২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:১৭

আচরণ বিধি লংঘন, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া প্রার্থীরা শংকিত

এম.এ ওয়াদুদ মিয়া, শরীয়তপুর : শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার দু’টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের মহড়া, ভোট কেটে নেয়ার হুমকিসহ আচরণ বিধি লংঘনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। পাশাপাশি নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারী প্রার্থীদের মধ্যে সুষ্ঠ ভোট গ্রহণে শংকা বিরাজ করছে। সরকার দলীয় প্রার্থীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এদিকে রিটানিং অফিসার অভিযোগের কথা স্বীকার করে বলছেন এ বিষয়ে আইন শৃংখলা মিটিংয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জাজিরা উপজেলার বিকেনগর ইউনিয়নের ঘোড়া মার্কার সমর্থক ওয়াহিদুল হক মাদবর, মজিবুর রহমান মাঝি এবং স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলায় বিকেনগর ও বড় গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আগামী ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে।

গত ২০ মার্চ চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীরা তাদেও স্ব-স্ব ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য রিটানিং অফিসারের নিকট মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। মনোনয়ন পত্র বাছাই শেষে বিকেনগর ইউনিয়নে ৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী, সাধারণ ওয়ার্ডে ২৯ জন মেম্বার এবং ৪ জন সংরক্ষিত মেম্বার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে সরকার দলীয় সাইদুর রহমান সরদার (নৌকা), আওয়ামীলীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (মজিবর) মাদবর (ঘোড়া), মিজানুর রহমান মুন্সি (ধানের শীষ), কলি আকতার লিপি (মোটর সাইকেল), আবদুল আলী সরদার (আনারস)। এদের মধ্যে মুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সরকার দলীয় প্রার্থী সাইদুর রহমান সরদার (নৌকা) ও আওয়ামীলীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান মোস্তাফিজুর রহমান (মজিবর) মাদবরের ঘোড়া মার্কার মধ্যে।

নির্বাচনের প্রচারণার শুরুতেই সরকার দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদেরকে হুমকি ধমকি দিয়ে আসছে। নৌকা সমর্থকরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় ভীতি দেখাচ্ছে। বলছে ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে হবে না। ভোট আমরাই দিয়ে দিব। এক ভোট পাইলেও নৌকা পাশ।

এ ছাড়া আনন্দবাজার, পূর্ব কাজি কান্দি, সোবান্দি মাদবর কান্দিসহ বিভিন্ন এলাকায় আচরণ বিধি ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে জনসভা করে নৌকার পক্ষে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান পার্শ্ববতী ইউনিয়নের বাসিন্দা তনাই মোল্যা অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে হুমকি স্বরুপ বক্তব্যে ভোট কেটে নেয়ার হুমকি দিয়েছে। এতে করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। এ ছাড়া সরকার দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের নিকট হুমকি দিয়ে বলে নির্বাচনের পূর্বেই মজিবর মাদবরকে তুলে নেয়া হবে। ভোট গ্রহণের তিন দিন পূর্বেই প্রার্থীকে ঘরে থেকে বের হতে দেয়া হবে না। বর্তমানে স্বতন্ত্র প্রার্থী মজিবর মাদবর আতংকিত।

এ কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও রিটানিং অফিসারসহ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিকট গত ২ এপ্রিল লিখিত ভাবে অভিযোগ দাখিল করেছেন। এরপরেও স্বতন্ত্র প্রার্থী স্বাধীন ভাবে ভোট চাইতে পারছে না। প্রশাসন এ ব্যাপারে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়নি। এ কারণে সুষ্ঠ ভোট গ্রহণ নিয়ে শংকা রয়েছে প্রার্থীদের মধ্যে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রশাসনের নিকট সুষ্ঠ ভোট গ্রহণের জন্য জোর দাবী জানিয়েছেন।


এ দিকে বড় গোপালপুর ইউনিয়নে ৭ জন চেয়ারম্যান ৩০ জন সাধারণ মেম্বার ও ১০ জন সংরক্ষিত মেম্বার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে মাহবুবুর রহমান লিটু সরদার (নৌকা), আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সামচেল করিম আজু মাদবর (আনারস), রেজাউল করিম দুলাল (মোটর সাইকেল), ছাইমুল আলম (ঘোড়া), বকাউল (রিক্সা), লুৎফর চৌকিদার (চশমা) ও হাবিবুর রহমান (ধানের শীষ)। এ ইউনিয়নে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সামচেল আলম আজু মাদবর ও সরকার দলীয় প্রার্থী মাহবুবুর রহমান লিটু সরদারের মধ্যে। বর্তমানে ভোটের মাঠে জনসমর্থনে বর্তমান চেয়ারম্যানের শক্ত অবস্থান দেখে সরকার দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা নানা স্থানে সভা সমাবেশ করে হুমকি ধমকি দিচ্ছে।

তারা বলছে, ভোট কেটে নিয়ে যাবে। সকাল ১১টার মধ্যে ভোট হয়ে যাবে। নৌকার বাইরে কোন ভোট দেয়া যাবে না। ভোট দিলেও নৌকা, না দিলেও নৌকা পাশ করবে। যারা নৌকায় ভোট দিবেন না তারা ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন না। আমরাই ভোট দিয়ে দিব। জাজিরা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান দেশের আলোচিত তনাই মোল্যা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে ভোটারদের হুমকি দিয়ে বলেছে প্রার্থীর নাম থাকবে প্রার্থী থাকবেনা। এ কারণে সাধারণ ভোটাররা শংকিত হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন তো ?

এ ব্যাপারে বিকে নগর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মাদবর বলেন, আমার জনসমর্থনে ভয় পেয়ে সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বাংলাদেশের আলোচিত ব্যক্তি তনাই মোল্যা আচরণ বিধি লংঘন করে প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিয়ে ভোটরদের হুমকি দিচ্ছে। নির্বাচন থেকে সরে দাড়াতে বলেছে। তা নাহলে ভোট গ্রহণের তিন দিন পূর্বেই আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। প্রার্থীর নাম থাকবে প্রার্থী থাকবে না। ভোটারদের বাড়ি গিয়ে নৌকার সমর্থকরা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে না করে। এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য বি.এম মোজাম্মেল হক আচরণ বিধি ভঙ্গ করে বিকেনগর বঙ্গবন্ধু কলেজে বিকেনগর পাইলট হাই স্কুলে ও আনন্দবাজার নৌকার ক্লাবে বসে নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। এতে করে প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। আমি সুষ্ঠ ভোট নিয়ে শংকিত। প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চাই।

বিকে নগর ইউনিয়নের সরকারদলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী সাইদুর রহমান সরদার বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীর অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। কেউ আচরণ বিধি ভঙ্গ করেনি। কোন হুমকি দেয়নি। এম.পি সাহেব ঢাকা যাওয়ার পথে আমাদের নৌকার ক্লাবে বসে চা খেয়ে গেছে। এ ছাড়া সে কলেজ ও স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মিটিং করতে আসছিল। কোন ভোট চায়নি।

বড় গোপালপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামীলেিগর বিদ্রোহী প্রার্থী সামচেল আলম আজু মাদবর বলেন, সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে তনাই মোল্য প্রকাশ্যে বক্তৃতা করে বলেছে বিরোধী পক্ষের প্রার্থীর নাম থাকবে প্রার্থী থাকবে না। নৌকার বাইরে ভোট হবেনা। যারা নৌকায় ভোট দিবেন না তারা কেন্দ্রে যাবেন না। নৌকার প্রার্থী পাশ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা নিব। এতে করে সাধারণ ভোটাররা ভীত স্বন্তস্ত্র। আমার জনসমর্থন দেখে ওরা ঈর্সান্বিত হয়ে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ প্রশাসনের সকলের কাছে সুষ্ঠ ভোট কামনা করছি।

সরকার দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহবুবুর রহমান লিটু সরদার বলেন, বিরোধী পক্ষের প্রার্থীরা আমার জনসমর্থন দেখে বুঝতে পেরেছে যে তাদের অবস্থান ভাল না। এ কারণে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। সুষ্ঠ ভোটেই আমি জয়লাভ করবো।

জাজিরা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটানিং অফিসার সোহরাব হোসেন বলেন, বিকে নগর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মাদবর একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাতে শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য বি.এম মোজাম্মেল হক এম.পি সাহেব, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান তনাই মোল্যাসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লংঘনের অভিযোগ করেছেন। ইউএনও সাহেব ষ্টেশনে আসলে আইন শৃংখলা মিটিং করে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।

জাজিরা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান তনাই মোল্যা বলেন, দলীয় নেতারা আমাকে নির্বাচনের কাজ পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়েছেন তাই আমি বক্তৃতা দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগে মিথ্যা ও বানোয়াট। আমি কোন প্রার্থীকে হুমকি ধমকি দেইনি।
এ ব্যাপারে শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য বি.এম মোজাম্মেল হককে বার বার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

কিউএনবি/ রিয়াদ/১৩ই এপ্রিল, ২০১৭ ইং/সকাল ৮:৩৫