মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

আজকের বোনা বীজেই আগামীর ফসল ফলবে

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫ Time View

ডেস্ক নিউজ : ধানখেতে কৃষকদের কাজ কিছুক্ষণ দেখলেই একটি বিষয় বোঝা যায়। সেটি হলো ভালো ফলন পেতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়। কৃষকরা জানেন ধান পাকার সময় নয়, ভালো ফলনের শুরু হয় অনেক আগে। ভালো বীজ বেছে নিতে হয়, মাটির যত্ন নিতে হয় এবং জমিকে সম্মান করতে হয়। আগাছায় ভরা জমি থেকে কেউ ভালো ফসলের আশা করে না। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কও অনেকটা মানুষের সম্পর্কের মতো।

প্রতিবেশী দুইটি দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে অনেক সময় লাগে। কখনো কখনো এর জন্য এক বা একাধিক প্রজন্মও পার হয়ে যায়। একবার বিশ্বাস নষ্ট হলে তা আবার ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন। এতে অনেক সময় ও চেষ্টা লাগে। কিন্তু সন্দেহ খুব সহজেই তৈরি হয় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই মুহূর্তে ভারত ও বাংলাদেশ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে আজকে নেওয়া সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই ঠিক করে দেবে।

সম্প্রতি নয়াদিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতা দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। পাশাপাশি আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানান। এগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়। বরং দুই দেশের সামনে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে। ইতিহাস খুব কমই নতুন করে সবকিছু শুরু করার সুযোগ দেয়। তবে সময়ে সময়েই এমন কিছু মুহূর্ত আসে যেগুলো ভবিষ্যতের পথ বদলে দিতে পারে। এটি হয়তো সেই রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

কারও কারও মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেয়ে একে অপরকে নিয়ে পরোক্ষভাবে বেশি কথা বলেছে। ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন, নয়াদিল্লির কৌশলগত উদ্বেগ এবং নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে গুজব অনেক সময় প্রকৃত কূটনৈতিক যোগাযোগের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

দুই দেশেই এমন কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী আছে যারা অতীতের ক্ষতকে জীবিত রাখলে লাভবান হয়। তাই দুই দেশের নেতাদের প্রতিটি বৈঠককে তারা আত্মসমর্পণ হিসেবে তুলে ধরে। ছড়ায় কিছু গুজবও। কোনো মতপার্থক্য হলে সেটিকে গোপন উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। আবার সম্পর্ক ভালো করার যে কোনো উদ্যোগকেও অনেকেই কৌশলী চাল বলে উড়িয়ে দেন। এভাবে ধীরে ধীরে অবিশ্বাসই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে পরিচিত ভাষা হয়ে উঠেছে। এ ধরনের ভাষা হয়তো বড় শিরোনাম তৈরি করে কিন্তু ভালো প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে না।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। এই দেশের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অন্য কারও অনুমতির প্রয়োজন নেই, আর থাকার কথাও নয়। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে দেশটি স্বাধীন হয়েছে। তাই নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। 

ভারত ও বাংলাদেশের মতো সম্পর্ক খুব কম প্রতিবেশী দেশের মধ্যেই দেখা যায়। ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন নদ-নদী, সাহিত্য এবং ইতিহাস এই দুই দেশকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে। দেশভাগের কারণে অনেক পরিবার আলাদা হয়ে গেলেও স্মৃতির বন্ধন এখনো রয়ে গেছে। আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের অনেক আগ থেকেই দুই দেশের মানুষের মধ্যে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ওই সময় বাংলাদেশ সেনাদের পাশাপাশি ভারতের সেনারাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। 

তবে বন্ধুত্ব টিকে থাকতে পারে না, যদি এক পক্ষ সারাক্ষণ গতকালের আত্মত্যাগের হিসাব কষতে ব্যস্ত থাকে, আর আরেক পক্ষ শুধু ক্ষোভের তালিকাই উপস্থাপন করতে থাকে। অতীত আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায়, তবে এর মাধ্যমে কোনোকিছুতে স্থায়ী অধিকারবোধ জন্ম নেয় না। অতীতের কাজ সামনে এগিয়ে যাবার পথকে আলোকিত করা, আমাদের কোনো অন্ধকার কারাগারে আবদ্ধ রাখা নয়। একটু খুঁজলেই দেখা যায় যে, এমন পরিবর্তন অসম্ভব নয়; বরং ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ আছে।

ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা ভয়াবহ সংঘাতের পর যখন শার্ল দ্য গল এবং কনরাড আদেনাউয়ার পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেন, তখন অনেকেই তাদের পাগল বলে ‘আখ্যায়িত’ করেছিলেন। কিন্তু, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাদের সাহসই ইউরোপের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোর একটিকে বেঁধেছিল সবচেয়ে দৃঢ় ও স্থিতিশীল অংশীদারত্বের বন্ধনে। এমনকি ভয়াবহ যুদ্ধের পর ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রও সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নিতে পেরেছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, স্মৃতি মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সেই স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া যাবে না।

এসব পরিবর্তন ঘটেনি এই কারণে যে তাদের মধ্যে বিদ্যমান সব মতভেদ কোনো অলৌকিক উপায়ে একদিন হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। বরং তা সম্ভব হয়েছিল এই কারণে যে তাদের নেতাদের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে আরও ভালো একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার সাহস ছিল।
দক্ষিণ এশিয়াও একসময় এমন নেতৃত্বের সাক্ষী হয়েছে। 

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে ওঠে না এই ভিত্তিতে যে তারা প্রতিটি বিষয়ে একমত হবে; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক গোলমালকে অতিক্রম করে বৃহত্তর স্বার্থে চিন্তা করার আত্মবিশ্বাসই সেই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি। তার মানে এই না যে এতে কঠিন কোনো বিষয় নেই। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য বৈষম্য, যোগাযোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এই অঞ্চলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে সন্দেহ নেই। কিন্তু পরিণত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পরিচয় এই নয় যে তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা থাকবে না; বরং সমস্যাগুলো তারা কতটা শান্ত, বিচক্ষণ ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে, সেটিই তাদের সত্যিকার পরিচয় ঠিক করে দেয়।

সরকারকে অবশ্যই জনমতকে গুরুত্ব দিতে হয়, কিন্তু প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কদের সকল ধরনের সমালোচনার ঊর্ধ্বে থেকে যথাযথ ও নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হয়। প্রতিটি সমঝোতাকে যদি আত্মসমর্পণ বলে আখ্যা দেওয়া হয় এবং প্রতিটি সংলাপকেই যদি দুর্বলতার নিদর্শন হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে কূটনীতি কখনোই সফল হতে পারে না।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগও তাদের সামনে এসেছে। সেটি হতে হবে কোনো দেশকে তার সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করতে বলার মাধ্যমে নয়, বরং এই সত্য স্বীকার করার মাধ্যমে যে, সার্বভৌমত্বের দিক দিয়ে সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের একমাত্র প্রকৃত ভিত্তি হতে পারে।
ভারত কিংবা বাংলাদেশ কোনো দেশেরই কেবল আবেগ নির্ভর সম্পর্কের প্রয়োজন নেই। উভয় দেশের প্রয়োজন এমন একটি সম্পর্ক, যার ভিত্তি হবে বাস্তবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট উপলব্ধি এবং আত্মবিশ্বাস। 

ভারত ও বাংলাদেশের সামনে এখন কূটনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল সুযোগ বিদ্যমান। তা শুধু ইতিহাস নতুন করে লেখার নয়, বরং একসঙ্গে পরবর্তী অধ্যায় রচনার সুযোগ। এর জন্য ফাঁপা আবেগের প্রয়োজন নেই, আত্মসমর্পণেরও প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু আত্মবিশ্বাসের- নিজ নিজ সার্বভৌমত্বের প্রতি আত্মবিশ্বাস, গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং এই সহজ বিশ্বাস যে, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র একে অপরকে সম্মান করতে পারে; আর তা পারে, প্রতিটি পদক্ষেপে একই ছন্দে চলার প্রয়োজন ছাড়াই।

বাংলার কৃষকেরা জানে, শস্য ঘরে ওঠার অনেক আগেই আসলে ফসলের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় তখনই, যখন প্রথম বীজটি চাষের জমিতে বপন করা হয়। আজ সেই বীজ মাটিতে রোপণ করা হয়েছে।

আগামী দিনের ফসল পুরোপুরি নির্ভর করবে ভারত ও বাংলাদেশ আজ কী বপন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর। যেমনটা একটি পুরোনো প্রবাদে বলা আছে; As you sow, so shall you reap, মানে যেমন বুনবে, তেমনই ফসল পাবে।

কিউএনবি/অনিমা/২৮ জুলাই ২০২৬,/রাত ৯:৫৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit