শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

ডেমোক্র্যাটদের জয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পাকিস্তান

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বৈশ্বিক অর্থনীতির মুখে গত দুই বছর ধরে পাকিস্তানের নেতারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছেন। ইরানের চলা সংঘাতের মধ্যেও দেশটির নেতারা ওয়াশিংটনের হয়ে মধ্যস্ততা করে গেছেন। তবে মঙ্গলবারের কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর হোয়াইট হাউসে তাদের প্রবেশাধিকার কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাধারণ পাকিস্তানিরা অবশ্য এই ফলাফলকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের অনেকেরই আশা, ওয়াশিংটনে ক্ষমতার এই পরিবর্তন জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত সংকটকে কিছুটা শিথিল করবে। কেননা তেহরানের সঙ্গে চলা সংঘাতের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল। ভোটের পর রয়টার্সের কাছে সাক্ষাৎকার দেওয়া পাকিস্তানের নাগরিকরা জানিয়েছেন, তারা আশা করছেন ওয়াশিংটনে ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রভাব শিগগিরিই ২৪ কোটিরও বেশি মানুষের এই দক্ষিণ এশীয় দেশটিতে অনুভূত হবে। যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া তেলের দাম অধিকাংশ পরিবারের ওপর বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করাচির বাসিন্দা সাজ্জাদ আলী বলেন, আমরা মনে করি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়। মার্কিন সরকারে পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত চলমান রক্তপাত থামবে না। আমরা শান্তি চাই, অর্থনৈতিক উন্নতি চাই এবং তেলের ক্রমবর্ধমান দামের হ্রাস চাই। করাচিরই আরেক বাসিন্দা আসিম জাফর আশা প্রকাশ করেন, এই ফলাফল ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।

তিনি বলেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারে এবং সম্ভবত মুসলিম দেশগুলোর ওপর হওয়া কিছু অবিচার রোধ করতে সহায়তা করতে পারে। তবে ​​বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সরকার এবং শক্তিশালী সামরিক নেতৃত্বের জন্য এই ফলাফল অনেক বেশি উদ্বেগের কারণ। ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টার মধ্যে ইরান সংকটে মধ্যস্থতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাকিস্তানের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছিল।

তবে এই ঘনিষ্ঠতা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনেনি। বরং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে ইসলামাবাদের লেনদেন নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের কঠোর নজরদারি এখন সেই প্রত্যাশিত সুফলগুলোর ওপরই অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকেই শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ট্রাম্প বারবার তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন। এই কর্মকর্তা হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছেন।

গত বছরের জুনে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে পাকিস্তানের কোনো বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না, যা এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে সামরিক বাহিনীকে নিয়ে আসে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভাষ্যমতে, তাদের আলোচনায় নিরাপত্তার পাশাপাশি খনি শিল্প, জ্বালানি খাত এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিষয়ে সহযোগিতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এরপর পাকিস্তান ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’-এ যোগ দেয় এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। তাদের দাবি, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সংঘাত অবসানে ট্রাম্প ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও নয়াদিল্লি মার্কিন মধ্যস্থতায় সংঘাত থামার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান ইস্যুতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটি একটি কৌশলগত ভিত্তি পায়। ইসলামাবাদ তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করে এবং এপ্রিলে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করে। তবে শেষ পর্যন্ত ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’ খুব দ্রুতই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাব সাধারণ মানুষের জন্য যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বোঝা থেকে খুব একটা সুরক্ষা দিতে পারেনি, আবার রাষ্ট্র হিসেবেও পাকিস্তান এর থেকে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সুবিধা পায়নি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউএস এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক পাকিস্তানের ‘রেকো দিক’ তামা ও স্বর্ণ প্রকল্পের জন্য ১.২৫ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন করেছে। তবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের কাছে পাকিস্তানের ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার বড় অনুরোধ ছিল, তার কোনো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

পাকিস্তানের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন উদ্যোগ এখন রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারণ এর মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তির সাথে ট্রাম্পের পরিবার বা তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ইসলামাবাদ ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’-এর সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যা ট্রাম্পের সাথে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান এবং তারা ‘ইউএসডি১’ নামে একটি ‘স্টেবলকয়েন’ ইস্যু করে। জানুয়ারিতে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বলেন, যেকোনো উদ্ভাবন অবশ্যই ‘নিয়মনীতি, স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ হতে হবে।

এছাড়া ম্যানহাটনের রুজভেল্ট হোটেল পুনর্নির্মাণের জন্যও একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, ওই চুক্তির মধ্যস্থতাকারী ছিলেন স্টিভ উইটকফ। পাশাপাশি, ‘পাওয়ারাস’ নামের একটি কোম্পানি থেকে ড্রোন কেনার সীমিত একটি আদেশও দিয়েছে পাকিস্তান। এই কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছেন ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়র এবং এরিক। সেপ্টেম্বর মাসে ‘পাওয়ারাস’ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি রয়টার্সকে বলেন, এখানে স্বার্থের সংঘাতের কোনো অবকাশ নেই।

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আবুধাবি-ভিত্তিক ‘আনওয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমি’-র সিনিয়র ফেলো হুসাইন হাক্কানি বলেন, পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পের দলের সাথে এক ধরনের ‘লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক’ গড়ে তুলেছেন। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের বন্ধু ও আত্মীয়দের সাথে করা কিছু চুক্তি হয়তো ‘টেকসই হবে না’। তার মতে, এই ধরনের কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাকিস্তান সম্ভবত মোটেও প্রস্তুত নয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘স্টিমসন সেন্টার’-এর সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল মার্কি সতর্ক করে বলেছেন, যদি মনে হয় চুক্তিগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, তবে তা সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের হাতে এখনো হয়তো কিছু কৌশল বা সুযোগ বাকি থাকতে পারে।

‘আটলান্টিক কাউন্সিল’-এর মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে পাকিস্তানের সহযোগিতা এবং ইরানের বিষয়ে তাদের কূটনৈতিক অবস্থান উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের উভয় দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) সমর্থন রয়েছে। তাই কোনো বিতর্কিত চুক্তির দায়ভার পাকিস্তানের ওপর চাপানোর চেয়ে ডেমোক্র্যাটরা বরং ট্রাম্পের ওপরই তা আরোপ করার সম্ভাবনা বেশি রাখেন। তবে কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকিটি হলো, তারা তাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রায় সবটুকুই হোয়াইট হাউসের ঝুড়িতে (বর্তমান প্রশাসনের ওপর) বিনিয়োগ করে ফেলেছে, যার ফলে ডেমোক্র্যাটদের জন্য তাদের হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

সূত্র: রয়টার্স।

কিউএনবি/অনিমা/০৬ নভেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৪৫

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

November 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit