শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনা : ৭৫ থেকে ২৪
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস জানতে এখনো বহুদূর বাকি। তবুও প্রামাণ্য কলাপ বিশ্রুত কিছু বুলেট তথ্য যাদের অল্প লেখায় জানা প্রয়োজন শুধু তাদের জন্যই এখানে সম্যক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হলো।
বাকশাল প্রতিষ্ঠা ১৯৭৫:
১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠা করেন, যা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিকে ধ্বংস করে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। বাকশালের সময়ে বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বন্ধ করা হয়।
জন্ম নিয়ন্ত্রণ নীতি (১৯৭২-১৯৭৫)
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান সরকার জন্ম নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং একটি কঠোর নীতি প্রবর্তন করে।
জনগণের মধ্যে নীতির কড়াকড়ি নিয়ে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। জোরপূর্বক জন্ম নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
গণমাধ্যমের দমন (১৯৭৫)
বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর, সরকার সব সংবাদপত্রকে সরকারি মালিকানাধীন করে এবং সংবাদ মাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। মুক্ত সাংবাদিকতার মৃত্যু ঘটে এবং জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়। বিশেষ করে “দৈনিক ইত্তেফাক” এবং “দৈনিক সংবাদের” ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, যা তাদের স্বতন্ত্রতা হারায়।
মুজিব হত্যা (১৯৭৫) : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা দেশকে একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে এবং সামরিক শাসনের উত্থান ঘটে। দেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।
শেখ হাসিনা প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্র (২০০৯)
শেখ হাসিনার শাসনামলে বারবার স্বৈরাচারী শাসনের অভিযোগ ওঠে। তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দল এবং গণমাধ্যমকে দমনের ব্যাপক অভিযোগ ও প্রমান রয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৪ সালের বিনাভোটের নির্বাচন:
২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়। এমনকি নির্বাচনকে একতরফা করে তোলা হয়, যেখানে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণই করতে পারেনি।
জুডিশিয়াল কন্ট্রোল এবং বিরোধী দলের দমন (২০১০):
শেখ হাসিনার প্রশাসনের সময় বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাদের দমন করার প্রচেষ্টা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে এবং এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে আসে, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি সাধন করে। ২০১৩ সালে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতের নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়, যা বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচিত হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ (২০০৯-২০২৪):
শেখ হাসিনার প্রশাসনের সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। এটি গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমকে ভীত করে তোলে এবং জনগণের মধ্যে একটি সন্ত্রাসের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮):
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হওয়ার পর বাকস্বাধীনতার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এর ফলে অনেক সাংবাদিক, লেখক, এবং ব্লগারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সামান্য এক কলাম লেখার অপরাধেও রাম-সাম-জদু-মধু খেলার মতো নির্বিচারে সাধারণ জনতার মধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন কায়দায় মানুষ ধরে নিয়ে দিনের পর দিন আটক করে রাখা হয় অতঃপর একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়, যা কখনোই উক্ত পরিবারের বাইরে দেশের বাকি ১৬ কোটী মানুষ জানতেই পারেনি।
বিরোধী নেতাদের ওপর চাপ এবং ধরপাকড় (২০১৩-২০২৪):
শেখ হাসিনার প্রশাসনের সময় বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য বিরোধী দলগুলোর নেতৃত্বকে দুর্বল করা হয় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে তাদের কার্যত বাদ দেওয়া হয়। প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামো দুর্বল করা হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তার তদন্তের সময় ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়।
মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অপহরণ (২০১০-বর্তমান):
শেখ হাসিনার শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সরকারবিরোধী ব্যক্তিদের অপহরণের অভিযোগ ওঠে।
আয়নাঘর,মানুষ গুম,হত্যা,আলোচিত সাতখুন,গণহত্যা নির্বিচারে চলমান থাকে। অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমালোচিত হন। নিজেকে (সম্ভবত) আজীবন প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকায় রাখার স্বপ্নে বিভোর হাসিনা দেশের বুক চিরে রেললাইন, ট্রানজিট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, মংলা বন্দর, সমস্ত কিছুর বিনিময়ে হলেও ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। হাসিনার শাসনামলে উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ ওঠে যা ইতোমধ্যে প্রকাশ্য প্রমাণিত।
সর্বশেষ সংগঠিত ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিস্ফোরিত রূপেসূচনা হলো রক্তাক্ত জুলাইয়ের। ছাত্র আন্দোলনের সাথে হাসিনা একাত্মতা প্রকাশ করলেন করলেন লাশের রাজনীর মধ্য দিয়ে।
শাপলা চত্বর আর পিলখানা ট্রাজেডির কায়দায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিলেন। অবশেষে নয় দফা রুপলাভ করলো এক দফায়। নির্বিচারে গণহত্যা চালাতে গিয়ে এইবেলা তিনি ক্ষমতা হারলেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন রাষ্ট্রনায়ক জনতার আদালতে অপদস্থ হয়ে এইভাবে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হননি। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সময়কাল ধরে ক্ষমতায় আসীন থেকেও আওয়ামী সরকার শেখ হাসিনা অবশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে মুহ্যমান দূর্নীতি আর চোরের বীজ বপণ করে ৩৬শে জুলাই অর্থাৎ ৫ই আগস্ট পাপের ঘড়া পূর্ণ করে তিনি পদত্যাগ করলেন।
পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই, প্রহসণ আর নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কথা বলবার অধিকারটুকু যেনো এই স্বাধীন দেশে বহাল থাকে। সমস্ত অন্যায়, শোষণ আর নিপীড়নের বীজ যেনো আমরা বিনষ্ট করতে পারি অংকুরেই। সুসসংহত থাকুক এই সোনার বাংলার গণতন্ত্রবাদ।
লেখিকাঃ ফায়াজুন্নেসা চৌধুরী, শিক্ষক, পিএইচডি রিসার্চার, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার লেখা বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করে আসছে।
কিউএনবি/বিপুল/২৬.০৮.২০২৪/ দুপুর ২.০১