মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৮ পূর্বাহ্ন

দুর্গাপূজায় ইলিশ খাওয়া নিয়ে কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যা আছে কী?

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
  • ৫৪ Time View

ডেস্ক নিউজি :  বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্রেফ একটি ঘোষণায় এবছরের দুর্গাপূজাটা মৎস্যপ্রেমী পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কাছে স্বাদহীন হয়ে উঠেছিল।  বলা হয়েছিল, এবার আর পূজার সময় পদ্মার ইলিশ পাঠানো হবে না ভারতে। প্রতি বছর যা সৌজন্য উপহার হিসেবে পাঠানো হতো শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে। 

ক্ষমতার হাতবদল হতেই এই রীতিতে ছেদ পড়তে চলছিল। কিন্তু শনিবার আচমকাই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে বাংলাদেশ। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে ভারতে ৩ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু আদৌ কী দুর্গাপূজার সঙ্গে ইলিশ মাছের কোনো সম্পর্ক আছে? এবিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।  খবর বিবিসির।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্গাপুজোর যে ধর্মীয় আচার, সেখানে কোথাও ইলিশ মাছ বা পদ্মার ইলিশের প্রসঙ্গ নেই। এটি মূলত: প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটি লোকাচার, যা এখন বাঙালিদের একাংশের ‘হুজুগ’-এ পরিণত হয়েছে।

দুর্গাপুজোর সময়ে, অর্থাৎ শরৎকালে ইলিশ মাছ খাওয়ার ‘হুজুগ’ সম্প্রতি শুরু হলেও গাঙ্গেয় বঙ্গদেশে ইলিশ মাছের কথা প্রাচীন সাহিত্যকর্ম এবং পুরাণে একাধিকবার উল্লেখিত হয়েছে বলে জানা যায়।

ইলিশ মাছ নিয়ে লেখা বই ‘ইলিশ পুরাণ’-এ পশ্চিমবঙ্গের ইলিশ-গবেষক দিগেন বর্মন লিখছেন, “ইল্লিশো মধুর / স্নিগ্ধো রোচনো/ বহ্নিবর্জনঃ/ পিত্তিকৃৎ কফকৃৎ/ কিঞ্চিল্লঘু ধর্মোহ নিলাজহঃ, অর্থাৎ ইলিশ মাছ মধুর, স্নিগ্ধ, রোচক ও বলবর্দ্ধক, পিত্তকারী, কিঞ্চিৎ কফকারী, লঘু পুষ্টিকর ও বাতনাশক। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ইলিশ মাছের গুণাগুণ নিয়ে এভাবেই লেখা আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় ইলিশ মাছের প্রতি আমাদের আসক্তি অতি প্রাচীন।

‘আর একটি উদ্ভট শ্লোক লেখার লোভ সামলাতে পারছি না। ইলিশো খলিশশ্চৈব্ ভেটকিমর্দগুর এবচ/ রোহিতো মৎসরাজেন্দ্রঃ পশ্চমৎস্যা নিরামিষাঃ।। সব থেকে ভাল যে পাঁচটি মাছ তার মাথায় রয়েছে ইলিশ। নিরামিষ ভোজীরাও নির্দ্বিধায় নিরামিষ হিসাবে ইলিশ মাছ খেতে পারে অবশ্য তাদের যদি তেমন খাবার ইচ্ছা থাকে,’ লিখেছেন গবেষক দিগেন বর্মন।

তিনি আরও লিখেছেন, ‘পদ্মপুরাণে রান্নার নানারকম বিবরণ আছে – তারকা তার নন্দাই লখিন্দরের জন্য যে রান্না করেছিলেন তাতে মাছ আর শাক দিয়ে রান্নার কথায় – রোহিতের মুণ্ড দিয়া রান্ধে মুলাশাক/ সরিষার শাক রান্ধে ইলিশার শিরে।’

বর্মনের লেখা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে বাঙালির রান্নায় ইলিশ মাছের উপস্থিতি বহু যুগ ধরেই রয়েছে। যদিও দুর্গাপুজোর সঙ্গে ইলিশ মাছের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন।

পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন জানিয়েছেন, প্রাক-আর্যকাল থেকেই বাংলার নানা অঞ্চলের লোক-উৎসবে ইলিশ মাছ খাওয়ার প্রচলন ছিল।

তার কথায়, ইলিশ মাছের সঙ্গে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের একটা নিবিড় যোগ আছে। তার ফলে এই সময়ে নিম্ন বঙ্গে যতগুলো খাদ্যোৎসব হয়ে আসছে প্রাচীন কাল থেকে, তার সবগুলিতেই ইলিশের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেই উৎসবগুলিকে এখনও এই অঞ্চলের লোক-জীবনকে ঘিরে রেখেছে।

