বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ন

কিভাবে কাজ করে ডিজিটাল মুদ্রা, কাগজের নোট থাকবে না?

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১০ জুন, ২০২২
  • ১৬৬ Time View

ডেস্ক ‍নিউজ : বাংলাদেশে ২০২২-২৩ অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়টি পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিয়ে বলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে এই মুদ্রা চালুর জন্য এর সম্ভাব্যতা যাচাই করবে সরকার।

মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার বাড়তে থাকায় এখন অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিজস্ব মুদ্রার ডিজিটাল সংস্করণ চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো ভার্চুয়াল লেনদেনের অর্থ আদান প্রদান সহজ করা এবং স্টার্টআপ ও ই-কমার্স ব্যবসাকে উৎসাহ দেয়া।

এসব কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা চালু নিয়ে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হবে বলে বাজেট ভাষণে জানিয়েছেন তিনি।

ডিজিটাল মুদ্রা আসলে কী
বিশ্বে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রা। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিটকয়েন, লাইটকয়েন, এথেরিয়াম, রিপলের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেন হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশে এগুলো বৈধ নয়।

ডিজিটাল এসব মুদ্রা লেনদেন হয় ভার্চুয়ালি অর্থাৎ টাকা বা কাগজের নোটের মতো এগুলো দৃশ্যমান নয়। তবে এখন যেসব ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে সেগুলোর কার্যত কোন কর্তৃপক্ষ নেই এবং যে কান জায়গা থেকে যে কোন ব্যক্তি যে কোন সময় এর লেনদেন করতে পারেন।

অর্থাৎ পুরো বিষয়টি হয় যে কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যদিও কোন কোন দেশ এখন খতিয়ে দেখছে যে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে কীভাবে একটি মনিটরিংয়ের আওতায় আনা যায়।

২০০৯ সালে প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা হিসেবে এসেছিলো বিটকয়েন এবং এক পর্যায়ে এই বিটকয়েনের দাম ৬০ হাজার ডলারও ছাড়িয়েছিলো। কিন্তু এর লেনদেন , বিনিময় হার এবং আইনগত ভিত্তি না থাকায় বড় বড় প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে এসব মুদ্রা নিয়ে।

এ কারণেই এখন আলোচনায় এসেছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজিটাল মুদ্রা ইস্যু করা যায় কি-না।

ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিশেষজ্ঞ তহুরুল হাসান বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কাগজের নোট বা মুদ্রা সরবরাহ করে তা ভল্টে বা মার্কেটে মানুষের পকেটে থাকে এবং সেটি দেখা যায়। কিন্তু ডিজিটাল মুদ্রা এমন দৃশ্যমান হবে না।

“অনেকটা বিকাশ বা নগদে যেমন ডিজিটাল ওয়ালেটে টাকা থাকে ডিজিটাল মুদ্রাও তেমনি থাকবে। তবে নগদে বা বিকাশে যেমন ক্যাশ টাকাটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা এজেন্টকে দিয়ে আনাতে হয়- এখানে তা হবে না। এখানে শুরু থেকেই সব ডিজিটাল হবে,” বলছিলেন তহুরুল হাসান।

অর্থাৎ হয়তো কেন্দ্রীয় ব্যাংক একশ টাকা ইস্যু করবে। এর মধ্যে সত্তর টাকা কাগজের নোট আর বাকী ত্রিশ টাকা ডিজিটাল।

এখন কেউ যেমন কাগজের নোট সংগ্রহ করে পকেটে রাখতে পারবে তেমনি ওই ত্রিশ টাকা থেকে ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে তার অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে রাখতে পারবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের শিক্ষক ডঃ সুবর্ণ বড়ুয়া বলছেন ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার আপডাউন করে কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা ইস্যু করলে সেটি টাকার মতোই ব্যবহার হবে।

অর্থাৎ একশ টাকার কাগজের নোটের যে ব্যবহার ও যে মান -ঠিক সেই একই ব্যবহার হবে একশ টাকার ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রেও।

তিনি বলছেন কাগজের নোটের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার একটি অ্যাসেট ব্যাকআপ থাকবে। অর্থাৎ বাজারে আসা টাকার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেমন রিজার্ভ বা সোনা থাকে তেমনটি হবে ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রেও।

লেনদেন কিভাবে করা যাবে
ডিজিটাল মুদ্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইস্যু করলেও এর জন্য একটি ইকো সিস্টেম দরকার হবে বলে মনে করেন তহুরুল হাসান। অর্থাৎ টাকার মতোই সব কাজে সব জায়গায় এই ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে পণ্য বা সেবা ক্রয় বিক্রয়ের সুযোগ থাকতে হবে।

তিনি বলছেন, ‘প্রত্যন্ত এলাকার একজন মুদি দোকানীকেও সেটি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। অর্থাৎ এটা হবে কাগজের নোটের মতো সার্বজনীন। শুধু ব্যবহারটা হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে।’

বড়ুয়া অবশ্য বলছেন যে এই সার্বজনীন করাটাই হবে ডিজিটাল মুদ্রায় লেনদেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কাজ।

“বাজার ও জনসাধারণকে প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশে বিকাশকে গ্রহণ করাতেই দশ বছর লেগেছে। তাই ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রে দরকার হলে আরও সময় নিতে হবে,” বলেন তিনি।

ডিজিটাল মুদ্রা চালু হলে এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি গ্রাহকের সাথে কাজ করা শুরু করবে। সেক্ষেত্রে এখন যেসব বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রাহকের সাথে সরাসরি কাজ করে তাদের ভূমিকা কী হবে সেটাও দেখার ব্যাপার হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

কাগজের নোট কি থাকবে না?
এখন মুদ্রা আছে তিন ফরম্যাটে- কাগজের মুদ্রা, ই-মানি (মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস), ক্রিপ্টোকারেন্সি (বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রা)। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের মুদ্রা ডিজিটাল ফরম্যাটে আনলে সেটি হবে বৈধ ডিজিটাল মুদ্রা।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল মুদ্রা কখনো চালু হলে তার আগে অনেক প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু সেই ডিজিটাল মুদ্রা এলে কাগজের মুদ্রা থাকবে না- এমনটি কেউই মনে করছেন না।

সুবর্ণ বড়ুয়া বলছেন দেশের সব মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই এবং যাদের নেই তারা কিভাবে ডিজিটাল মুদ্রা পাবেন?

