সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১১ পূর্বাহ্ন

ব্যাংক খাতের মাফিয়া নজরুল, ৩৫ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন যেভাবে

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪১ Time View

ডেস্ক নিউজ : নজরুল ইসলাম মজুমদার। নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘসময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিতি পান তিনি। বছরের পর বছর বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যানের পদও ধরে রাখেন। হাসিনাসহ তার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগের বিষয়টি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশের ব্যাংক খাতের অঘোষিত মাফিয়া হয়ে উঠেন নজরুল। ঋণের নামে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে লুটে নেন প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। যার বড় অংশ দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন। লুটের সেই টাকা দিয়ে বিদেশে সাম্রাজ্য গড়েছেন তিনি। 

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে- যুক্তরাজ্য, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ আইল অব ম্যান, জার্সি দ্বীপ ও হংকংসহ বিভিন্ন দেশে গেছে সেই অর্থের একটি বড় অংশ। এছাড়া বিদেশে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি, কেনা হয়েছে বিপুল সম্পদ এবং খোলা হয়েছে ব্যাংক হিসাবও। এবার এসব চাঞ্চল্যকর তথ্যের অনেকাংশ জানতে পেরেছে দুদক। জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রীর প্রকৃত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে থাকা ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।

আবেদনে বলা হয়, নজরুল ইসলাম মজুমদার, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীরা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এসব অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচার করা অর্থের গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে উল্লেখ দেশ ও বিশেষ স্থানের নাম। দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র যুগান্তরকে জানায়, নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে বিদেশে নেওয়ার জন্য একাধিক কৌশল ব্যবহার করেছেন। ব্যাংকঋণ, বাণিজ্যিক লেনদেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছে দুদক। পরে এসব অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে থাকা কোম্পানি ও ব্যাংক হিসাবে গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষায়-টাকা সরানো ও পাচারের এই জটিল কৌশলে নজরুল যেন ‘ম্যাজিক মাস্টার’।

জার্সিতে ৫৩ লাখ পাউন্ড : দুদকের অনুসন্ধানে নজরুলের বিদেশি সম্পদের যে হিসাব সামনে এসেছে, তার অন্যতম হলো ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আইল অব ম্যানের ঠিকানায় নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই বছরের ২ অক্টোবর জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির নামে হিসাব খোলা হয়। গত ৬ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ওই হিসাবে জমা ছিল ৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ৫৩ লাখ পাউন্ড। দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলাম।

কিন্তু এসব অর্থ সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা এবং সম্পদ হস্তান্তর ঠেকাতে আদালতে এসব অর্থ ও সম্পদ জব্দের আবেদন করে দুদক। আদালত জার্সির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব এবং ওই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ঋণের জাল ২৬ ব্যাংকে : নজরুলের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের তথ্য উঠে এসেছে দুদকের অনুসন্ধানে। একাধিক ব্যাংকে একই কায়দায় ঋণ নেওয়া হয়েছে। কোথাও গ্রুপের এক প্রতিষ্ঠানের নামে, কোথাও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে। আবার কোথাও বিশেষ সুবিধায় ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এভাবে এক ব্যাংকের টাকা দিয়ে আরেক ব্যাংকের দায় সামাল দেওয়ার ব্যবস্থাও চলেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুসন্ধানে উঠে আসে। একটি ব্যাংক থেকে নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়। যে তথ্য এর আগে যুগান্তরে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৯৯৮ কোটি টাকা বিশেষ বিবেচনায় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও এসব ঋণ নিয়ে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। নাসা গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও সুতা ব্যবসার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে ঋণের বড় অংশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর তালিকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকই রয়েছে। দুদকের সর্বশেষ অনুসন্ধানে এই ঋণের হিসাব গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায়।

ব্যাংকের টাকা লুটে বিদেশে সম্পদ : অভিযোগের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো-ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল অর্থের একটি অংশ দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিভিন্ন পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাকে ব্যবহার করে অর্থ সরানোর অভিযোগও এসেছে। পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে বিদেশে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো, রপ্তানি পণ্যের মূল্য দেশে না এনে বিদেশে রেখে দেওয়া এবং কম মূল্য দেখিয়ে বাকি অর্থ অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো কৌশলের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। অর্থ পাচারের আরেকটি পথ হিসাবে উঠে এসেছে বিদেশি কোম্পানি। যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে নজরুলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক কোম্পানির তথ্য দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়। বিদেশে এসব কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সম্পদ কেনার তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:২১

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit