রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ন

মহিউদ্দিন বলয়কে ‘বিদায়’, ‘গুরু’ এখন নাছির!

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২৪
  • ১৮৭ Time View

ডেস্ক নিউজ : চারপাশে সমর্থকদের থিকথিকে ভিড়। চলছে বিজয় উৎসব। স্লোগান উঠছে থেমে থেমে। কখনো ‘বাচ্চু ভাই-বাচ্চু ভাই’, কখনো আবার ‘নাছির ভাই’ ‘নাছির ভাই’। সেই আয়োজনের মধ্যেমণি হয়ে থাকা দুই নেতার মুখেও উপচে পড়ছে হাসির ঢেউ। সেই হাসি আরও চওড়া হলো একটু পরেই, যখন একজন এসে এক এক করে কাঁধে তুলে নিলেন দুজনকেই। সেই দৃশ্য দেখে মুহুমুর্হ করতালির বৃষ্টিতে হাত রাঙালেন দুই নেতারা অনুসারীরাই।

মহিউদ্দিন বাচ্চু চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী-খুলশী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরের চিত্র এটি। অথচ কিছুদিন আগেও এমন কিছু ছিল অকল্পনীয়। কেননা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতি মানেই অবিশ্যম্ভাবী দুটি ধারা। এর একটি ধারার নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মহানগর আওয়ামী লীগের এই সভাপতির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সদ্য শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের পেছনে রাজনীতি করছেন বাবার অনুসারীরা। আর অন্য ধারাটির নেতৃত্বে আছেন সিটি করপোরেশনের আরেক সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। এক দু বছর ধরে নয়, এমনটি চলছে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সেই দুটি ধারার বিস্তার ঘটেছে আশপাশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। বিবেধ সামলাতে দুই ধারার হয়ে প্রধান পদগুলো অদৃশ্যভাবে ভাগাভাগির রীতিও চলছে বহুবছর ধরে।

মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি থেকে যুবলীগের আহ্বায়ক, এরপর আওয়ামী লীগে যুক্ত হওয়া-জীবনের প্রায় ৪০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে মহিউদ্দিন বাচ্চুর পরিচিত ছিল মহিউদ্দিন চৌধুরীর ‘শির্ষ’! সেই বাচ্চু কি এবার মহিউদ্দিন বলয়কে বিদায় দিয়ে আ জ ম নাছির উদ্দিনকে রাজনৈতিক ‘গুরু’ মানতে শুরু করেছেন-চট্টগ্রামের রাজনীতিতে কান পাতলে সেই প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে!

আ জ ম নাছির বলয়ের সঙ্গে মহিউদ্দিন বাচ্চুর ঘণিষ্টতার শুরু গত বছরের জুলাইয়ে, চট্টগ্রাম-১০ আসনে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার পর। তখন বাচ্চুর মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়া থেকে নির্বাচনী প্রচারণা-কয়েকবার দেখা গেছে আ জ ম নাছিরকে। তবে সেই ঘণিষ্টতা আরও গভীর হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে। পাঁচ মাস আগে উপনির্বাচনে বাচ্চুর বিপরীতে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। খালি মাঠে অনেকটা হেসে খেলেই জয় পান এই নেতা। তবে এবার তিনি ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বীতার মুখে পড়েন। নিজে যে বলয়ের হয়ে এত বছর ধরে রাজনীতি করে আসছেন তারই একটি অংশ প্রকাশ্যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের হয়ে মাঠে প্রচার শুরু করলে বেশ বিপাকে পড়েন বাচ্চু। বিশেষ করে মহিউদ্দিন চৌধুরী ঘরনার নেতা দুই কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন ও আবদুস সবুর লিটনের সরাসরি বাচ্চুর প্রতিদ্বন্দ্বী মো. মনজুর আলমের পক্ষে নিজেদের কর্মীদের নামিয়ে দেন। তখন এই দুজনকে বাচ্চুর পক্ষে কাজ করতে কিংবা মনজুর পক্ষে না থাকতে মহিউদ্দিন বলয় থেকে কোনো বার্তাও দেওয়া হয়নি।

আর সেই ঘোর ‘দুঃসময়ে’ বাচ্চুর মাথার ওপর ছায়া হয়ে আসেন নাছির। মহানগর আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক শুধু নিজে প্রচার-প্রচারণায় নামেননি, জনশ্রুতি আছে-নিজের বিশাল অনুসারীদেরও নির্দেশ দেন বাচ্চুর হয়ে কাজ করতে। আ জ ম নাছিরের সেই কৃতজ্ঞতা ভোলেননি বাচ্চুও। রুদ্ধশ্বাস জয়ের পর মহিউদ্দিন বলয়ের কাউকে নিয়ে নয়, বিজয় উৎসব করেছেন আ জ ম নাছিরকে সঙ্গে নিয়েই। এখানেই শেষ নয়, একরাশ প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছেন নাছিরকে।

জয়ের ঘোষণা আসতেই নাছিরকে পাশে নিয়ে বাচ্চু সমর্থকদের উদ্দেশে বলতে শুরু করেন, ‘আমার এই বিজয় রাব্বুল আলামিনের রহমতের বিজয়। মুজিব আদর্শের সৈনকদের অপ্রতিরোধ প্রতিরোধের বিজয়। আর এই বিজয় এসেছে আ জ ম নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বে।’ তখন হাসতে হাসতে হাততালি দিতে দেখা যায় নাছিরকে।

সেই বক্তব্যে বাচ্চু একটিবারও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী কিংবা তাঁর পুত্র মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নাম উচ্চারণ করেননি। উৎসবের এখানেই শেষ নয়। বক্তব্য শেষে বাচ্চুকে জড়িয়ে ধরেন নাছির। পরে বাচ্চুর একজন অনুসারী প্রথমে বাচ্চুকে এবং পরে অনুসারীরা নাছিরকে কোলে নিয়ে উল্লাস করেন। নাছির ও বাচ্চু বলয়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাচ্চুর ভাই নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন আবার নাছির বলয়ের হয়ে রাজনীতি করেন। তিনিই নাছিরের সঙ্গে বাচ্চুর যোগসূত্র করে দেওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছেন।

এদিকে নির্বাচনের পর ওয়াসিমকে বেশ কোনঠাসা হতে দেখা গেছে। নির্বাচনের দিন পাহাড়তলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্র দখলে নিতে ওয়াসিমের অনুসারী শামিম আজাদ ওরফে ব্লেড শামিম পিস্তল নিয়ে গুলি ছোড়েন। অভিযোগ আছে এতে নেতৃত্ব দেন স্বয়ং ওয়াসীমের স্ত্রী রুমানা আক্তার, আর পরোক্ষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন ওয়াসিম নিজেই। এতে দুজন গুলিবিদ্ধও হন। নির্বাচনে বাচ্চু জয়ী হওয়ার পর তাঁর অনুসারীরা ‘প্রতিশোধ’ নেওয়া শুরু করেছেন! বাচ্চুর বলয়ের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণের অনুসারীদের প্রতিরোধের মুখে পড়েন ওয়াসিম ও তাঁর অনুসারীরা। দুই পক্ষের মধ্যে এখনো উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে সেই দ্বৈরত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, এই ‘বলয় বদল’ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা দিনে দিনে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠছেন মহিউদ্দিন বাচ্চু। মহিউদ্দিন চৌধুরী বলয়ের বৃহৎ অংশের সমর্থন না পেলেও তিনি নাছিরকে সঙ্গে নিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে হারানো সহজ নয়। আর সাম্প্রতিককালে নাছিরের প্রভাব চট্টগ্রামের রাজনীতিতে কিছুটা কমতির দিকে। তিনি গত সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাননি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনটি আসন থেকে মনোনয়ন কিনলেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। মহানগর ও নগরকেন্দ্রীক আসনগুলোতে নাছির ঘরনার কেউও ছিল না এবার। তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য নোমান আল মাহমুদ এবার মনোনয়ন পাননি। উল্টোদিকে আওয়ামী লীগে মহিবুল হাসান চৌধুরীর গুরুত্ব বেড়েই চলেছে। সেক্ষেত্রে নিজের ভিত আরও শক্ত করতে নাছির মহিউদ্দিন বাচ্চুকে জোরালো সমর্থন দিতে পারেন।

যদিওবা ঘরনা-বদল নিয়ে বিষয়ে মহিউদ্দিন বাচ্চু কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সেই প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু বললেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলাম। আমার জন্য প্রকৃত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কাজ করেছেন। এই বিজয় সবার।’

বাচ্চু বিষয়টি আড়াল করলেও অবশ্য সমর্থকদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দুই নেতার এক হওয়া নিয়ে লিখেই চলেছেন। তবে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। ভবিষ্যতই হয়তো বলে দেবে-আসলেই কি বাচ্চুর গুরু বদল! নাকি এ শুধু নির্বাচনী বৈতরণী পারের কৌশল?

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১২ জানুয়ারী ২০২৪,/দুপুর ১২:৩৩

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit