তোবারক হোসেন খোকন দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি : নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হত্যান্ডের সঙ্গে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার এবং ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের নেতারা। অন্যথায় সারা দেশের সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করে নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে সাংবাদিক আলিফ হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের চেয়ারম্যান ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মোঃ খায়রুল আলম রফিক এসব দাবি জানান। এসময় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের পরিচালক (আইন ও মানবাধিকার) আলী আবিদ, ময়মনসিংহ অঞ্চলের সংগঠনের প্রধান বিলাল হোসেন মানিক, কেন্দ্রীয় ফাউন্ডেশনের নেতা জামাল উদ্দিন, ময়মনসিংহ জেলা প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামসহ সংগঠনের অন্য নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন।
মোঃ খায়রুল আলম রফিক বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে একটি চায়ের দোকানে কাছেই বন্দুকদারী দুই যুবকের গুলিতে সাংবাদিক আলিফ নিহত হয়েছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। ঘটনাস্থল দেখিয়ে তিনি বলেন, “এই জায়গাতেই সাংবাদিক আলিফকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
এখানে তাঁর রক্তের দাগ এখনো রয়েছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি এখানেই পড়ে যান। একজন সাংবাদিককে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার চাই এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের গ্রেপ্তার সেইসাথে ১৫ দিনে মধ্যে চার্জশিট দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
সাংবাদিক হত্যাকা-ের বিচারহীনতার প্রসঙ্গ তুলে ২০২৫ সালে গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকা-ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তুহিন হত্যাকা-ের পর সাংবাদিকদের আন্দোলন এবং গাজীপুরের প্রশাসনের তৎপরতার ফলে দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার ও অভিযোগপত্র দাখিলের নজির তৈরি হয়েছিল। “গাজীপুরের পুলিশ প্রশাসন যে তৎপরতা দেখিয়েছিল, নেত্রকোনাতেও সেই তৎপরতা অব্যাহত দেখতে চাই।
সাংবাদিক তুহিন হত্যাকা-ের পর পুলিশ প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে আটজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ১৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সাংবাদিক আলিফ হত্যাকা-ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্রুত পদক্ষেপ আমরা দেখতে চাই।
তিনি পুলিশ প্রশাসনের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়ে যাচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে যদি নেত্রকোনা পুলিশ প্রশাসন সাংবাদিক হত্যাকা-ে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে না পারে, তাহলে সারা দেশের সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবো। যতক্ষণ পর্যন্ত জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করা না হবে এবং ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমারা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
তিনি আরো বলেন, দুর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ হত্যাকান্ড যেনো, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকা-ের মতো বছরের পর বছর যেন আমাদের অপেক্ষা করতে না হয়। গাজীপুরের সাংবাদিক তুহিন হত্যাকা-ের পর সারা দেশের সাংবাদিকরা যেভাবে প্রতিবাদে জেগে উঠেছিলেন, আলিফ হত্যাকা-ের পরও সাংবাদিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধের দাবীতে দেশের সকল সাংবাদিকদের এক হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। একজন সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাই হচ্ছে পুলিশ প্রশাসনের কাজ। সাংবাদিককে হত্যা করে তাঁর কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। প্রয়োজনে দেশের সকল কলম সৈনিক মিলে আন্দোলন করবো। সাংবাদিক আলিফের পরিবারের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আলিফ মাদক, দুর্নীতি, নির্যাতন এবং মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন এবং এ কারণেই অকালে তাঁর প্রাণ দিতে হলো।
“যে সাংবাদিক মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাঁকে যদি এভাবে প্রাণ দিতে হয়, তাহলে তাঁর পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? আমরা চাই, রাষ্ট্র তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়াক এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।” তিনি বলেন, আলিফের ফেসবুক পোস্ট, তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন, কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল কি না এবং হত্যাকা-ের পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি নাÑএসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। তবে হত্যাকা-ের প্রকৃত কারণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগেও, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরে সোমেশ^রী নদীর তীরে তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা সাংবাদিক আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল। ওই সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাঁধা দিতে গেলে, তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। এই নির্যাতন আর কতোদিন চলবে আমরা জানতে চাই। “আমরা চাই, সাংবাদিক আলিফ হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত হোক, প্রকৃত অপরাধীরা গ্রেপ্তার হোক এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ১৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট দিতে হবে। অন্যথায় সারা দেশের সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কর্মসূচি পালন করবেন। আসামি গ্রেপ্তার ও চার্জশিট দাখিল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
উল্লেখ্য : বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি তেলুঞ্জিয়া এলাকায় পরপর ৬টি গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক আলিফকে। আলীফ নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মহব্বত আলী ফকির। তিনি দুর্গাপুর পৌরসভার তেলুঞ্জিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ীতে পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। পাশাপাশি আইপিটিভি রূপসী বাংলার নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি নানা অনিয়মের ভিডিও প্রকাশ করতেন।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমদ জানান, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। এনিয়ে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক ভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলে ধারনা করা হচ্ছে। হত্যাকান্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট, আশাকরছি দ্রুত জড়িতদের আটক করতে সক্ষম হবো।
কিউএনবি/আয়শা/১৬ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৮:৫৫