“কাগজের মুদ্রা বিদায় হবে বলে মনে হয় না। বরং দুটিই সমান্তরাল ভাবে চলতে হতে পারে। যাতে করে মানুষ ডিজিটাল মুদ্রা নগদে রূপান্তর করতে পারে সেই সুযোগও থাকতে হবে,” বলছিলেন তিনি।

তহুরুল হাসানও বলছেন যে তিনি মনে করেন কাগজের মুদ্রা সহজে বিদায় হবে না। বরং ডিজিটাল মুদ্রা করার আগে বাজার ও মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যা খুবই সময়সাপেক্ষ হতে পারে।

ঝুঁকি কোথায়
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো ডিজিটাল মুদ্রা হ্যাক হলে মানুষ কী সেই অর্থ আর ফেরত পাবে কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে টাকা চুরি হলে তার নিয়ন্ত্রণ কিভাবে হবে?

বাংলাদেশে করোনাকালে সরকার উপবৃত্তির যে টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে দিয়েছে সেই টাকা অনেক শিক্ষার্থীর অগোচরে অন্যরা তুলে নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তানভীর হাসান জোহা বলছেন ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হবে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি।

তিনি বলেন, ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহারের জন্য মানুষ ইন্টারনেটে যুক্ত হবে ও পাবলিক নেটওয়ার্কে থাকবে। কিন্তু সেখানে সাইবার নিরাপত্তা কতভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে সেটি আগে যাচাই করে দেখতে হবে। ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে। এগুলো ঠিক মতো না করে ডিজিটাল মুদ্রা চালু হবে সেটি চরম ঝুঁকির হবে।

অন্যদিকে ডঃ সুবর্ণ বড়ুয়া বলছেন ডিজিটাল ওয়ালেট বা লেনদেনের বিষয়টি প্রযুক্তিগতভাবে দেখভাল করাটাও চ্যালেঞ্জের বিষয় হবে এবং সবাইকে নিজের ওয়ালেট ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে। এগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকতে হবে।

প্রসঙ্গত, বিকাশ বা নগদের পাসওয়ার্ড বা পিন গোপন না রাখার কারণেও অনেকে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

কোন দেশে কি ডিজিটাল মুদ্রা চালু হয়েছে?
ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে সম্প্রতি এক ওয়েবিনার উপস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট এর অতিরিক্ত পরিচালক শাহ মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানিয়েছেন যে ক্যারিবিয়ান দ্বীপ বাহামা ও নাইজেরিয়া ডিজিটাল মুদ্রা চালু করেছে।

অন্যদিকে চীন পাইলট প্রজেক্ট শেষ করে সব প্রস্তুত করলেও এখনো ডিজিটাল মুদ্রা ইস্যু করেনি। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো কিছু দেশ ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও অ্যাসেট হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে।

তবে বাংলাদেশে কারেন্সি ও অ্যাসেট- কোন ভাবেই এটি বৈধ নয়।

তবে ঘানা ও জ্যামাইকা শিগগিরই ডিজিটাল মুদ্রা চালু করতে যাচ্ছে। সুইডেন পাইলট সম্পন্ন করেছে কিন্তু চালু করেনি। কানাডা পাইলট করে এখনই চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা নতুন করে এ নিয়ে গবেষণা করবে বলে জানিয়েছে।

শাহ মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলছেন কাগজের মুদ্রার সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রার পার্থক্য হলো ফরম্যাটে।

“দুটির লেনদেন ও ব্যবহার পদ্ধতি ভিন্ন। তবে ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে আরও পরিপক্ব হতে হবে। সবাইকে সেটি গ্রহণ করতে হবে। এ পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ডিজিটাল মুদ্রা চালু করা যাবে না,” ওয়েবিনারে বলছিলেন তিনি।

ডিজিটাল মুদ্রায় কী লাভ হবে
শাহ মোহাম্মদ জিয়াউল হকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে টাকা ছাপানো ও নিয়মানুযায়ী নষ্ট বা ব্যবহার অযোগ্য টাকা ধ্বংস করতে গত বছরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। টাকা ছাপানোর পর বিতরণেও হয়ে থাকে বিপুল খরচ। ডিজিটাল মুদ্রা চালু হলে এসব খরচ বেঁচে যাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর।

এছাড়া সব ধরনের পেমেন্ট এবং যে কোন লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা যাবে বলে সাধারণ মানুষেরও লেনদেনজনিত ব্যয় কমবে।

অথচ এখনো ঢাকার সুপরিচিত শপিং মলগুলোতেই সব ব্যবসায়ীরা কার্ডে টাকা নিতে চান না। 

এসব সুবিধার কারণেই স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মুদ্রার বিষয়ে চিন্তা শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে। 

জিয়াউল হক বলছেন বাংলাদেশেও ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে পাইলট প্রজেক্ট করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সূত্র: বিবিসি

কিউএনবি/অনিমা/১০.০৬.২০২২ খ্রিস্টাব্দ/বিকাল ৪:৪৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

September 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit