেছে রাজা মামার চায়ের স্টলে।
দুপুরের দিকে মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, দলবেঁধে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে সকাল থেকে মেলায় আসতে থাকেন মানুষ। বিকেলে এটি ছোটখাটো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। প্রবেশ টিকিট ক্রয়ের পর্যাপ্ত বুথ থাকায় মেলায় ঢুকতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি ক্রেতা-দর্শনার্থীদের। মেলার ভেতরেও তিলধারণের ঠাঁই ছিল না। এরপরও দর্শনার্থীদের চোখ-মুখের ভাষা বলে দিচ্ছিল, এই বিপুল জনসমাগমও তাদের আনন্দ-উচ্ছাস কমাতে পারেনি। সীমিত বিনোদনকেন্দ্রের এ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মিলনস্থলে পরিণত হয় মেলা।
রাজধানীর বাসাবো থেকে মেলায় এসেছেন আফসার আহমেদ ও মিম রহমান দম্পতি, বেশ কিছুদিন ধরে ঘরের আসবাবপত্র কেনার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। তাই মেলায় এসেছি আধুনিক ও মানসম্মত আলমারি ও সোফা পাওয়া যায় কিনা সেটা দেখার জন্য। আজ ঘুরে ঘুরে বেশ কয়েকটি ফার্নিচারের শোরুম দেখলাম দুটি সোফা ও একটি ওয়ারড্রব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু দাম অনেক বেশি চাচ্ছে। তাই অপেক্ষায় আছি যদি বেলার শেষ দিকে ছাড় দেয় তবে কিনে নেব।
মেলায় ঘুরতে ঘুরতে কথা হলো রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা কয়েকজনের সঙ্গে। যাদের অধিকাংশই দলবেঁধে এসেছেন। তারা বললেন, নির্দিষ্ট কোনও কিছু কেনার পরিকল্পনা তাদের নেই। ভিড়টাও খারাপ লাগছে না। বরং বেড়াতে এসে অনেক পরিচিত মানুষের দেখা পেয়ে ভালোই লাগছে।
মনির হোসেন সুমন নামে একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি পেশায় চাকুরীজীবি। বন্ধুবান্ধব মিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন সাতজন। তিনি বললেন, বন্ধুবান্ধবরা ঘুরতে এসেছি। দুপুর থেকে সব স্টল ঘুরলাম, অনেক কিছু দেখলাম। পছন্দ হয়েছে কিছু পণ্য, যা ফেরার সময় নিয়ে যাব। মেলার চারদিক খোলামেলা থাকায় ঠান্ডা বাতাস কাবু করে ফেলেছে।
শুধু যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন মেলায় এসেছেন তা নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও লোকজন এসেছেন মেলায় বেড়ানো আর কেনাকাটার জন্য। গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে এসেছেন গৃহবধূ পল্লবী হাওলাদার। তিনি বলেন, রথও দেখা আবার কলাও বেঁচা। আসলাম ঘুরতে। পাশাপাশি কেনাকাটা করা হলো। আর রোদ আর ছুটির দিন থাকায় দিনটি ভাল লাগছে।
মার্কস কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধি আশরাফ বলেন, , গত ৬ দিনের তুলনায় বেচাবিক্রির পরিমাণ সন্তোষজনক। বলা যায় শুক্রবার থেকে বেচাবিক্রি শুরু। এতোদিন সবাই ঘুরে ঘুরে পণ্য দেখেছেন। কিন্তু আজ ক্রেতার সংখ্যা বেশি। যারা আসছেন তারা কেনার জন্যই আসছেন।
রাজধানী নাখালপাড়া থেকে স্বামী সন্তানসহ এসেছেন সুরভী আক্তার, তিনি বলেন গত কয়েকদিন ধরে চিন্তা করছিলাম মেলায় যাব। আট সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সবাইকে নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসেছি। গৃহস্থালির ও রান্নাবান্নার কাজে জন্য বেশ কিছু পণ্য ক্রয় করেছি। মার্কেট থেকে মেলায় কিছুটা দাম কম মনে হয়েছে।
মেলার কয়েকজন দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নির্দিষ্ট কোনও কিছু কেনার পরিকল্পনা নিয়ে তারা আসেননি। মূল উদ্দেশ্য বেড়ানো। নতুন কী জিনিসপত্র এল, দরদাম কেমন এসব যাচাই-বাছাই করা। পছন্দ হলে কিছু কেনাকাটা করা।
সাউদ কোরিয়া বাংলাদেশ (এসকেবি) বিক্রয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ হৃদয় জানান, শুক্রবার লোকসভা আগমন অনেক হয়েছে। বেচাকেনা ও বেশ ভালো। গত কয়েকদিন শীতের কারণে মানুষ কেমন আসেনি তবে আজ মানুষের সমাগম আমাদের আশানুরূপ বেচাকেনা হয়েছে।
রাজা মামা চায়ের স্বত্তাধিকারী রাজা মামা বলেন, গত ৬ দিন লোক সমাগম ছিলোইনা। আজ শুক্রবার হওয়ায় লোকজন আসছে। বেচাকেনাও হচ্ছে। টার্কিস প্যাভিলিয়নের মালিক নাসির হোসেন বলেন, গত কয়েকদিনে বেচাকেনা তেমন হয়নি। শুক্রবার দুপুর থেকেই বেচাকেনা শুরু হয়। বলা চলে মেলা শুরু হলো শুক্রবার থেকে।
এদিকে, এবার বাণিজ্য মেলায় শিশুদের বাড়তি আনন্দ দিতে রয়েছে বিনোদন পার্ক। শিশু-কিশোরদের বিনোদনের এ জোনটি ভিআইপি গেট দিয়ে প্রবেশ করে বাম দিকে গেলেই দেখা যাবে। এখানে শিশুদের জন্য রয়েছে ৮ থেকে ৯টি রাইড। এ জায়গাটিতে ঢুকলেই শুনতে পাওয়া যায় শিশুদের চিৎকার ও হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ। শুক্রবার বাণিজ্য মেলা ঘুরে দেখা যায়, দুপুর থেকেই দর্শনার্থী বাড়তে থাকে বাণিজ্য মেলায়। কেউ সপরিবারে, কেউ বন্ধু-বান্ধবী, স্কুল-কলেজের সহপাঠীদের নিয়ে দল বেঁধে মেলায় এসেছেন। এদের একটি অংশ মেলায় ঘুরতে আসলেও বেশিরভাগই ব্যস্ত কেনাকাটায়। মেলায় ক্রেতাদের বেশি আগ্রহ দেখা গেছে গৃহস্থালি বিভিন্ন পণ্যের প্রতি। এছাড়া শীতবস্ত্র কেনাকাটা করতে দেখা গেছে অনেককে। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
রাজধানীর সাতারকুল থেকে এসেছেন নাসরীন আক্তার রুনা। তিনি তার মেয়ে, ভাগ্নিদের নিয়ে মেলায় আসেন। তিনি বলেন, বাণিজ্য মেলা নামটাই একটা ব্রান্ড। এখানকার জিনিসপত্র ঢাকাতেও পাওয়া যায়। কিন্তু বাণিজ্য মেলার বিষয়টা ভিন্ন। আসলাম, খাওয়া-দাওয়া করলাম। কেনাকাটা করলাম। এইতো। রাজধানীর উত্তর বাড্ডা থেকে এসেছেন শামীম-মুন্নী দম্পত্তি। তারা বলেন, ছুটির দিন শুক্রবার তাই মেলায় ঘুরতে এসেছি। মেলায় সব ব্রান্ডের পণ্য পাওয়া যায়। তাই কিছু কেনার ইচ্ছে।
উল্লেখ্য, ৩রা জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ মেলা চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ১৩ লাখ ৭৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের এবারের মেলাস্থল। মেলা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে শুক্রবার সকাল ৯ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত। এবারের প্রবেশমূল্য ধরা হয়েছে (পূর্ববর্তী তিন বছরের মতো) প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ২০ টাকা। ইপিবির উপ-সচিব ওয়ারেস হোসেন বলেন, শুক্রবার থেকে মেলা শুরু হলো। আজ প্রায় ৪০/৫০ হাজার লোকের সমাগম হয়েছে। আশা করছি ধীরে ধীরে এ সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। গতবারের চেয়ে এবার মেলা বেশি জমবে।
কিউএনবি/আয়শা/৯ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ৮:১২