মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন

দ্বিন প্রচারে ভাষা ও প্রজ্ঞার ব্যবহার

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৯ Time View

ডেস্ক নিউজ : ইসলামী ধারার লেখক, বক্তা ও ওয়ায়েজদের জন্য আবশ্যক হলো মানুষকে তার যুগের ভাষায় সম্বোধন করা, যেন তারা সহজেই বুঝতে পারে। শরিয়তের কঠিন কঠিন পরিভাষা এবং দুর্বোধ্য বিরল শব্দ পরিহার করা। সহজতাকে বেছে নেওয়া। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলবে যা তারা বোঝে।

আর তাদের অপছন্দনীয় বিষয়গুলো পরিহার করবে। তোমরা কি চাও মানুষ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করুক।’ (আদ-দুররুন নাদিদ, পৃষ্ঠা-২৫৫)

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪)

 
জানতে হবে সময়ের ভাষা

ইসলামী ধারার লেখক, বক্তা ও ওয়ায়েজদের তার যুগ ও সময়ের ভাষা সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন।

প্রত্যেক যুগেরই একটি ভাষা থাকে, যা অন্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন। যারা ইসলাম নিয়ে কথা বলবে তাদের উচিত এই ভাষা রপ্ত করা। যেন সম্বোধিত ব্যক্তি তা বুঝতে সক্ষম হয়। যুগের ভাষা দ্বারা শুধু দৈনন্দিন কথোপকথনে ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্য উদ্দেশ্য নয়, বরং বিষয়টি গভীর।

যুগের ভাষার ভেতর রয়েছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, মনোভাব, চিন্তার ধরন, পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য এবং অন্যকে বোঝানোর রীতি-নীতি ইত্যাদি।
 
দ্বিন প্রচারকের ভাষা ও প্রজ্ঞা

যারা ইসলামের প্রচার ও প্রসারে কাজ করতে চায় তাদের নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রাখা উচিত। তা হলো—

১. যুক্তিনির্ভর হওয়া : ইসলামী বক্তা ও লেখক যুক্তিনির্ভর বক্তব্য পেশ করবে। যে আবেগ জাগ্রত করার পদ্ধতিকে যুক্তির ওপর প্রাধান্য দেবে না। ইসলামের সবচেয়ে বড় মুজিজা হলো কোরআন।

তা বুদ্ধিগ্রাহ্য বিষয় এবং এর মাধ্যমেই আল্লাহ অমুসলিমদের চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি এমন মুজিজার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেননি, যা মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তির ঊর্ধ্বে। অথচ মানুষের বুদ্ধির অতীত মুজিজাও মহানবী (সা.) লাভ করেছিলেন। যুক্তি, বুদ্ধি ও বিজ্ঞানকে ইসলাম যত মর্যাদা দিয়েছে পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম তা দেয়নি।

২. কৃত্রিমতা ও ভণিতা ত্যাগ করা : ইসলামী ধারার বক্তার বক্তব্যে এবং লেখকের লেখায় কৃত্রিমতা ও ভণিতা পরিহার করা আবশ্যক। তাদের প্রকাশভঙ্গিও হবে ভণিতামুক্ত, যা হবে মানুষের বোধ ও বুদ্ধির নিকটতর। উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করার জন্য জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় দিয়ে উদাহরণ দেওয়া। মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের জ্ঞান, বোধ ও বুদ্ধি আমার সমান নয়, তাদের চিন্তার ধরনও ভিন্ন রকম।

একজন দ্বিন প্রচারক যাঁদের সম্বোধন করেন তাঁদের ভেতর নানা শ্রেণির মানুষ থাকে। তাদের কেউ বড় প্রাজ্ঞ থাকেন, কেউ নবীন শিক্ষার্থী থাকে, কেউ ব্যবসায়ী, আবার কেউ শ্রমিক। কিন্তু তাদের সবাই দ্বিনের মুখাপেক্ষী। দ্বিনের কথা তাদের সবারই বোঝা উচিত। একই বক্তব্য সবার বোধগম্য করে উপস্থাপন করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু একজন দ্বিন প্রচারক অবশ্যই সেই চেষ্টাটুকু করেন। এই ক্ষেত্রে শব্দ ও মর্মে মধ্যপন্থা অবলম্বন করাই বেশি নিরাপদ।

