রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪০ পূর্বাহ্ন

শরিয়তের দৃষ্টিতে দুনিয়াপ্রীতির মাপকাঠি

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৬ Time View

ডেস্ক নিউজ : মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘বলো, তোমাদের কাছে যদি আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার চেয়ে অধিক প্রিয় তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের স্বজাতি, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা করো এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা ভালোবাসো, তবে অপেক্ষা কোরো আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যতাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২৪)

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ কেমন দয়ালু, তিনি বলেছেন, দুনিয়ার প্রতি তোমাদের ভালোবাসা আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ভালোবাসার চেয়ে যেন বেশি না হয়। দুনিয়ার ভালোবাসা বেড়ে যাওয়ার নিদর্শন হলো আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশনাবলি পালনে ত্রুটি হতে থাকা।

আমার মতে, ‘আল্লাহর রাস্তায় পরিশ্রম ও চেষ্টা’ পূর্ববর্তী বাক্যের ব্যাখ্যাস্বরূপ। এতে আল্লাহ ও রাসুলের চেয়ে দুনিয়া অধিক প্রিয় হওয়ার স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আকর্ষণীয় বস্তুগুলো অধিক প্রিয় হওয়া সর্বাবস্থায় নিন্দনীয় নয়। দুনিয়ার ভালোবাসা যদি স্বভাবগত হয়, তবে তা নিন্দনীয় নয়, বরং জ্ঞান-বুদ্ধির সাহায্যে বিচার করে যদি দুনিয়াকে ভালোবাসা হয়, তা নিন্দনীয়।

কেননা জ্ঞান-বুদ্ধির বিচারে আল্লাহ এবং রাসুলই সর্বাপেক্ষা অধিক প্রিয় হওয়া উচিত। এর মাপকাঠি এই—দুনিয়াকে ভালোবেসেও যদি আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশ পালনে এবং আল্লাহর রাস্তায় চেষ্টা ও পরিশ্রমে কোনো ত্রুটি না হয়, তবে আল্লাহ ও রাসুলই অধিক প্রিয় বোঝাবে। এই মাপকাঠি ঠিক থাকলে দুনিয়া, স্ত্রী-পুত্র ইত্যাদির প্রতি স্বাভাবিক ভালোবাসা অতিরিক্ত মাত্রায় হলেও কোনো ভয়ের কারণ নেই।

যদি কেউ তার সন্তান হারানোর ব্যথায় অতিরিক্ত বিলাপ করে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের ঘটনা শুনে না কাঁদে, তবে তাকে জবাবদিহি করতে হবে না।

কিন্তু দ্বিন ও দুনিয়ার স্বার্থের প্রতিঘাতের ক্ষেত্রে দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। এটা না করে যদি দুনিয়ার লোভ-লালসাকে ধর্মের খাতিরে বিসর্জন দেওয়া হয়, যদিও দুনিয়া ত্যাগের জন্য মনে দুঃখ-কষ্ট থাকে, তবে জবাবদিহি করতে তো হবেই না, বরং এতে আরো সওয়াব বৃদ্ধি পাবে। বস্তুত অন্তরে দুনিয়ার স্বাভাবিক ভালোবাসা ও লালসা থাকা সত্ত্বেও এর বিরোধিতা করাই পূর্ণ পরহেজগারি। ফেরেশতারা ঘুষ গ্রহণ না করলে তাতে কোনো বাহাদুরি নেই। স্বভাবত তাদের মধ্যে ধন-দৌলতের লালসাই নেই।

বাহাদুরি বলতে গেলে সেই বিচারকের ঘটনা উল্লেখ করতে হবে, যার কাছে বাদী-বিবাদী উভয়েই লাখ টাকা ঘুষ পেশ করে। কিন্তু তিনি তা থেকে এক পয়সাও গ্রহণ করেননি; বরং ক্রোধান্বিত হয়ে উভয়কে বের করে দেন। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা সত্যই তাঁর সৎ সাহসের পরিচায়ক। কেননা এক পক্ষ ঘুষ দিলে এবং অপর পক্ষ না দিলে ঘুষের ব্যাপার প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। উভয় পক্ষ যখন ঘুষ দিচ্ছিল তখন প্রকাশ হওয়ার কোনো আশঙ্কা ছিল না। তৃতীয় কেউ সংবাদ দিলেও প্রমাণ করতে পারত না। কেননা রসিদ দিয়ে ঘুষ নেওয়া হয় না।

আমি বলছিলাম, শুধু দুনিয়ার লালসা নিন্দনীয় নয়, বরং সেই লালসা অনুযায়ী আমল করা নিন্দনীয়। তত্ত্বজ্ঞানহীন পীর হয়তো এ বিষয়ে ভুল করবেন। তাঁর কাছে কেউ দুনিয়ার লালসার অভিযোগ করলে তিনি কোনো ওজিফা কিংবা মোরাকাবার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু তত্ত্বজ্ঞানী পীর তাকে তত্ক্ষণাৎ সান্ত্বনা দিয়ে বলবেন, দুনিয়ার লালসা হওয়া নিন্দনীয় নয়, বরং সেই লালসার বিপরীত কাজ করতে পারলে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে; বরং তখন সেই লোভ শরিয়তের দৃষ্টিতে লোভ বলেই গণ্য হবে না, যার চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা হয় না। শরিয়ত সেই লোভকেই লোভ আখ্যা দেয়, যার ফলে ধর্মের ওপর দুনিয়ার প্রাধান্য হতে থাকে।

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) লোভের স্বরূপ খুব পরিষ্কার করে দিয়েছেন। পারস্য সম্রাটের ধনভাণ্ডারগুলো বিজয়ের পর খলিফার দরবারে এলে দেখা গেল, বিরাট ধনভাণ্ডার। হাজার বছর ধরে দেশ শাসন করা রাজবংশের ধনভাণ্ডার কত বিশাল হতে পারে! উমর (রা.) তা দেখে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমরা এমন প্রার্থনা করি না যে ধনের প্রতি আমাদের আদৌ অনুরাগই না হোক এবং এই প্রার্থনাও করি না যে ধনের আগমনে আমাদের মনে আনন্দ না হোক। কেননা আপনি বলেছেন, ‘নারী, সন্তান, রাশীকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য আর চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে। এসব পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহ, তাঁরই কাছে রয়েছে উত্তম আশ্রয়স্থল।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪)

উমর (রা.) যা বলেছিলেন, বাস্তবিক পক্ষে তা শুধু তিনিই বলতে পারেন। তত্ত্বজ্ঞানহীন পীর বরং তত্ত্বজ্ঞানীও এরূপ মনে করবেন যে ধন-সম্পদ সব অবস্থায় নিন্দনীয়। কতক মূর্খ লোক বড়াই করে বলে আমাদের কোনো পরোয়া নেই। রাজত্বের পরোয়া করি না, টাকা-পয়সারও পরোয়া করি না। এই বেপরোয়া ভাব ততক্ষণ পর্যন্ত টিকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত ডাল-ভাতের ব্যবস্থা আছে। তা না হলে সব দাবির স্বরূপ প্রকাশ হয়ে যাবে। উমর (রা.) যা বলেছেন সেটাই অধিক ভারসাম্যপূর্ণ।

মাওয়ায়িজে আশরাফিয়্যা থেকে

মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর

কিউএনবি/অনিমা/২২ জানুয়ারী ২০২৬,/সকাল ৬:১৮

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

November 2026
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit