ডেস্ক নিউজ : মানবজীবনের মূল ভিত্তি হলো ঈমান ও আল্লাহভীতি। একজন মুসলমানের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভক্তি, সম্মান, ভালোবাসা ও ভয় সর্বোচ্চ স্থানে থাকে। কারণ আল্লাহই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা ও নিয়ন্ত্রক। মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবনের চলার পথ, মৃত্যুর পরের বিচার—সবই তাঁর হাতে। তাই আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করা, তাঁর মর্যাদাকে হেয় করা, তাঁর বিধানকে উপহাস করা অথবা তাঁর আদেশ অমান্য করে বিদ্রোহী আচরণ করা—এগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কোরআন ও হাদিসে এসব অপরাধের শাস্তির বিষয়ে কঠোর বর্ণনা এসেছে।
আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা কী
ধৃষ্টতা মানে হলো ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, যেখানে কেউ নিজের সীমা ছাড়িয়ে আল্লাহর মর্যাদার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বিদ্রুপ, অপমান বা অমান্যতা প্রদর্শন করে। আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা কয়েকভাবে প্রকাশ পেতে পারে—
১. আল্লাহর অস্তিত্ব, ক্ষমতা বা জ্ঞান নিয়ে ব্যঙ্গ করা।
২. আল্লাহর বিধানকে উপহাস করা।
৩. কোরআনের আয়াত বা শরিয়তের নিয়মকে বিদ্রুপ করা।
৪. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করে প্রকাশ্য অবাধ্যতা করা।
৫. নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ভাবা বা তাঁর সঙ্গে উপহাসমূলক তুলনা করা।
ইসলামের ইতিহাসে ফেরাউন, হামান, সাদ্দাদের মতো ব্যক্তিরা আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। তাদের পরিণতি ছিল ভয়ংকর।
কোরআনে আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতার ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনা
আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ সম্পর্কে অহংকার করে, তাদের অবশ্যই অপমানজনক শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা : গাফির/মুমিন, আয়াত : ৬০)
আরেক আয়াতে এসেছে, ‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য সংকীর্ণ জীবন এবং পরকালে তাকে অন্ধ অবস্থায় ওঠানো হবে।’
(সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১২৪)
ধৃষ্টতা মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। এমন কঠিন হৃদয়কে আল্লাহ ধ্বংসের পথে টেনে নেন। কোরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর আয়াতকে যে উপহাস করে, তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ (সুুরা : জাসিয়া, আয়াত : ৯)
আল্লাহর বিধানকে উপহাস করা বড় গুনাহ
কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিলে? তোমরা অজুহাত দিয়ো না; তোমরা ঈমান আনয়নের পর কাফিরে পরিণত হলে।’
(সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)
অর্থাৎ কেউ খোদা প্রদত্ত বিধান নিয়ে উপহাস করলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটি এমন অপরাধ, যার শাস্তি শুধু দুনিয়ায় নয়, আখিরাতে অনন্ত জাহান্নাম।
গুনাহকে ছোট করে দেখা অন্য রকম ধৃষ্টতা
রাসুল (সা.) বলেন, ‘একসময় মানুষ এমন যুগে পৌঁছবে, যখন তারা বড় বড় গুনাহকেও ঘাসের মতো তুচ্ছ মনে করবে।’ এটাই ধৃষ্টতার আরেক রূপ। মানুষ যখন ভুলকে ‘ছোট ভুল’ বলতে শুরু করে, তখন সে আসলে আল্লাহকে অপ্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার ওপর একজন শয়তানকে কর্তৃত্ব দিই, যে তার সঙ্গী হয়ে যায়।’
(সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৩৬)
কেন আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ
১. এটি মানুষের ঈমান ধ্বংস করে দেয়।
২. সমাজে দুষ্কর্ম, নৈরাজ্য ও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ায়।
৩. আল্লাহর দয়া থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে।
৪. আখিরাতে মুক্তির সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
৫. ইচ্ছাকৃত ধৃষ্টতা শিরক বা কুফরিতে রূপ নিতে পারে।
আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতার দুনিয়াবি শাস্তি
ধৃষ্টতার শাস্তি শুধু আখিরাতের আগুন নয়; দুনিয়ায়ও এর ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায়; যেমন—১. হৃদয় কঠিন হয়ে যাওয়া। ২. বরকত দূর হয়ে যাওয়া। ৩. মনের অশান্তি। ৪. রিজিকে সংকীর্ণতা। ৫. জীবনে ব্যর্থতা ও বিপর্যয়। ৬. সমাজে অপমানিত হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘যে আমার বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য করে, আমি তাকে লাঞ্ছিত করে দেব।’
মানুষ ধারণা করতে পারে যে সে ইচ্ছামতো চলছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার ওপর আল্লাহর গজব কাজ করতে থাকে নীরবে।
আখিরাতে ধৃষ্টতার ভয়াবহ শাস্তি
কোরআনে ধৃষ্টতার জন্য যেসব শাস্তির বর্ণনা এসেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুন, খাঁটি ফুটন্ত পানি পান করানো, লোহার বেড়িতে বেঁধে টেনে হাঁটানো, মুখমণ্ডল অন্ধকার হয়ে যাওয়া, হিসাবের ময়দানে লাঞ্ছনা, সর্বাত্মক হতাশা ও বঞ্চনা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অহংকারের সঙ্গে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৪০)
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘সেদিন অপরাধীদের মুখে কালো কালো চিহ্ন পড়বে।’
(সুরা : ইউনুস, আয়াত : ২৭)
লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা, মাদরাসা, গাজীপুর
কিউএনবি/অনিমা/২৯ নভেম্বর ২০২৫,/সকাল ৬:৪২