রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম
নেত্রকোনায় কে,আর,খান পাঠান সাহেরের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত বায়তুল মোকাররমে শহীদ খামেনির গায়েবানা জানাজা ইরানের হামলায় ৩ মার্কিন সেনা নিহত খামেনিকে হত্যা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা ইরানের হামলায় আমিরাতে বাংলাদেশি নিহত মাঠে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে ফিফা, আসছে নতুন নিয়ম জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে অপরাজিত থেকে সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩ মার্চ চন্দ্রগ্রহণ, বিভাগীয় শহরে যখন দেখা যাবে মহাজাগতিক দৃশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে সকল প্রতিষ্ঠানকে বৈষম্যহীন ও আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে: পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। শরীয়তপুর টাইলস-স্যানেটারী-থাই ও হার্ডওয়ার ব্যবসায়িদের ইফতার

একজন টাইগার জিয়া : মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ

লুৎফর রহমান। রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট।
  • Update Time : সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ১২০৬ Time View

একজন টাইগার জিয়া : মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ
————————————————————————
আমার সঙ্গে ফেসবুকে নতুন একজন সংযুক্ত হয়েছেন। ইদানিং কেউ ফেসবুকে সংযুক্ত হলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার প্রোফাইল দেখি, এলবাম দেখি। ফেক আইডির ছিটেফোঁটা কোথাও পরিলক্ষিত হলে সঙ্গে সঙ্গেই রিমুভ করে দেই। আমার ফেসবুক আইডিটি ফেক আইডি মুক্ত বলা যেতে পারে।

ফেসবুকে সংযুক্ত নতুন বন্ধুটির আইডি প্রোফাইল এবং এলবামে চোখ বুলাতে যেয়ে এক জায়গায় থমকে দাঁড়ালাম। ছবিতে একজন পিতা ও কন্যা নির্দেশিত হয়েছে। ছবির পিতা একজন নবজাতক শিশু কন্যাকে নিজ গালে ছুঁয়ে আদর করছে। আরেকটি ছবিতে এই শিশু কন্যাটি যুবতীতে পরিণত হয়েছে। যুবতী তার পিতার গলা ধরিয়ে আছে। যুবতীর গলা জড়িয়ে থাকা এই পিতাকে আমি চিনি। দেখিনি কোন দিন। কিন্তু তার শৌর্য,বীর্য এবং গৌরব গাঁথা জেনেছি শৈশব থেকে। সুন্দর বনের টাইগার খ্যাত এই মানুষটিকে তুলে আনতে চাই ইতিহাসের পাতা থেকে।

পৃথিবীর বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। সুন্দর বনে দুনিয়া জোড়া নামকরা অসংখ্য চারপেয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস। কিন্তু এরমাঝেই একটি দু পেয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও বাস করতেন। ”টাইগার জিয়া” খ্যাত এই বাঘটিই দেশ কাঁপিয়েছিল একদা। শৌর্য বীর্যময় এই টাইগার জিয়ার আসল নাম মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ।

মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন আহমেদ বা মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাবসেক্টর কমান্ডার। জিয়াউদ্দিন ১৯৫০ সালে পিরোজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দীন আহমেদ। তিনি পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর জন্মগতভাবে পারিবারিক নাম ছিল “আবুল মোমেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ”, কিন্তু নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময় নিজেই নাম পরিবর্তন করে রাখেন “আলী হায়দার জিয়াউদ্দিন আহমেদ”। জিয়াউদ্দিন আহমেদ পিরোজপুর সরকারী শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৬৮ সালে পিরোজপুর মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন এবং সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭১ সালে সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রারম্ভে মার্চ মাসের ২০ তারিখ তিনি ছুটি নিয়ে দেশে আসেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ৯ নং সেক্টরের আওতাধীন সুন্দরবন উপ-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন অঞ্চলে শত্রুদমনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে ‘মুকুটহীন সম্রাট’ উপাধি দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ব্যারাকে ফিরে যান এবং মেজর হিসেবে পদমর্যাদা পান।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু যখন সপরিবারে নিহত হন তখন তিনি ডিরেক্টরেট অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিএফআই), ঢাকা ডিটাচমেন্টের অফিসার ইন চার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

৭ নভেম্বর লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহি জনতার বিপ্লবে তিনি অংশ নেন। এরপর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহেরের সৈনিক সংস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তার অনুসারীদের নিয়ে সুন্দরবনে আশ্রয় নেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে সেনা অভিযানে মেজর জিয়াউদ্দিন গ্রেফতার হন। সামরিক আদালতে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি ও আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ নিয়ে তখন সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন শুরু করলে আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সঙ্গে মেজর জিয়াউদ্দিনও ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে জেনারেল এরশাদের সময় মেজর জিয়াউদ্দিন দেশ ছেড়ে ব্যাংককে  আশ্রয় নেন।

১৯৮৪ সালের অক্টোবরে ব্যাংককে থেকে ফিরে ছোটভাই কামালউদ্দিন আহমেদ, ভাগ্নে শাহানুর রহমান শামীম ও কয়েককজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের দুবলার চরে। বনদস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুঁটকি মাছের ব্যবসা শুরু করেন। তিনি ১৯৮৯-৯১ সালে বিপুল ভোটে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগ পিরোজপুর ইউনিয়নের উপদেষ্টা ছিলেন।

তিনি ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ কর্মসূচি নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনও জেলেদের নিয়ে, কখনও প্রশাসনকে সহায়তা দিয়ে ডাকাতদের নির্মূলে অবদান রেখেছেন তিনি। এ কারণে সুন্দরবনের একাধিক ডাকাত গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এসব ডাকাত গ্রুপ জিয়াউদ্দিনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। তিনি একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন।

সর্বশেষ মোর্তজা বাহিনীর সদস্যরা পূর্ব সুন্দরবনের হারবাড়ীয়া ও মেহেরালীর চর এলাকার মাঝামাঝি চরপুঁটিয়ায় মেজর জিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বন্দুকযুদ্ধে মোর্তজা বাহিনীর চার সদস্য নিহত ও মেজর জিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। মুক্তিযুদ্ধে নিজের ও অন্যান্যদের অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি “মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনের উন্মাতাল দিনগুলি” নামে একটি বই লিখেছেন। যেটা মুক্তিযুদ্ধের একটি জীবন্ত দলিল।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ একজন লেখক ও সাংবাদিক ছিলেন। তিনি কানিজ মাহমুদাকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের চার সন্তান। কানিজ সাজিয়া আহমেদ হাসান, জাকিরউদ্দিন আহমেদ অনিরুদ্ধ, কানিজ তাজিয়া আহমেদ সাথী ও জাহিদউদ্দিন আহমেদ অভিক। আজ ফেসবুকে যিনি আমার ফ্রেন্ডলিস্টে সংযুক্ত হয়েছেন তিনি হলেন কানিজ তাজিয়া আহমেদ সাথী।

সুন্দরবনের টাইগার খ্যাত মেজর জিয়া ২০১৫ সাল থেকে যকৃতের অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ১ জুলাই ২০১৭ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। ২৮ জুলাই ২০১৭ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করে। তাঁকে পিরোজপুরের পরেরহাট সড়কের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

একজন মেজর জিয়ার ইতিহাস যেন বাংলাদেশের ইতিহাস। নির্লোভ নায়কোচিত ব্যক্তিত্ব আর উদার মনের অধিকারী হওয়ার কারণে রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে থেকেও ভীষণ জনপ্রিয় থেকেছেন। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি। বহুবিধ কারণেই মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন ছিলেন এক আলোচিত মানুষ। সাধারণ্যে মুক্তিযোদ্ধা জিয়া, সুন্দরবনের জিয়া, টাইগার জিয়া হিসেবেই তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। গুছিয়ে কথা বলতেন। কথায় ক্লাসিক্যাল আমেজ ঝরে পড়তো। কবি নজরুলের মতো বাবরি দুলানো চুল তাঁকে আলাদাভাবে চিনিয়ে দিত। আড্ডায় আলাপনে কবিতা আবৃত্তি করতেন। পরপারে ভাল থাকুক মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ।

( চলবে )

 

 

লেখকঃ লুৎফর রহমান। রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট।

 

 

 

 

০৫.০৯.২০২২/ বিকাল ৫.২০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

March 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit