ডেস্ক নিউজ : বিএনপির সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড ও ‘মুতা বিয়ে’ নিয়ে সংসদে বক্তব্য দেন। এরপর নতুন করে আলোচনায় এসেছে পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনা। এ বিষয়ে এবার সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন মামুনুল হক নিজেই।
তিনি লেখেন, রিসোর্টের রিসেপশন থেকে জানানো হয় যে, পুরো রিসোর্ট পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। কক্ষের দরজা খোলার পর অনেকেই জোরপূর্বক কক্ষে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার শুরু করে। মামুনুল হক দাবি করেন, তাকে এবং তার স্ত্রীকে নানান উপায়ে হেনস্তা করা হয়। পরিস্থিতি থেকে স্ত্রীকে রক্ষা করতে তাকে ওয়াশরুমে রাখেন। পরে নারী পুলিশ সদস্য এসে ওয়াশরুমে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকেও লাইভ সম্প্রচার চালান।
তিনি আরও লেখেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি এবং জান্নাত আরা উভয়েই নিজেদের বৈবাহিক সম্পর্কের কথা স্পষ্টভাবে জানান এবং সেটি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিতও হয়। তার দাবি, প্রথমে পুলিশ তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। পরে এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তথ্য যাচাইয়ের জন্য ফোনটি ফেরত দেন এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত হন। তবে পরে ডিজিএফআই কর্মকর্তারা এসে তাদের থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আরও দাবি করেন, রিসোর্টের বাইরে তখন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। তিনি তাদের শান্ত করেন এবং পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তার ফেসবুক আইডির লাইভ সুবিধা প্রযুক্তিগতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, জান্নাত আরা আগে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। পরবর্তীতে পারস্পরিক সম্মতিতে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
তার দাবি, বিবাহবিচ্ছেদের পর জান্নাত আরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এক পর্যায়ে তিনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে তিনি আগে থেকেই জানিয়ে দেন যে ইসলাম অনুযায়ী একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। এরপর জান্নাত আরা সম্মতি দিলে শরিয়ত অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয় বলে তিনি দাবি করেন।
বিয়ের পর জান্নাত আরাকে একটি কুরআন শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে দেন এবং পরে তিনি সেলাই ও নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কাজে যুক্ত হন বলেও উল্লেখ করেন মাওলানা মামুনুল হক। বিয়ে গোপন রাখার বিষয়ে তিনি লেখেন, উপমহাদেশে একাধিক বিয়ে সামাজিকভাবে জটিল বিষয়। তাই প্রথম পরিবারে অস্থিরতা তৈরি করতে চাননি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টিও জটিলতা সৃষ্টি করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার দাবি, ইসলামে কাবিন বাধ্যতামূলক নয় এবং তার প্রথম বিয়েতেও কাবিন হয়নি। তবে তার একাধিক বিয়ের বিষয়টি ঘনিষ্ঠজনেরা জানতেন বলে তিনি দাবি করেন।
রিসোর্টে অন্য নাম ব্যবহারের ব্যাখ্যা
পোস্টে মাওলানা মামুনুল হক জানান, তার পরিচয়পত্রে প্রথম স্ত্রী আমিনা তাইয়েবার নাম ছিল। অন্যদিকে জান্নাত আরার পরিচয়পত্রে তার সাবেক স্বামী শহিদুল ইসলামের নাম ছিল। এ কারণে তারা আলোচনার ভিত্তিতে প্রথম স্ত্রীর নাম ব্যবহার করেছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
প্রথম স্ত্রীকে ফোনে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী বলে পরিচয় দেওয়ার বিষয়েও তিনি ব্যাখ্যা দেন। তার ভাষ্য, প্রথম স্ত্রী আগে থেকেই জান্নাত আরাকে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী হিসেবে চিনতেন। তাই বিষয়টি শান্তভাবে উপস্থাপনের জন্য তিনি সেই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির প্রশ্ন তোলেন, তিনি বা জান্নাত আরা কোনো আইন ভঙ্গ করেছিলেন কি না? তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যক্তিগত কল রেকর্ড ফাঁস করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার দাবি, তিনি রাষ্ট্রীয় আইন কিংবা শরিয়তের আইন কোনোটিই লঙ্ঘন করেননি। তারপরও তাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ
পোস্টে মামুনুল হক দাবি করেন, রিসোর্ট ঘটনার পর তৎকালীন এনএসআই মহাপরিচালক তার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন বলে দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জান্নাত আরা, তার বাবা, সাবেক স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। জান্নাত আরাকে দীর্ঘ সময় হেফাজতে রাখা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
আদালত ও সাক্ষ্য প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, জান্নাত আরার ছেলে আব্দুর রহমানকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরেন বলে দাবি করেন। এতে সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
‘মুতা বিয়ে’ প্রসঙ্গে পোস্টে মামুনুল হক জানান, তার বিরুদ্ধে ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’, ‘সাময়িক বিয়ে’ বা ‘মুতা বিয়ে’র যে অভিযোগ প্রচার করা হয়েছিল তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি দাবি করেন, জান্নাত আরার সঙ্গে তার বিয়ে ছিল শরিয়তসম্মত ইসলামি বিয়ে।
জান্নাত আরার বর্তমান অবস্থান প্রসঙ্গে মামুনুল হক জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। তবে ২০২১ সালের ঘটনার পর বিভিন্ন মনোমালিন্যের কারণে আলোচনার মাধ্যমে ২০২৫ সালের মার্চে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
তিনি দাবি করেন, বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এবং নিজের কারাবাসকালেও জান্নাত আরার ভরণপোষণসহ প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে চরিত্র হননের অভিযোগ তুলে মামুনুল হক দাবি করেন, রাজনৈতিক ও আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে তার বিরুদ্ধে চরিত্রহননের চেষ্টা হয়েছে। আদালতেও তাকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, বিভিন্ন সময় তাকে দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে কিংবা আল্লামা বাবুনগরীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি তাতে রাজি হননি। পোস্টের একটি বড় অংশে মামুনুল হক হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনার ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন, কুৎসা রটনাকারীদের কথা বলে সত্যকে আড়াল করা যায় না। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে নিজের সঙ্গে হযরত আয়েশা (রা.)-এর কোনো তুলনা করছেন না, বরং ঘটনাটি থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন।
মাওলানা মামুনুল হক দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল তৎকালীন সরকারের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। তিনি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অতীতে পরিচালিত চরিত্রহননের প্রচারণার উদাহরণও টানেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে ইসলামপন্থি কিছু ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন।
পোস্টের এক পর্যায়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আল ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি ‘মুবাহালা’র আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাইলে যে কেউ তার সঙ্গে এ ধরনের চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে পারেন।
‘৫০১’কে বিজয়ের প্রতীক ঘোষণা
পোস্টের শেষাংশে মামুনুল হক জানান, ‘৫০১’ তার কাছে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং এটি তার ভাষায় ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের পরাজয়ের দলিল’। ‘৫০১’কে তারা বিজয়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং ভবিষ্যতে এটি উদযাপন করবেন। যেখানে এ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবে, সেখানে ‘৫০১’-এর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
পোস্টের শেষে তিনি আল্লাহর কাছে সবার জন্য সুমতি কামনা করেন।
কিউএনবি/আয়শা/২০ জুন ২০২৬,/বিকাল ৪:১৪