১৯শে জানুয়ারি, ২০২০ ইং | ৬ই মাঘ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১:৩০

পেটের ক্ষুধায় ছাগলের জীবনবাজি

 

ডেস্ক নিউজ : পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের কাছে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর বিষয়। আজীবন পঙ্গুত্ব কিংবা নির্ঘাত মৃত্যু-ভয় উপেক্ষা করে হাজারো পর্বতারোহী এই নেশায় ছুটে বেড়ান বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ যেন তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে বারবার। 

তবে পর্বতারোহনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে হলে আরোহীকে কষ্ট স্বীকারের পাশাপশি বিপুল পরিমাণে গাঁটের পয়সা খরচ করতে হয়। কারণ সফলতার সঙ্গে পর্বতারোহন করতে প্রয়োজন বিপুল আধুনিক সরঞ্জাম, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং গাইড।

কিন্তু পৃথিবীতে এমন একটি প্রাণি আছে যারা কোনরকম প্রশিক্ষণ কিংবা আধুনিক সরঞ্জামের সাহায্য ছাড়াই হাজার হাজার ফুট উঁচু পর্বতের চূড়ায় উঠে যেতে পারে অনায়াসে। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি কুকুর, ভালুক বা সরিসৃপ জাতীয় প্রাণির কথা বলছি। আসলে তা নয়- এরা হলো মাউন্টেন গোট বা পাহাড়ি ছাগল। এরা প্রতিদিন কয়েক হাজার ফুট উচ্চতা পাড়ি দেয় শুধু পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য। 

এই প্রজাতির ছাগলের পাহাড়ে চড়ার কৌশল দেখে দক্ষ পর্বতারোহীরও চোখ ছানাবড়া হয়! একজন দক্ষ পর্বতারোহী পর্বতের যে উচ্চতায় উঠতে দিনের পর দিন রীতিমতো সংগ্রাম করেন, সেখানে একটি পাহাড়ি ছাগল গটগট করে আয়েশী ভঙ্গিতে সেই উচ্চতায় উঠে যেতে পারে।

পৃথিবীর নানা প্রান্তের পাহাড়ি অঞ্চালে এই ছাগলের দেখা মিললেও সব শ্রেণির ছাগলের পাহাড়ে ওঠার দক্ষতা একরকম হয় না। সবচেয়ে বেশি দক্ষ পাহাড়ি ছাগলের দেখা মেলে উত্তর আমেরিকার অ্যালপাইন পার্বত্য এলাকায়। তবে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে এবং আফগানিস্তান, ভিয়েতনামের রুক্ষ পাহাড়গুলোতেও এদের দেখা যায়।

অ্যালপাইন পার্বত্য এলাকার পরিবেশ জীবন ধারণের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এই এলাকায় বছরের অধিকাংশ সময় রুক্ষ থাকে। গাছপালাও জন্মে অনেক কম। এখানে সারাবছর তীব্র গতিতে বাতাস বয়। তাপমাত্রা ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। এই ধরনের প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার জন্য পাহাড়ি ছাগলের শরীর ঘন ও পুরু পশমে ঢাকা থাকে। ফলে মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রায় এরা টিকে থাকতে পারে। এছাড়া তীব্র বাতাসের বিপরীতে পর্বতশৃঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা আছে এদের। ঘণ্টায় ১৫০-১৬০ কি.মি. বেগে ধেয়ে আসা ঝড়ো হাওয়ার ধাক্কা সামলেও টিকে থাকতে সক্ষম এরা!

তাছাড়া অ্যালপাইন অঞ্চালে গাছপালা, ঘাস এবং পানি কম থাকায় পাহাড়ি ছাগলকে খাবারের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। এক একটি পাহাড়ি ছাগলের ওজন ১০০ থেকে ৩০০ পাউন্ড (১ পাউন্ড= ৪৫৩ গ্রাম)। এই বিশাল ওজন নিয়েও এরা খাবার সংগ্রহের জন্য হাজার হাজার ফুট উঁচুতে উঠে যায়। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায় খাবারের খোঁজে একটি পাহাড়ি ছাগলকে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠতে হয়।

গবেষকরা ছাগলের পাহাড়ে চড়ার নৈপুণ্য দেখে বিস্মিত হয়েছেন। কারণ ছাগলের মতো বড় শিংওয়ালা ভেড়ারও পাহাড়ে ওঠার দক্ষতা আছে। তবে পাহাড়ি ছাগলের কাছে এই দক্ষতা একেবারেই নস্যি! তবে কেন পাহাড়ি ছাগলের এই দক্ষতা? শরীরের কোন অঙ্গ তাদের এই দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে?

গবেষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে এই প্রশ্নের উত্তর। পাহাড়ি ছাগলের ক্ষুর অন্যপ্রাণি এমনকি ছাগলের অন্যান্য জাত থেকে একেবারেই আলাদা। তাদের ক্ষুরের অগ্রভাগ নরম এবং চম্বুকের মতো। এই ক্ষুরের কারণেই তারা সহজেই কোনরকম পতন ছাড়াই হাজার ফুট উচ্চতায় অনায়াসে উঠতে পারে। তবে অনেক গবেষক পাহাড়ি ছাগলকে ‘ছাগল’ বলে স্বীকার করতে চান না। তারা একে ছাগলের কাছাকাছি গোত্রের বলেন। একে তারা ‘গোট এন্টিলোপ’ বলে ডাকেন।

পাহাড়ি ছাগল সাধারণত ৯ থেকে ১২ বছর বাঁচে। বিশেষ সংরক্ষিত প্রকল্পে এদের আয়ু বেড়ে ১৫ থেকে ২০ বছরও হতে দেখা যায়। এদের বেশির ভাগের মৃত্যু হয় অত্যন্ত করুণভাবে পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে। অর্থাৎ যে পাহাড়ে ওঠার দক্ষতার জন্য তাদের এত নামডাক সেই কারণেই তাদের মৃত্যু হয় সবচেয়ে বেশি। এ যেন গ্রামবাংলার সাপুড়ে সমাজের প্রতিচ্ছবি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় সাপ নিয়ে নানা কারসাজি দেখানো সাপুড়ের মৃত্যু হয় সাপেড় কামড়ে।

পাহাড়ি ছাগলকে অনেকেই অনেকবার বাড়িতে এনে পোষ মানানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এরা জন্ম থেকে অদম্য। পোষ মানা এদের ধাতে সয় না। একটি পূর্ণবয়স্ক পাহাড়ি ছাগল থেকে বছরে প্রায় ৪০ কেজি উল পাওয়া যায়। কিন্তু এরা যেহেতু পোষ মানে না তাই উলের জন্য বাণিজ্যিকভাবে এদের ব্যবহারও করা যায় না।

‘ছাগল’ শব্দটি আমাদের দেশে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করে এমন কাউকে বোঝানো হয় যে, শিক্ষা-দীক্ষা, বোধ-বুদ্ধিতে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে। তবে এই উপমা সম্ভবত পাহাড়ি ছাগলের ক্ষেত্রে একেবারেই বেমানান। কারণ এরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক দক্ষ মানুষের চেয়েও দক্ষ!

 

 

কিউএনবি/রেশমা/৪ঠা ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং /বিকাল ৫:১০

↓↓↓ফেসবুক শেয়ার করুন