ডেস্ক নিউজ : আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের কারণে সৃষ্ট ক্ষত থেকে বড় ধরনের তিনটি দুর্বলতা শনাক্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এগুলো হলো- আগ্রাসী গতিতে বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ, শরিয়াভিত্তিতে পরিচালিত ও চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ এবং আমানতকারীদের জমা অর্থের বিপরীতে মুনাফা প্রদানের হার একেবারেই কম। এসব কারণে ব্যাংক খাত এখনো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে লুটপাটের ক্ষত থেকে কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্রও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো তিনটি দিকে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে-গ্রাহকদের আমানতের প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল থেকে সীমিত আকারে বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে পরিবারভিত্তিক গ্রাহকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে ঋণ ও আমানতের ভারসাম্য এখন স্থিতিশীল রয়েছে। কম সুদে আমানত নিয়ে বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করছে। ফলে আয়ের খাতে লাভজনকতা ফিরে এসেছে। আমানত প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমানতের বিপরীতে ভালো মুনাফা দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে অন্যান্য খাতে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে কম সুদে ঋণও বিতরণ করতে হবে। তাহলে সার্বিক অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদা বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙ্গা হবে। অর্থনীতি গতিশীল হলে ব্যাংক খাতে ঋণের চাহিদা যেমন বাড়বে, তেমনি আমানতের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি টাকার চলাচল বাড়বে। যা জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা মোট ঋণের প্রায় ৩৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর সব আর্থিক সূচকে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। এমনকি অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দেওয়ার মতো সক্ষমতাও হারিয়েছে ব্যাংকগুলো। ফলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে এখন ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধার করতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ ও কমিয়ে আনার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
শরিয়া ভিত্তিতে পরিচালিত ও চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১১টি ব্যাংক দখল করা হয়েছে। এগুলো থেকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে। জালিয়াতির কারণে বাকি ঋণও ফেরত আসছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিনিয়োগ কম হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরেই ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল। যে কারণে আমানতের মুনাফার হারও ছিল একেবারেই কম।
অন্যদিকে ২০২২ সাল থেকে বৈশ্বিক মন্দার কারণে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে গেলেও আমানতকারীদের জমা অর্থের বিপরীতে মুনাফা প্রদানের হার বাড়েনি। ফলে মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থ যেভাবে ক্ষয় হয়েছে, তার বিপরীতে গ্রাহকরা সমহারে মুনাফা পায়নি। মুনাফা পেয়েছে ক্ষয়ের চেয়ে কম। ফলে ব্যাংকে আমানত জমা রেখে গ্রাহকদের লাভ হয়নি। উলটো টাকার ক্ষয় হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে রাখা আমানতের সুরক্ষা না পেলে গ্রাহকরা আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
এসব কারণে ব্যাংক খাতে আমানতে প্রবাহের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে আর বলা হয়, বর্তমানে বেশির ভাগ দুর্বল ব্যাংকই তারল্য সংকটে ভুগছে। এসব ব্যাংক যেসব নতুন আমানত নিচ্ছে সেগুলোর মুনাফার হার বেশি হলেও আগে যেসব আমানত নেওয়া হয়েছে সেগুলোর মুনাফার হার এখনো কম।
কিউএনবি/আয়শা/২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/বিকাল ১:১২