৩. বিধানের সঙ্গে কারণ উল্লেখ করা : ইসলামী বক্তা ও লেখকরা যখন শরিয়তের বিধান বর্ণনা করবেন, তখন এর হিকমত ও ইল্লত তথা কল্যাণ ও কারণগুলোও সঙ্গে সঙ্গে বর্ণনা করবেন। বিশেষত বিধানের হিকমত ও ইল্লত যদি সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়। বিধান বর্ণনা করার ক্ষেত্রে এটাই কোরআন ও সুন্নাহর রীতি। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বোলো, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সংগম বর্জন করবে এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী-সংগম করবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)

অন্য আয়াতে ফাই তথা বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত শত্রুসম্পদ এতিম, মিসকিন ও পথিকদের ভেতর বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান তাদের মধ্যেই যেন ঐশ্বর্য আবর্তিত না হয়।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৭)

একাধিক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফুফির স্বামীর সঙ্গে ভাতিজিকে, ভাতিজির স্বামীর সঙ্গে ফুফিকে, খালার স্বামীর সঙ্গে ভাগ্নিকে, ভাগ্নির স্বামীর সঙ্গে খালাকে, ছোট বোনের স্বামীর সঙ্গে বড় বোনকে এবং বড় বোনের স্বামীর সঙ্গে ছোট বোনকে বিয়ে দিতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১১২৬)

অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) এর কারণ হিসেবে বলেছেন, যদি তারা এমনটি করে তবে তারা তোমাদের আত্মীয়তা ছিন্ন করল।

(মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৮৭৮)

৪. সূত্র উল্লেখ করা : বর্তমান যুগে অনেক মানুষ সন্দেহ ও সংশয়ের রোগে আক্রান্ত। তারা যেকোনো বিষয় অনেক বেশি যাচাই করার পর গ্রহণ করে। বর্তমান যুগের বেশির ভাগ মানুষ সূত্র বা নির্ভরযোগ্য উৎস ছাড়া কোনো কথা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। সুতরাং দ্বিন প্রচারকের দায়িত্ব হলো তাঁর লেখা ও বক্তব্যে উদ্ধৃত বিষয়গুলোর উৎস ও সূত্র বর্ণনা করা। যেন কেউ চাইলে সহজেই যাচাই-বাছাই করতে পারে।

৫. সংশয়পূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয় পরিহার

করা : ইসলামী ধারার বক্তা ও লেখকরা সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে যা লিখবেন এবং যে বক্তব্য দেবেন, তাতে সংশয়পূর্ণ ও অস্পষ্ট বিষয়গুলো পরিহার করবেন। একইভাবে যেসব বিষয়ে পূর্ববর্তী আলেমদের ভেতর বিতর্ক আছে তা পরিহার করাই উত্তম। কেননা নবীজি (সা.) এমন বিষয় পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দিয়ে যাতে সন্দেহের সম্ভাবনা নেই তা গ্রহণ কোরো। যেহেতু সত্য হলো শান্তি ও স্বস্তি এবং মিথ্যা হলো দ্বিধা-সন্দেহ।’

(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৮)

৬. আদেশসূচক শব্দ পরিহার করা : বর্তমান যুগের মানুষ ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা আদেশসূচক শব্দ ব্যবহার করা পছন্দ করে না। আর এটা দ্বিনি দাওয়াতের বৈশিষ্ট্যও নয়। দ্বিনি দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথা স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যেমন কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলো, আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে-ই দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী; আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে। রাসুলের কাজ তো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।’

(সুরা : নুর, আয়াত : ৫৪)

 লেখকের ওয়েবসাইট থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাবানুবাদ

কিউএনবি/অনিমা/০৫ জানুয়ারী ২০২৬,/সকাল ৯:০৭

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

আর্কাইভস

June 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৫-২০২৬
IT & Technical Supported By:BiswaJit