শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন

ভাঙাচোরা-ফিটনেসবিহীন যানবাহনে চলছে অভিযান

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ১০ জুলাই, ২০২৩
  • ১০৮ Time View

ডেস্ক নিউজ : ১৫ জুন রাত সাড়ে ১১টা। উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে এক ব্যক্তির মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় দুই ছিনতাইকারী। এই সময় রাস্তায় টহল দিচ্ছিল পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান। ছিনতাইকারীদের ধরতে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলেও মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। পরে চালু হলেও ততক্ষণে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

এমন ঘটনা ঘটেছে সপ্তাহ দুয়েক আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিমসার বাজারে। একটি মামলার আসামি ধরতে অভিযান চালালেও গাড়ির জন্য ধরতে পারেনি। এ দুটি ঘটনার মতোই ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের যানবাহন সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। একেকটি গাড়ির বয়স ২০ থেকে ৩০ বছর। এর মধ্যে লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোর ফিটনেসের মেয়াদও ফুরিয়ে গেছে। এরই মধ্যে ২ হাজার ৭৬৩টি যানবাহনের বয়স হয়ে গেছে ৩০ বছরের বেশি। এসব যানবাহন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ভাঙাচোরা ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ে অভিযান চালাতে হচ্ছে। আবার পুলিশের কোনো কোনো ইউনিটে লোকবলের তুলনায় যানবাহন কম। বাধ্য হয়ে থানা ও বেশ কিছু ইউনিট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যানবাহন অনুদান নিচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশের মধ্যেই সমালোচনা হচ্ছে। আরও উন্নতমানের যানবাহন কেনার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত মাসের প্রথম সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে ২০ বছর থেকে শুরু করে ৩০ বছরের যেসব লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন আছে, সেগুলো সরকারের অনুমোদন নিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন যানবাহন কেনার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশের জন্য যানবাহন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নির্বাচন-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য সময়ের তুলনায় পুলিশকে আরও বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর সে জন্য অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে যানবাহন বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি থানায় একটি পিকআপ দিয়ে অপারেশন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে; যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। গত তিন অর্থবছরে ১ হাজার ১৭টি যানবাহন কেনা হয়েছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেলই আছে ৬৬৫টি।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ হওয়া বাজেটের শতকরা ৪০ ভাগ, ২০২০-২১ অর্থবছরের বরাদ্দের ১৫ ভাগ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের বরাদ্দের ৫০ ভাগ ব্যয়ের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কেনাকাটায় স্থগিতাদেশ দেওয়া হলেও জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অন্তত ২০০ ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার সম্মতি পাওয়া গেছে। বর্তমানে ১১ হাজার ৯২৩টি যানবাহন আছে পুলিশের। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৪৪৫টি। বাকি ৫ হাজার ৪৭৮টি যানবাহন দিয়ে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ। জনবলের তুলনায় এখনো ৪ হাজার ৫২৯টি যানবাহনের ঘাটতি আছে। ইতিমধ্যে ৭৩৮টি যানবাহন অকেজো ঘোষণা করার পর কোনোমতে এসব দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা। এরই মধ্যে ১ হাজার ৯৮৮টি মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন বিক্রি করে সেই টাকা সরকারের কোষাগারে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নবসৃষ্ট পদে শতাধিক কর্মকর্তা পুলিশ সুপার (এসপি), অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক ও উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। জিপ গাড়ির ঘাটতি থাকায় পদোন্নতিপ্রাপ্তদের যানবাহন বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে ৪২৩টি জিপের ঘাটতি রয়েছে। মহানগর পুলিশ ও জেলা সদরের থানায় ২টি করে ডাবল পিকআপ থাকলেও দেশের ১৯০টি থানায় একটি করে ডাবল পিকআপ রয়েছে।

প্রতিবেদনের আরেকটি অংশে বলা হয়েছে, রাজস্ব বাজেটের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে একই নির্দেশনা জারি বা শর্তারোপ করা হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জানমাল, সরকারি সম্পত্তি, ভিভিআইপি, ভিআইপি ডিউটি পালন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইভেন্ট, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআইসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং শিল্পকারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে। নিরাপত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রম সীমিত করার কোনো সুযোগও নেই। কিন্তু যানবাহনের অভাবে পুলিশের দায়িত্ব পালনে সমস্যা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পুরনোগুলো বিক্রি করে নতুন যানবাহন কেনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের ইউনিটের তুলনায় যানবাহন অনেক কম, তা সত্য। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ওয়াকিবহাল। ইতিমধ্যে পুলিশের জন্য বেশ কিছু যানবাহন কেনা হয়েছে। সামনে আরও যানবাহন কেনা হবে বলে আশা করছি। পুলিশে যেসব অকেজো যানবাহন আছে, সেগুলো কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’

আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের জন্য যানবাহন কেনার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। পুলিশের যানবাহন সংকট থাকলেও আমরা আমাদের দায়িত্ব কঠোরভাবে পালন করছি। সংকট থাকলেও যানবাহন রিকুইজিশন করা থেকে পুলিশ বের হয়ে আসছে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, যানবাহন সংকটে ভুগছে থানা, হাইওয়ে ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। পুরনো ও লক্কড়ঝক্কড়ের পাশাপাশি অনেক গাড়ি আছে ফিটনেস নেই। গাড়ি নষ্ট হলে মেরামতও করা হচ্ছে না। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশের সব থানা, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশকে রিকুইজিশন করা গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর সে জন্য প্রায় সময় কোনো না কোনো গাড়ি রিকুইজিশন করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেক থানা পুলিশ ভাড়া করা গাড়ি ব্যবহার করছে। অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েই ডিউটি পালন করছে ও অভিযানে অংশ নিচ্ছে। পুলিশ যে গাড়িগুলো ব্যবহার করছে এর বড় একটি অংশ ভিআইপি প্রটোকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

থানার ওসি এবং এসি-এএসপি (সার্কেল) যেসব গাড়ি ব্যবহার করছেন, ওই সব যানবাহন দিয়ে পুলিশের অন্য সদস্যরা নিয়মিত অভিযানে যাচ্ছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়ি অন্য সদস্য না নেওয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্রের কাজে তা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাহিদার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা অনেক কম। এ কারণে রিকুইজিশন ছাড়া উপায় থাকে না। থানায় যেসব গাড়ি বরাদ্দ আছে, সেগুলোর অবস্থাও ভালো না। তিনি আরও বলেন, যানবাহনের শতকরা ৬০ ভাগই ব্যবহার অনুপযোগী। মেয়াদোত্তীর্ণ ওই সব গাড়ি মেরামত করতে গিয়ে রাজারবাগ ও জেলা পুলিশের এমটি বিভাগের সদস্যদের রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থা। মফস্বল এলাকায় যানবাহনের অভাবে কোনো কোনো থানা এলাকায় অটোরিকশা দিয়েও নিয়মিত টহল দিতে বাধ্য হচ্ছে পুলিশ। গাড়ির সমস্যা দূর হলে পুলিশের কাজের গতিও অনেক বাড়বে।

কয়েকজন পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, জেলা পুলিশের পাশাপাশি প্রতিটি থানায় যানবাহন সংকট দীর্ঘদিন ধরে। যানবাহনের অভাবে অনেক সময় অভিযানেও যাওয়া সম্ভব হয় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে মাঝেমধ্যে যানবাহন অনুদান নেওয়া হয়। আবার বাধ্য হয়ে গাড়ি রিকুইজিশন করতে হয়। তা ছাড়া ভাঙাচোরা গাড়ি দিয়ে অপারেশনে যেতে হচ্ছে। এতে পুলিশ সদস্যরা অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১০ জুলাই ২০২৩,/বিকাল ৫:১৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

May 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit