আকাশপথে আধিপত্যের লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ব্যবহার করে তারা ইরানি আকাশসীমার বেশ কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আকাশের এই শ্রেষ্ঠত্ব মাটির লড়াইয়ে বা সমুদ্রপথে খুব একটা কাজে আসছে না। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে ইরান তাদের নৌ-শক্তির মহড়া দিয়ে যাচ্ছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর একটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে।
যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে ইসরায়েলি অভিযানে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হন। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো একে বড় সাফল্য হিসেবে দেখলেও, ইরান খুব দ্রুত তাদের নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করেছে। ইতিমধ্যে দেশটির তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং তার সমর্থনে তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষের জমায়েত দেখা গেছে। এই দ্রুত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা ও সামরিক কমান্ড চেইন এখনো ভেঙে পড়েনি, যা মিত্রপক্ষের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার ক্ষেত্রে ইরান তাদের শক্তি অটুট রেখেছে। ১৪ দিন ধরে ক্রমাগত বিমান হামলা সত্ত্বেও তেহরান তাদের লঞ্চিং প্যাডগুলো সচল রাখতে পেরেছে। সম্প্রতি তারা আগের চেয়েও ভারী ও বিধ্বংসী ওয়ারহেড ব্যবহার শুরু করেছে, যার ফলে ইসরায়েলের জনজীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। তেল আবিবসহ প্রধান শহরগুলোর বাসিন্দাদের বড় একটা অংশ এখন বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরান সস্তা ড্রোনের ঝাঁক পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের দামী ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলোকে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও নিঃশেষ করার কৌশল গ্রহণ করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে তাদের অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে। জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে এক অঘোষিত সমঝোতা লক্ষ্য করা গেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে তেহরানের তেলের ডিপোতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দামের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে উভয় পক্ষই এই সেক্টরে বড় ধরনের হামলা থেকে আপাতত বিরত রয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তাহীনতার কারণে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সাগরে ইরানি উপস্থিতির কারণে তা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে ইরান তাদের মিত্রদের পূর্ণ ব্যবহার করছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। ইয়েমেন থেকেও লোহিত সাগরে আক্রমণের হুমকি বাড়ছে, যা এই যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে রূপান্তর করতে পারে। দশটিরও বেশি দেশে এখন মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুগুলো ইরানি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। মিত্র দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে না নামলেও তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন এবং কৌশলগত অবস্থান ইরানকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত দুই সপ্তাহে ইরানের অভ্যন্তরে কোনো বড় ধরনের গণবিক্ষোভ বা অস্থিরতা দেখা দেয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো নেতারা বারবার ইরানি জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। উল্টো সাইবার হামলা মোকাবিলা এবং নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় ইরানি বাহিনী সাফল্যের দাবি করছে। তারা জানিয়েছে, এ পর্যন্ত শতাধিক মার্কিন ও ইসরায়েলি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এই স্থিতিশীলতা প্রমাণ করে যে, ইরান কেবল সামরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
বর্তমানে এই যুদ্ধের কোনো সহজ সমাধান বা যুদ্ধবিরতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কোনো কার্যকর মধ্যস্থতাকারী পক্ষ এখনো দৃশ্যপটে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রযুক্তির শক্তিতে বলীয়ান থাকলেও, ইরান তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং গেরিলা কৌশলে যুদ্ধের চাকা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, চতুর্দশ দিনে এসে এটি স্পষ্ট যে, কোনো পক্ষই এককভাবে বিজয়ী হতে পারেনি। বরং লড়াইটি এখন এক ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, যেখানে কৌশলগত ধৈর্য এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহারই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে।
সূত্র: ডব্লিউএএনএ