২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সন্ধ্যা ৬:৪৩

হারিয়ে যাচ্ছে শরীয়তপুরের ভেরণ বা ভেন্নার চাষ

এম.এ ওয়াদুদ মিয়া , শরীয়তপুরঃ শরীয়তপুর জেলায় প্রচুর উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে গেছে ভেরণ বা ভেন্নার চাষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও একটা সময়ে শরীয়তপুর জেলার ৬ টি উপজেলায়ই প্রচুর পরিমানে ভেরণ বা ভেন্নার চাষ করা হতো। যা ভাঙ্গিয়ে আমাদের দেশের গরীব চাষীরা দৈনন্দিন জীবনে ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণ করত। কিন্তু বর্তমানে সয়াবিন তেলের ধাক্কায় তা এখন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সয়াবীন তেলের তুলনায় ভেরণ তেলের পুষ্ঠিমান কোন অংশেই কম নেই এবং উৎপাদন খরচ নেই বললেই চলে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যদি কৃষকদেরকে উদ্ধুদ্ধ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন তাহলে সয়াবিন তেলের উপর নির্ভরতা অনেকাংশেই কমে যাবে এবং আমাদের দেশের উৎপাদিত ফসলের কদর বাড়বে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর গ্রামের কৃষক সুলতান সিকদার বলেন, আগে আমরা মাঠে ভেরন চাষ করতাম। কিন্তু এখন আর সেভাবে চাষ করা হয় না। এখন আমরা আমাদের চাহিদা পুরণের জন্য বাড়ির আশেপাশেই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় চাষ করি। কারণ আগে ভেরন ভাঙ্গানোর জন্য আমাদের অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ঘানি ছিল। এখন বর্তমানে একটা ঘানিও নেই। আমাদের যা ভেরন চাষ হয় তা ভাঙ্গাতে আমাদেরকে চাঁদপুর যেতে হয়। যার প্রেক্ষিতে আগের তুলনায় ভেরন চাষ আমরা কম করছি। যদিও সরিষা তেলের তুলনায় ভেরনে তেলের পরিমান অনেক বেশি এবং উৎপাদন খরচ নেই বললেই চলে। তথাপি আমরা যাতায়াতের সমস্যার কারণে পরিপূর্ন ভাবে ভেরন চাষ করছি না।নড়িয়া উপজেলার গুলমাইজ গ্রামের কৃষক আবু তাহের বলেন, আগে আমরা প্রচুর ভেরন চাষ করতাম। এখন আর বেশি চাষ করা হয় না। ঘরের পাশে চার পাঁচটা গাছ লাগিয়েছি। এগুলো আমরা সরিষার সাথে মিশিয়ে ভাঙ্গিয়ে নিয়ে আসি। এতেই আমার হয়ে যায়। আর তাছাড়া ভেরনের গাছে আমাদের লাকরির চাহিদা পুরণ হয়।
জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর গ্রামের কৃষক মানিক ফকির বলেন, আমরা প্রতি বছরই কম বেশি ভেরনের চাষ করি। ভেরন চাষ করলে আমাদের দুইটি সুবিধা রয়েছে। একদিকে আমাদের তেলের চাহিদা পূরণ হয়, অন্যদিকে আমাদের লাকরির চাহিদা পূরন হয়। মূলত আমরা লাকরির চাহিদা পূরনের জন্যই ভেরন চাষ করি। আর এ ব্যাপারে সরকার আমাদের কোন সহযোগীতা করেন না। সরকার যদি আমাদেরকে ভেরন চাষের জন্য সহযোগিতা করতেন তাহলে আমরা উৎসাহ নিয়েই ভেরন চাষ করতাম।একই গ্রামের কৃষক আলতাব মাঝি বলেন, ভেরন চাষ করে আমাদের লাভ কি ? এখন এগুলো বাজারে চলে না। আগে যা ও একটু চাষ করতাম এখন আর করি না।সদর উপজেলার উত্তর বালুচরা গ্রামের কৃষক আঃ আজিজ সিকদার বলেন, আগে আমরা সরিষার পাশাপাশি ভেরনের চাষও করতাম । সরিষার সাথে ভেরন মিশিয়ে ভাঙ্গালে তেলের পরিমান অনেক বেশি হয়। কিন্তু বর্তমানে জমি ব্লক হয়ে যাওয়ার কারনে আলাদা ভাবে ভেরনের চাষ করা হচ্ছে না। এখন আমরা আমাদের প্রয়োজন অনুসারে বাড়ির আশেপাশে চার পাঁচটি গাছ লাগিয়েছি।
এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ কবির হোসেন এর সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, ঐতিহ্যগত ভাবেই এ অঞ্চলে প্রচুর ভেরন চাষ হত এ ব্যপারটি আমি জানি। কিন্তু সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে মানুষ এখন ভেরন রেখে সরিষার উপর ঝুকে পড়েছে। পাশপাশি সয়াবিন তেলও বাজার দখল করে নিয়েছে। আমরা প্রায়ই কৃষকদেরকে ভেরন চাষের জন্য উৎসাহিত করি। সরকারের কাছে আমি এ ব্যাপারে লিখেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভেরন চাষের জন্য কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কোন চিঠি আসেনি।