১৭ই জুন, ২০১৯ ইং | ৩রা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | রাত ২:৪৪

‘মা, আমার অনেক কষ্ট’

শীতের সকালে গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে জবুথবু হয়ে বসে ছিলেন আলিনগর গ্রামের একটি বাড়ির আঙিনায়। একটু দূরেই তাঁর নিজের বাড়ি। রোদ পোহাতে প্রায়ই আসেন এখানে।

জিজ্ঞেস করি, কবে থেকে এই বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন?

ভানুমতির উত্তর, ‘এই পাঁচ-ছয় বছর ধরি টাকাটা পাই। কিন্তু মা, আমার এত অসুখ। ওষুধ কিনতে এক মাসেই এই চেইয়া বেশি টাকা লাগে।’

মাসে কত টাকার ওষুধ কিনতে হয়?

‘এই ধরেন তিন হাজার টাকা।’

তো বাকি টাকা কীভাবে জোগাড় করেন?

‘জোগাড় হয় না মা। মাঝেমইধ্যে লোকজনের কাছ থেইক্যা কর্জ করি। কিন্তু শোধ তো দিবার পারি না। তখন মাইনষের অনেক কথা শুনন লাগে। এখন আর মাইনষে কর্জও দিতে চায় না।’

আপনি থাকেন কার কাছে? বাড়িতে আর কে কে আছে?

‘আমি আমার ছেলের কাছে থাকি।’

ছেলে কী কাজ করেন?

‘কী আর করবে? পড়ালেখা করাইতে পারি নাই। ছেলে আমার কামার। দা-বঁটি বানায়।’

ছেলের রোজগার মাসে কেমন?

‘কেমন আর, এই কখনো চাইর হাজার, কখনো পাঁচ হাজার। এর বেশি হয় না। কিন্তু এই টাকা দিয়া তো মা সংসারই চলতে চায় না। আমারে আলাদা কইরা ওষুধ কিনা দিব কেমনে?’

আপনার অসুখটা কী?

‘লিভারের অসুখ মা। নিয়ম কইরা ওষুধ খাওনের কথা। কিন্তু টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারি না। তাই অসুখও ভালা হয় না।’

আপনার কি এই এক ছেলেই? আর ছেলেমেয়ে নেই?

‘আমার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। থাকি ছোট ছেলের কাছে।’

বাকি ছেলেমেয়েরা আপনাকে দেখে না?

‘বড় ছেলের অসুখ। কোনো কাম তো করবার পারে না। রোজগারই নাই। হে আমারে দেখব কী। ছেলের ঘরে দুইটা নাতি আছে, তারা যা আয়-রোজগার করে তা দিয়া বড় ছেলের সংসার কোনো রকম চলে। আর মেয়ে দুইটার তো মা বিয়া দিয়া দিছি। তারা তাগো সংসার নিয়া আছে। ছমাসে-নমাসে এক-দুই শ টাকা দেয়। হেই দিয়া কি আর কিছু হয়। কিছু হয় না।’

ব্যাংক থেকে টাকা তোলার সময় কোনো ঝামেলা বা অসুবিধা হয়?

‘না, কোনো অসুবিধা হয় না।’

এরপর ভানুমতি গায়ের চাদর সরিয়ে ডান হাতটা দেখান। দেখলাম প্লাস্টার করা। জানতে চাই কী করে তিনি হাত ভাঙলেন। ভানুমতি বলেন, কদিন আগে সোনালী ব্যাংক থেকে বয়স্ক ভাতার টাকা তুলে তিনি হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। এমন সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা তাঁকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। পড়ে গিয়ে তাঁর ডান হাতটি ভেঙে যায়। হাতের চিকিৎসা করাতে গিয়ে এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। ধার করে ভানুমতিকে এই খরচ মেটাতে হয়েছে। এই ধার তিনি কীভাবে শোধ দেবেন জানেন না।

এরপর ভানুমতি আমার কাছে জানতে চান, ‘কিন্তু মা আপনি আমার কাছে এত কথা জানতে চাইতাছেন কেন?’ নিজের পরিচয় দেওয়ার পর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ভানুমতির।

বলেন, ‘ও পেপারে কাজ করেন? তাহলে আপনার পেপারে একটু লেইখা দেন না যে আমাগো মতো বুড়াদের সরকার যেন আরও একটু বেশি টাকা দেয়। আমরা তো সরকাররে অনেক দোয়া করি। সরকার যদি চিকিৎসার লেইগা আলাদা কইরা কিছু টাকা দিত তাহলে খুব ভালা হইত। মা, আপনারে কী বলব, আমার অনেক কষ্ট।’

কুইকনিউজবিডি.কম/ মাখলুকাত / ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং / সকাল ১০:০৯

Please follow and like us:
0
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial