শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৮ অপরাহ্ন

মধ্যপ্রাচ্যে সেনা-রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান যুদ্ধ কি আরও তীব্র হচ্ছে

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২১ Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের অষ্টম মাস চলছে। উভয়পক্ষই যখন যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানো ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে ভাবছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা মোতায়েনের অর্থ কী এবং এটি কি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তীব্রতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

কেমন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে

এক মার্কিন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এর এক দিন পর মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও (এমইইউ) রওনা হয়েছে, যাতে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই স্ট্রাইক গ্রুপ ও নৌ বহর মোতায়েনের ফলে অতিরিক্ত ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত হতে পারে, যার মধ্যে স্ট্রাইক গ্রুপ ও অন্যান্য জাহাজে থাকা নাবিক ও মেরিনা সেনা রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি এলাকায় তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং দুইটি উভচর অবতরণকারী দল অবস্থান নেবে।

তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে চান, তাহলে সামরিক শক্তির এই বিপুল সমাবেশ তাকে আরও বিস্তৃত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন এই প্রক্রিয়ায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলে আগে থেকেই মোতায়েন প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে আরও নতুন সেনা যুক্ত হবে।

পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে নুরি জানান, এর লক্ষ্য হলো কূটনীতির গতিপথ যা-ই হোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি যেন সব সময় খোলা থাকে। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেখান থেকে কোনো সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নেই পেন্টাগনের।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ট্রাম্প যদি নতুন কোনো হামলার নির্দেশ দেন, তবে সেই নির্দেশ বাস্তবায়নে বাহিনীগুলো সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর সংখ্যা কত

যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে রেখেছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনার এক বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।

এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি, যেগুলো বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে। মূলত লেবানন সংকটের সময় বৈরুতে সেনা পাঠিয়েছিল ওয়াশিংটন। ওই সময় লেবাননে সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বড় ও স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি ছোট ছোট ঘাঁটিতে মোতায়েন ছিল।

ট্রাম্প চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছেন। শুরুতে তিনি আরব সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে ছিলেন, যার মধ্যে বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ছিল।

যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র কেমন সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা পাঠিয়েছিল?

গোয়েন্দা বিশ্লেষক এবং সামরিক ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বিমান মোতায়েন করেছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি।

মোতায়েন করা বিমানের মধ্যে রয়েছে ই-থ্রি সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস) বিমান; এফ-৩৫ স্টিলথ স্ট্রাইক ফাইটার; এফ-২২ এয়ার সুপিরিওরিটি জেট; এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান।

ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা গেছে, এসব বিমানের অনেকগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঘাঁটি থেকে রওনা হয়েছে এবং এগুলোর সঙ্গে ছিল কার্গো বিমান ও আকাশে জ্বালানি ভরার ট্যাঙ্কার। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নিয়মিত রদবদল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত অভিযানেরই ইঙ্গিত দেয়।

গত মার্চ মাসে পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত মার্কিন বাহিনী পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল।

এই অতিরিক্ত বাহিনী তিনটি ভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত ছিল; যার প্রতিটির উৎসস্থল, যাত্রাপথ ও সময়সূচি ছিল ভিন্ন। প্রথমটি ছিল ‘ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ’, যা আমেরিকা-ক্লাস অ্যাসল্ট শিপ ইউএসএস ত্রিপোলি এবং ৩১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটকে (এমইইউ) কেন্দ্র করে গঠিত।

দ্বিতীয়টি ছিল ‘বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ’। এটি ‘ওয়াস্প-ক্লাস’ অ্যাসল্ট শিপ ‘ইউএসএস বক্সার’ এবং ১১তম এমইইউয়ের সমন্বয়ে গঠিত।

সব মিলিয়ে, এই দুটি মেরিন দল ওই অঞ্চলে ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক মার্কিন বহরে যুক্ত করেছে।

তৃতীয় দলটি ছিল নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের ‘ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্স’র প্রায় ২ হাজার সেনার একটি দল। এয়ারবর্ন পদাতিক ডিভিশনটি মূলত প্যারাসুটের মাধ্যমে আক্রমণ পরিচালনার কাজে বিশেষ পারদর্শী।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সব মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

সর্বশেষ সেনা মোতায়েন কীসের ইঙ্গিত?

নতুন করে সেনা মোতায়েনের ফলে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়বে কি না তা স্পষ্ট নয়; তবে বৃহস্পতিবার টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের ওপর বোমা হামলার মাত্রা বাড়ানো সম্ভব। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সেটা বলতে পারব না। কারণ দেখুন, আপনারা তো জিজ্ঞেস করছেনই যে কোথায় বোমা ফেলা হবে।‘

কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ওই অঞ্চলে আরও সেনা পাঠানো ইরানের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের একটি কৌশল হতে পারে। গত সপ্তাহে ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠায়। তবে এর জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কিছু শর্ত পূরণের দাবি জানায়; যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করা এবং হামলা বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করা।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো শর্তে সম্মত হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায়। টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এতে ‘এমন কিছু বিষয় ছিল’, যা তিনি ‘এক বছর আগেও অনুমোদন করতেন না’ এবং ‘আজও করবেন না’।

ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপও অব্যাহত রেখেছে। এই সপ্তাহে তারা ইরানের রেল ও গাড়ি নির্মাণ খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মতে, তেহরানের অবশিষ্ট আয়ের উৎসগুলো বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত মাসেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর এবং যারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে এমন অন্যান্য দেশের ওপর ব্যাপক নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কোন পর্যায়ে আছে?

মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা চললেও তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে কাতারের মধ্যস্থতায় যে আলোচনা হয়েছিল, তাতে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়টি একটি জটিল ও অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবেই রয়ে যায়।

ওই আলোচনায় ইরান কাতারের মাধ্যমে সাত দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি নৌ অবরোধ তুলে নেয়, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং লেবানন ও ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে; তবেই ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে এবং পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু করবে। ট্রাম্প এই পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করেন।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম এনবিসিকে বলেন, এই পরিকল্পনায় অবরুদ্ধ অর্থ ছাড় এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার যে দাবি জানানো হয়েছে, তা নিয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘এগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নয়… এগুলো বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা।’ এ ছাড়া তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাতটি প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন।

জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এনবিসিকে বলেন, তেহরান যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’। এরপর তিনি এক্স বার্তায় লিখেন, ‘আমরা যুদ্ধ বেচতে নিউইয়র্কে আসিনি। আমরা এসেছিলাম শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।’

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, বর্তমান সংঘাতের অবসান ‘খুব শিগগিরই’ হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তেহরানকে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

টেক্সাসের ডেন্টনে পিটারবিল্ট মোটরসের একটি কারখানায় বক্তব্য রাখার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান হয় ‘খুবই সঠিক ও বুদ্ধিদীপ্ত কোনো পদক্ষেপ নেবে, অথবা তাদের অস্তিত্ব খুব বেশি দিন টিকবে না।’

কোনো চুক্তি মেনে চলার ক্ষেত্রে ইরানকে আদৌ বিশ্বাস করা যায় কি না, তা নিয়েও ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন এই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করি, তখন আপনারা তা মেনে চলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে যখন কোনো চুক্তি করা হয়, তখন খুব সম্ভবত তারা তা মানবে না।’

 

 

কিউএনবি/আয়শা/০৩ অক্টোবর ২০২৬,/দুপুর ১:৩০

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

October 2026
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit