জালাল আহমদ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ইতিহাসের সমস্ত বই যদি পুড়ে যায়, কিন্তু ড. আব্দুল করিম ইতিহাস বিশারদ যদি বেঁচে থাকে, তাহলে চিন্তার কোন কারণ নাই। কেন না, করিম স্যারের মাথাটাই ছিল সমস্ত ইতিহাসের এক ভান্ডার । ইতিহাসের বই না পুড়লেও কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের মাঝে এখন নেই ইতিহাস বিশারদ অধ্যাপক আব্দুল করিম । তিনি শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার একজন স্বনামধন্য ইতিহাসবেত্তা ছিলেন। বাংলার ইতিহাস, শিলালিপি. ও মুদ্রা সংক্রান্ত বিদ্যায় গবেষণার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেরা ইতিহাসের গবেষকের স্থান দখল করেন তিনি। তিনি কী ছিলেন না ? ইতিহাস সন্ধানী, ইতিহাস চর্চার পথিক, জ্ঞানতাপস, শিক্ষাবিদ, গবেষক, ইতিহাসবেত্তা, রিড়ার,বিভাগীয় সভাপতি,অধ্যাপক, ডিন, প্রভোষ্ট,উপাচার্য এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক সবই ছিলেন তিনি। উদার মানবতাবাদী ড. আব্দুল করিম স্যার ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত শিক্ষাবিদ। তার মত জ্ঞানী লোকের গুণের বিশ্লেষণের জন্য বাংলা সাহিত্য নতুন নতুন বিশেষণ পদ সৃষ্টির প্রয়োজন ।বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা সাঙ্গু নদীর পাড়ের সন্তান ড. আব্দুল করিম ১৯২৮ সালের ১ জুন বাঁশখালীর উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের চাঁপাছড়ি গ্রামের সৈয়দ বংশে জন্ম গ্রহণ করেন । তাঁর বাবা মৌলভী ওয়াইজুদ্দিন বার্মায় (মিয়ানমার) একটি মসজিদের মুয়াজ্জিনের চাকরি করতেন এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় বাঁশখালীতে ফিরে আসেন । মা সৈয়দা রশিদা খাতুন এক কামেল পরিবারের পর্দাশীল মেয়ে ছিলেন ।ড. করিম অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে কঠোর পরিশ্রমে বাল্য, কিশোর ও যৌবন পার করেছেন । তাঁর উঠে আসার দু:খকাহিনী তিনি নিজেই তাঁর আত্মজীবনী “সমাজ ও জীবন” গ্রন্থে নিপুন হাতের কালিতে লিপিবদ্ধ করেছেন। “সমাজ ও জীবন” তার শুধু আত্মজীবনী নয়,বরং তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার অপূর্ব নিদর্শন ও নানা ঘটনার প্রতিচ্ছবি ।
সমাজের নানা অসঙ্গতি, কুসংস্কার, অনিয়ম ও ফতোয়বাজদের ভন্ডামী তিনি তরুণ
প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেছেন । তিনি এ বইয়ে লিখেছেন “নারী নির্যাতন গ্রামের একটি সাধারণ ব্যাপার । গ্রামে অবশ্যই নির্যাতন মানেই স্বামীকর্তৃক স্ত্রীকে কথায় কথায় মারধর করা, শাশুড়ী কর্তৃক বউকে লাঞ্চিত করা। ইসলাম ধর্ম স্ত্রীর যে মর্যাদা দিয়েছে, স্বামীর উপর স্ত্রীর যে অধিকার তা সাধারণ মুসলমান তা কখনো বিশ্বাস করতেন না । মোল্লা-মৌলভীরাও এই বিষয়ে কোন কিছু বলত না। তারা মনে করে স্ত্রী হল স্বামীর দাসী। স্বামী- স্ত্রীর ঝাগড়ার অন্যতম কারণ আর্থিক অসচ্ছলতা । সামান্য কারণে ঝগড়া ঝাটির পরে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অসংখ্য ঘটনা দেখেছি। আবার তালাক দিয়ে স্ত্রীকে ঘরে রাখার জন্য ফতোয়াবাজ মোল্লা-মৌলভীর কাছে ধর্না দেয়। মোল্লা-মৌলভীরাও অর্থের বিনিময়ে তালাক হয়নি মর্মে ফতোয়া দিতে কসুর করত না”। তার এই স্পষ্টবাদী লেখা প্রমাণ করে ড. আবদুল করিম ধর্মভীরু ছিলেন কিন্তু র্ধমান্ধ ছিলেন না ।ড. করিমকে মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে কোরআন শরীফ হেফজ করতে দেন তার ছোট বেলার
শিক্ষক মাওলানা মনিরুজ্জামান। ছোটবেলার মেধাবী করিম নিজ গ্রামে মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন।তিনি ১৯৪৪ সালে হাই মাদ্রাসা পাস করেন। পরে মাদ্রাসা শিক্ষা ছেড়ে তিনি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশোনা শুরু করেন। ফলে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামের ইসলামিক ইন্টামিডিয়েট কলেজে যা বর্তমানে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ নামে পরিচিত । ১৯৪৬ সালে প্রথম বিভাগে ৮ স্থান অধিকার করে আই, এ পাশ করেন । উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৯ সালে ইতিহাসে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৩য় স্থান অধিকার করে বি. এ অর্নাস এবং ১৯৫০ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম পেয়ে এম. এ পাশ করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। পাশাপাশি তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক হন। এই হলের আবাসিক শিক্ষক হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস, ভিসি ইনামুল সহ অসংখ্য ছেলেদের সার্বিক সুখ দু:খের খবর নিতেন বলেই তিনি চাঁটগার ছেলেদের “অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত হন।
আজকের মত অসংখ্য টিভি চ্যানেল , পত্র-পত্রিকা, গণমাধ্যম তখন ছিল না। কিন্তু ড. করিম সাহেব শিলালিপি,মুদ্রা বিদ্যা, সুফী সাধকের জীবন চরিত্র, জাতিসত্ত্বার বিকাশ, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ, নিরীক্ষণ, পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাঙ্গালী মুসলমানদের ইতিহাসকে অনেক উচু আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আবদুল করিম অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর অনুপ্রেরণায় গবেষণা কর্ম শুরু করেন। ড. দানীর তত্ত্বাবধানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল ‘Social History of the Muslims in Bengal’ যা পরে পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি (বর্তমানে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি) থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
জ্ঞানের পরিসীমা আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে দিতে ১৯৬০ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান । লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্কুল অব অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ’ এ দুই বছর পড়াশোনা শেষে ‘মুর্শিদকুলি খান এন্ড হিজ টাইমস’ রচনা করে ২য় বার পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫১ সাল হতে তিনি ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে বিভিন্ন সেমিনারে যোগদান করে আন্তজার্তিক মহলে ব্যাপক পরিচিত লাভ করেন। তিনি একই সাথে এশিয়াটিক সোসাইটির সেক্রেটারী এবং বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতি ছিলেন (১৯৬৪-১৯৬৬)।
চট্টগ্রাম দরদী এই কিংবদন্তি পুরুষ ১৯৬৬ সালে প্রাণের টানে চট্টগ্রামে জ্ঞানের আলোর মশাল জ্বালাতে তৎকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভি.সি ড. মল্লিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইতিহাস বিভাগে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন । এই বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি ‘ইতিহাস’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তিনি ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক হল ‘আলাওল বডিন ছিলেন ১৯৭০-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি কবি ও সাহিত্যিক আবুল ফজল বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টা নিযুক্ত হলে তিনি প্রথমে অস্থায়ী এবং পরে স্থায়ী ভিসি হিসেবে দায়িত্বপালন করেন ২৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সাল থেকে ১৮ই এপ্রিল ১৯৮১ সাল পর্যন্ত । ১৯৮১ সালে পাকিস্তানি নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক আব্দুস সালামকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেন তিনি। দীর্ঘ সময় ভিসি দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি হাটহাজারী কলেজ ও বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন । অবসরের পর ১৯৯০ সালে পশ্চিম বাঁশখালী উপকূলীয় ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং এর গর্ভর্ণিং বড়ির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই মহান শিক্ষাবিদ কে ১৯৯২ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এবং তারই এক সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার জাতীয় অধ্যাপক করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি প্রাণপ্রিয় চট্টগ্রাম শহরকে ছেড়ে যেতে রাজি না হওয়ায় এই সুযোগ হাতছাড়া হয়।
ড. করিম সাহেবের তুলনা তিনি নিজেই। তার মননশীল চিন্তা, গভীর জ্ঞানের পরিসীমা, তথ্যসমৃদ্ধ লেখা ও গবেষণা তাকে এক পাহাড়সম উঁচু অবস্থানে নিয়ে যায় । তিনি ৪০টির মত গবেষণা গ্রন্থ লিখেছেন। তার মধ্যে “ঢাকাই মুসলিন, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, বাংলার সুলতানী আমল, চট্টগ্রামের ইতিহাস , বাংলার সূফী সমাজ, মক্কা শরীফে বাঙ্গালী মাদ্রাসা, বাংলার ইতিহাস মোঘল আমল, বাংলার ইতিহাস ও এতিহ্য , বাশঁখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সমাজ ও জীবন” ইত্যাদি । তার এই গবেষণার স্বীকৃতি হিসাবে আকবর সিলভার মেডেল (১৯৬০), একুশে পদক (১৯৯৫), জাতিসংঘের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আই.এ.আর. এফ শান্তি পদক (১৯৯৫) , ড. এনামুল হক পদক (২০০২), আব্দুল হক চৌধুরী স্বর্ণ পদক (২০০২) , বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির গোল্ড মেডেল (২০০৫), এশিয়াটিক সোসাইটির গোল্ড মেডেল (২০০৬) সহ অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হন ।
ড. আব্দুল করিম নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান । অসংখ্য জ্ঞানী- গুণী ব্যক্তি তাঁর হাত ধরেই সৃষ্টি হয়েছে।চট্টগ্রামের অসহায়- দরিদ্র ছেলেদের জন্য তাঁর দরজা সব সময় খোলা থাকতো।কিন্তু দুর্ভাগ্য বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামে লইট্টা মাছ ব্যাপারীর মূল্য আছে, মরিচ ব্যাপারীর সম্মান আছে কিন্তু ড. আব্দুল করিম, ড. মোঃ ইউনুস, ড. জামাল নজরুল ইসলাম এর মত জ্ঞানী -গুণী লোকের মূল্যায়ন নেই। অথচ তারা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোভনীয় পদ ছেড়ে নাড়ীর টানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন এবং বিনিময়ে হাজারো দু:খ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে তাদের। কিন্তু শত ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে তারা স্থান করে নিয়েছেন জনগণের হৃদয়ের মণিকোঠায় এবং ইতিহাসের পাতায়।
ড. অধ্যাপক আব্দুল করিমকে ১৯৯৫ সালে ইমেরিটাস অধ্যাপক করার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে একটি অংশের বিরোধীতায় তা ভেস্তে যায়। পরে ২০০১ সালের নভেম্বরে সরকার পরিবর্তন হলে তাকে এই পদে সম্মানিত করা হয় । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন । এই মহান ব্যক্তি পথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে, হাজারো ভক্ত-সমর্থক, ছাত্র-শিক্ষকের চোখে অশ্রু ঢেলে ২০০৭ সালের ২৪ জুলাই পৃথিবী
থেকে বিদায় নেন। ড. আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের ১৬তম মৃত্যু বার্ষিকীতে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পার্শ্ববর্তী পেকুয়ার সন্তান হিসেবে এবং তাঁরই প্রাণপ্রিয় বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে এই ইতিহাস বিশারদ কে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ পাক যেন এই শিক্ষাবিদ কে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।
কিউএনবি/অনিমা/৩১ জুলাই ২০২৩,/দুপুর ২:৪৬