২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১২:৫৪

নতুন বই, নতুন আশা

ডেক্সনিউজঃ নতুন বইয়ের গন্ধ পেতে অপেক্ষা করছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কাল রবিবার বই উৎসব।দেশের চার কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থীর হাতে বিনা মূল্যে নতুন বই তুলে দেওয়া হবে, যা বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত, অনন্য নজির। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো নিজের ভাষায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ২৪ হাজার ৬৬১ জন শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হবে।

আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষের বই বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। সকাল ১০টায় গণভবনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কিছু শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ যখন বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে ৩৬ কোটি বই তুলে দেওয়ার কথা বলেন, তখন সবাই অবাক হন। আর এই মহৎ যজ্ঞের প্রশংসা করে অনেককেই বলতে শোনা যায়, এই ৩৬ কোটি বই যদি একটির সঙ্গে আরেকটি জোড়া দেওয়া যায় তাহলে হয়তো পুরো পৃথিবীই প্রদক্ষিণ করা যাবে।

প্রতিবছরের মতো এবারও বছরের প্রথম দিন কাল রবিবার উদ্যাপিত হচ্ছে বই উৎসব। আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে বই উৎসব করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে উৎসবের আয়োজন করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

শুধু রাজধানীতেই নয়, সারা দেশের সব স্কুলেই উৎসবের মাধ্যমে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হবে নতুন বই। গত সাত বছর ধারাবাহিকভাবে এই উৎসব উদ্যাপনের ফলে এটা এখন একটা সর্বজনীন উৎসবের রূপ পেয়েছে। স্কুলে স্কুলে চলছে আয়োজনের প্রস্তুতি। অনেক স্কুলই বইয়ের সেট মিলিয়ে ফিতা দিয়ে বেঁধে আরো আকর্ষণীয়ভাবে নতুন বইগুলো শিশুদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিশুরাও নতুন আশা নিয়ে নতুন বইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, প্রাক-প্রাথমিকের ৩২ লাখ ৬২ হাজার ৮৬৪ শিক্ষার্থী পাবে এক কোটি পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার ৮৩২টি বই, প্রাথমিকে দুই কোটি ১৭ লাখ ২১ হাজার ১২৯ শিক্ষার্থী পাবে ১০ কোটি ৫২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৭টি বই, মাধ্যমিক ও এসএসসি ভোকেশনালে এক কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ২৬৮ জন শিক্ষার্থী পাবে ১৭ কোটি ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ৩৬৮টি বই, এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনালে দুই লাখ ১০ হাজার ৭৭৫ জন শিক্ষার্থী পাবে ৯ লাখ ২১ হাজার ১১০টি বই এবং ইবতেদায়ি ও দাখিলে ৫৩ লাখ ৫৭ হাজার ২১ জন শিক্ষার্থী পাবে পাঁচ কোটি ৭১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮৫টি বই।

এবারই প্রথমবারের মতো নিজেদের ভাষায় পাঁচ নৃগোষ্ঠীর ২৪ হাজার ৬৬১ জন শিশু ৫১ হাজার ৭৮২টি বিনা মূল্যের বই পাবে। এসব নৃগোষ্ঠীর শিশুরা প্রথম স্কুলে গিয়েই বাংলা ভাষা ঠিকমতো বোঝে না। তাই চাকমা, মারমা, সাদ্রী, গারো ও ত্রিপুরা এই পাঁচ ভাষার শিশুদের জন্য এবারই প্রথম প্রাক-প্রাথমিক স্তরে তাদের মাতৃভাষায় বই ছাপানো হয়েছে। এ ছাড়া এবারই প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বইও ছাপানো হয়েছে। এক হাজার ২৩১ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৯ হাজার ৭০৩ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পাবে ব্রেইল বই। তবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় সবার হাতে বই তুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি এনসিটিবি। এ ছাড়া এক কোটি ১৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৬৮টি টিচিং ম্যাটেরিয়াল একই সঙ্গে বিতরণ করা হবে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সব পর্যায়ের প্রায় শতভাগ বই পৌঁছে গেছে। সব শিক্ষার্থীই বছরের প্রথম দিন বই হাতে পাবে। তবে ভারত ও চীন থেকে ছাপানো বইগুলো আসতে কিছুটা সময় লাগছিল। সেগুলোও ইতিমধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর আগেরবারের পরিস্থিতি থেকে আমরা এবার খুবই সচেতন ছিলাম। বইয়ের মান ঠিক রাখার ব্যাপারে কড়া নজরদারি ছিল। ফলে এবার আর বইয়ের মান নিয়ে কারো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। ’

তবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান শতভাগ বই পৌঁছার কথা জানালেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক স্কুলেই এখনো শতভাগ বই পৌঁছেনি বলে জানা যায়। কিন্তু এতে উৎসবে কোনো ভাটা পড়বে না বলে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষক। কারণ বছরের প্রথম দিনই একবারে সব শিক্ষার্থী বই নিতে আসে না।

জানা যায়, গত সাত বছরে সরকারের অন্যতম অর্জন সব শিশুকে বছরের প্রথম দিনই বিনা মূল্যের বই তুলে দেওয়া। প্রতিবছরই বাংলাদেশ তাদের নিজেদের করা রেকর্ড নিজেরাই ভাঙছে। এটা একটা বড় দৃষ্টান্ত। গত সাত বছরে প্রায় ২৬ কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৯০ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের মে মাসে কোরিয়ার ইনচনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলনে ১৪০টি দেশের শিক্ষামন্ত্রীরা এ কথা শুনে বেশ খানিকটা অবাক হয়ে যান।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ রাজধানীর কয়েকটি ছাপাখানা পরিদর্শন শেষে বইয়ের মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার দুই কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ২৭৩টি বই বেশি ছাপা হচ্ছে। ছাপার কাগজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য এবার পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কাগজের রোল পরীক্ষা করার পর ভেতরে আনার অনুমতি দেওয়া হয়। এ কাজে যাতে কোনো গলদ না থাকে সে জন্য আমরা নিয়মিত কাজ তদারক করছি। গত বছর ছাপানো বইয়ে কাগজের মান নিয়ে কিছুটা অসন্তুষ্টি ছিল। সে জন্য বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাসহ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এবার আমাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে সেই সুযোগ নেই। সঠিক মানের কাগজেই বই ছাপানো হচ্ছে। ’

প্রতিবছর বিনা মূল্যের এই বিপুল বই ছাপানোর জন্য দেশীয় মুদ্রণ শিল্পও মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। হাজার হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এ ব্যাপারে বলেন, ‘আগে ছোট ছোট প্রেসে বই ছাপা হতো। বর্তমানে বিপুল পরিমাণ বই ছাপার কারণে বড় ধরনের ছাপাখানা গড়ে উঠেছে। তিন বছর আগেও এত বড় আকারের প্রেস ছিল না। পাঠ্যপুস্তক ছাপাকে কেন্দ্র করে এ শিল্পের বিকাশ হয়েছে। বড় আকারের প্রেস স্থাপন করা হয়েছে। এ শিল্পে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে উন্নতমানের অটোমেটিক মেশিনে ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। ’

জানা যায়, বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও একটি ক্ষেত্রে অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তা হচ্ছে বিনা মূল্যের বই বিতরণ। প্রতিবছর বাংলাদেশ তাদের নিজেদের করা রেকর্ড নিজেরাই ভাঙছে। প্রতিবছরই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। আর বইয়ের সংখ্যাও বাড়ছে। সারা বিশ্ব যা কখনো ভাবতেও পারেনি বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে। সাত বছর ধরেই একই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। এবারও বছরের প্রথম দিন ৩৬ কোটি বই শিশুদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান সরকারের সাফল্যে নতুন পালক যুক্ত করার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।

 

 

 

 

কুইকনিউজবিডি.কম/  মাখলুকাত / ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং / সকাল ৯:১৪