১৬ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:০৩

আমাদের হাসান-হোসেন

ডেক্সনিউজঃ  ইসলামের সূচনায় বিশ্বনবী (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হাসান-হোসেন জহরে কহরে নিহত হয়েছিলেন। বিরাট প্রভাব পড়েছিল মুসলিম উম্মাহর ওপর। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে আক্রান্ত হয়ে আমাদের হাসান-হোসেন ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন। হাসান-হোসেনের চেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সভ্যতা-ভব্যতা ও মর্যাদা। পৃথিবীর সর্বত্রই কমবেশি দুর্নীতি আছে এবং থাকবে। কিন্তু দুর্নীতি হওয়ার আগেই দুর্নীতির স্বপ্ন দেখা— এ নিয়ে এত বড় ঝড়-তুফান আগে কখনো দেখিনি। হ্যাঁ, আল্লাহতায়ালা সব দেখেন, সব জানেন। মনে মনে ভাবার অপরাধেও তিনি শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু এই জগৎ সংসারে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই সে অপরাধ নিয়ে কে কী চিন্তা করছে বা কারা কী কৌশল করছে তা নিয়ে কাউকে আদালতে নেওয়া যায় এবং সে কারণে কোনো দেশ বা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এসব ছিল কল্পনার অতীত। তবু বাস্তবে তেমনটাই হয়েছে।

হোসেন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না, হাসান নিয়ে ছিল। আমার পরম সুহৃদ আপনজন হাসানের বাবা বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। বহির্বিশ্বে তার অবদান সূর্যের মতো উজ্জ্বল। মুসলিম লীগ পরিবার হওয়ার কারণে হাসানের দাদা আবদুল হামিদ চৌধুরীর যেমন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ও অবদান ছিল, তেমনি তার বাবা বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দাদার চেয়ে শতগুণ বেশি ভূমিকা রেখেছেন। তাই অমন একটি পরিবারকে যখন নিগৃহীত করা হয় তখন বুকে না বিঁধে পারে না। সে কারণে সাহসের সঙ্গে সত্য বলার চেষ্টা করেছি। সেটা হাসান-হোসেনের ব্যাপার ছিল না, ছিল ন্যায় ও সত্যের। শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হওয়ায় নিশ্চয়ই আমরা আনন্দিত। আমার কথা ছিল হাসানকে নিয়ে। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সারকে নিয়ে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে কাউকে কাউকে নিয়ে তদবির করেছেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে সাহায্য করা আমাদের দেশে কোনো অপরাধ নয়। বরং আমাদের দেশে সেটা সেবা। সেই মানবিক গৌরবের কাজটিই আমাদের প্রিয় ভাতিজা করেছে। এজন্য আমরা গর্ব করি। সে যে কোনো অন্যায় করেনি বরং যা করেছে ন্যায় করেছে, শেষ পর্যন্ত তাই প্রমাণিত হলো, এজন্য আল্লাহকে লাখ লাখ শুকরিয়া।

প্রেমের কারণে এ জগৎ। আশিক-মাশুকের দুনিয়া। আমরা আল্লাহর আশিক। কিন্তু আল্লাহ রসুলের আশিক। এই জগৎ সংসারে যৌবনে সব নর-নারী প্রেম করে। কারণ আল্লাহর সৃষ্টিলীলাই প্রেম। রূপ-রস-প্রেমহীন জগৎ কল্পনাতীত। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের বাংলায় যৌবনে কেউ প্রেম করেনি, কবিতা লেখেনি, গান গায়নি সে এক বিরল ঘটনা। বাংলার আকাশ-বাতাস, রাস্তাঘাট, মাঠ-ময়দান ছেলেমেয়েদের কবিতা লেখার স্থান। যারা লেখাপড়া জানে না, তারাও মনে মনে সুর তোলে। আমি এক সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগা, যৌবনে কোনো মেয়ের হরিণ চোখ দেখিনি, ভালোবাসিনি। কোনো গানের সুর তুলিনি, এক লাইন কবিতা লিখিনি বা লিখতে পারিনি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আমার মধ্যে ভালোবাসা বা প্রেম ছিল না। আমি এক বিশ্বপ্রেমিক। জগৎ সংসার, দেশ, দেশের নেতা, বন্ধু-বান্ধব, মা-বাবা, ভাইবোন সর্বোপরি স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ভালোবাসার মধুর সাগরে ডুবে আছি— এমন আবহাওয়া বা পরিবেশ খুব বেশি মানুষের ভাগ্যে জোটে না। আমি মুক্তিযুদ্ধের রক্তারক্তি দেখেছি। লক্ষাধিক জনবল নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহে কত রক্তে ভেসেছি। হানাদারদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া, ছিন্নভিন্ন ক্ষতবিক্ষত শত শত রক্তাক্ত দেহ যেখানে সেখানে পড়ে থাকতে দেখেছি। কিন্তু সেই যুদ্ধেও দেখে-শুনে একটি পিঁপড়ার গায়ে পা দিতে চেষ্টা করিনি। কোনো অভিযুক্তকে পশুর মতো নির্মম নির্যাতন করিনি। অভিযুক্তের আত্মীয়স্বজন, বাবা-মাকে অযথা অপমান-অপদস্থ করিনি। তার পরও জানি, যেহেতু যুদ্ধবিগ্রহ করেছি তাই অনেকের ধারণা, ধরো-মারো-কাটো এমনটাই হবে। কিন্তু আমি জানি বড় কাজে উত্তেজনা, ধরো-মারো-কাটো ওসবের কোনো মূল্য নেই। বড় কাজে ধীরস্থিরশান্ত থাকতে হয়। সব সময় পেরেছি তা হয়তো নয়। কিন্তু নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। তাই আজ হাজারো বঞ্চনার মাঝেও আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে তাঁকে ভয় করে হাজারো ধনবানের চেয়ে অনেক আনন্দে আহ্লাদে শান্তি-স্বস্তিতে আছি। সংসারে তেমন খিটিমিটি নেই। ছেলেমেয়ে নিয়ে দুর্ভাবনা নেই। শরীরের ৭০-৮০ জায়গায় আঘাতের চিহ্ন নিয়ে ক্ষতবিক্ষত আমার কলিজার টুকরা, বুকের ধন কুশিমণি তুলোয় পেঁচিয়ে বাড়ি এসেছিল। কিন্তু তাকে নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না। বাড়িতে যখন তখন তেমন শোকবালাই, বালা-মুসিবত নেই। এজন্য আল্লাহর প্রতি লাখো কোটি শুকরিয়া। তিনি যখন যাকে যা দেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। মোটামুটি তাই থাকি এবং আছি।

৯ ফেব্রুয়ারি সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের মেয়ে আনিকা নুসরাতের সঙ্গে চৌধুরী নাদওয়াৎ মুনীর নাদীরের বিয়ে ছিল। ১০ তারিখ সকালে টাঙ্গাইলে এক ঘরোয়া সভা ছিল। সুলতানের মেয়ের বিয়ে, না করতে পারছিলাম না। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে সর্বস্বান্ত আমি যখন মেঘালয়ে তখন হালকা-পাতলা লিকলিকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আমার কাছে গিয়েছিল। সঙ্গে ছিল বিয়ানীবাজারের ক্যাপ্টেন জলিল ও বেশ কয়েকজন। ক’দিন পর ইল্লি দিল্লি লন্ডন ঘুরে শাহ আজিজ এসে যোগ দেয়, তারও আগে না পরে নাসিম, মঞ্জু, শেখ মারুফ, খালেদ খুররম আরও অনেকে এসে প্রতিরোধ শিবির ভরে তোলে। সুলতান ছিল বাবরুল হোসেন বাবুলের কর্মী। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতনের পর শ্রী মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমাদের কয়েক হাজার প্রতিরোধ যোদ্ধাকে জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দিলে মৌলভী সৈয়দসহ প্রায় ১০০ জনকে এক দিনে গুলি করে মেরে ফেলে। তার পরও রাজা দীপঙ্কর, নাসিম, মাহাবুব, সুলতান, গিয়াস, বৌদ্ধ, গৌর পাশে ছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজের কাছে পরাজিত নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পাটনা যেতে চেয়েছিলেন। পারেননি। সেজন্য হয়তো নবাবি উদ্ধার হয়নি। কিন্তু ’৭৭ সালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে সরিয়ে শ্রী মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হলে নেতাজি সুভাষ বোসের ব্যক্তিগত সহকারী ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা শ্রী সমর গুহ এমপির সহযোগিতায় জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সর্বোদয় নেতা শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের বিহারের কদমকুয়ার বাড়িতে গিয়েছিলাম। পরে কতবার গেছি হিসাব নেই। সুলতান গেছে, নাসিম গেছে, একসময় বাসসের প্রধান জাওয়াদুল করিম গেছেন। শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণকে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশের অগণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বোঝাতে পেরেছিলাম। তাই পরবর্তীতে শ্রী মোরারজি দেশাই আমাদের ওপর তেমন কঠোর হতে পারেননি। ’৮১ সাল পর্যন্ত যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিরাপদে ভারতে ছিলেন সেও ছিল শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গে আমাদের আলোচনার ফসল।

কুইকনিউজবিডি.কম/ মাসুম / ১৩ই ফেব্রুয়ারি,  ২০১৭ ইং  / সকাল ৭:27