‘কুড়মিদের করম উৎসব বা সাঁওতালদের কারাম উৎসবে যে নবপত্রিকার আরাধনা করা হয়, শাকাম্ভরী দুর্গাপুজোতেও সেই নবপত্রিকার পুজো আমরা দেখে থাকি। প্রাচীন লোক-উৎসবগুলির সঙ্গে এখনকার দুর্গাপুজোর যোগটা এখানে। আবার গাসি পুজো, কুলোয় পুজো বা দক্ষিণবঙ্গের আরেকটি বিখ্যাত পুজো – রান্না পুজোতেও ইলিশ বাধ্যতামূলক। রান্না পুজোতে হাজার ব্যঞ্জন রান্না করা হলেও ইলিশ মাছ থাকবেই,’ বলছিলেন গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন।

তিনি বলেন, দুর্গাপুজোয় ইলিশ মাছ ভোগ দেওয়ার যে প্রথা এখন দেখা যায়, তার কোনো পৌরাণিক ব্যাখ্যা নেই। এই প্রথা শুরু হয় অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, কলকাতায় যখন রাজা নব কৃষ্ণ দেব দুর্গাপুজো শুরু করলেন, তার পর থেকে। গোড়ার দিকের ওইসব দুর্গাপুজোয় মূলত: বৈভব প্রদর্শনের অঙ্গ হিসাবেই ইলিশের প্রচলন শুরু হয়। তার আগে পর্যন্ত অবিভক্ত বঙ্গে ইলিশ মাছ ছিল লোক-উৎসবের অংশ।

বাঙালি হোটেল রেস্তোরাঁয় তো বটেই, অনেক পশ্চিমা কায়দার হোটেলেও দুর্গাপুজোর স্পেশাল মেনুতে ইলিশের পদ থাকে। আবার পূর্ববঙ্গীয়দের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর দিনে জোড়া ইলিশ খাওয়ার চল রয়েছে।

সে দিনই ইলিশ খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় প্রজননের সময় শুরু হয় বলে, আবার জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারিতে সরস্বতী পুজোর দিনে ইলিশ খাওয়া শুরু হয়।

দুর্গাপুজোর আচার-রীতির সঙ্গে ইলিশ মাছের কোনো যোগ না পাওয়া গেলেও নিম্ন-বঙ্গ অঞ্চলে যে বর্ষাকালের লোক-উৎসবগুলিতে ইলিশের প্রচলন ছিল, তা একাধিক গবেষক জানাচ্ছেন।

তারা আবার এটাও বলছেন পশ্চিমবঙ্গীয় এবং পূর্ববঙ্গীয় মানুষদের মধ্যে ইলিশ খাওয়ার সময়কালে ফারাক রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গীয়রা দুর্গাপুজোর আগেই ইলিশ খাওয়া বন্ধ করে দেন, অন্যদিকে পূর্ববঙ্গীয়দের একাংশ দুর্গাপুজোর পরে লক্ষ্মীপুজোয় ইলিশ খেয়ে তার পরে ইতি টানেন।

খাদ্য-গবেষক-লেখক ও ফুড ভ্লগার সুরবেক বিশ্বাস বলছিলেন অবিভক্ত বাংলার দুই অঞ্চলের মানুষের ইলিশ খাওয়ার সময়কালের এই ফারাক।

‘যারা খাঁটি পশ্চিমবঙ্গীয়, যাদের আমরা ঘটি বলে থাকি, এরকম বেশ কয়েকটি বনেদী পরিবারের কাছ থেকে আমি জেনেছি যে তারা বর্ষাকালের তিন-সাড়ে তিন মাস ইলিশ খান আর তা শেষ হয় রান্না পুজোয় ইলিশ খাওয়ার মধ্যে দিয়ে, বলছিলেন বিশ্বাস।

দক্ষিণবঙ্গের একটা বড় অঞ্চলে ‘রান্না পুজোর’ যে চল আছে, সেটা সাধারণত দুর্গাপুজোর দিন ১৫ আগে পালন করা হয়। এইদিনেই বাঙালি হিন্দুদের একাংশ বিশ্বকর্মা পুজো করেন। বিশ্বকর্মাকে বাঙালি হিন্দুদের একাংশ কারিগরির দেবতা বলে মনে করেন।

‘পশ্চিমবঙ্গীয় বনেদি পরিবারগুলি মনে করে যে রান্না পুজোর পরে যে ইলিশ পাওয়া যায়, সেগুলো কোল্ড স্টোরেজ থেকে আসে। আবার পূর্ববঙ্গীয়দের মধ্যে অনেকে আছেন যারা লক্ষ্মী পুজোর দিনে জোড়া ইলিশ খেয়ে তারপরে সেবছরের জন্য ইলিশ পার্বণে ইতি টানেন,’ জানাচ্ছিলেন সুরবেক বিশ্বাস।

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্গাপুজোয় পাঁঠা বলি হত, আবার যেসব বাড়িতে প্রাণিহত্যা করা হয় না, সেখানে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। কিন্তু দেবীকে ইলিশ ভোগ দেওয়া হচ্ছে, এটা সচরাচর শোনা যেত না। ইলিশ একটা উৎসবকে চিহ্নিত করে, এটা পুজোর নয়। এটা এখন একটা হুজুগ। শরৎকাল, আশ্বিন মাস তো ইলিশ খাওয়ার সময়ও নয়।’

কিউএনবি/অনিমা/২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪,/দুপুর ২:৪৬

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit