১০ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:০৭

ধর্মীয় বক্তা হওয়ার শর্ত ও যোগ্যতা

 

ডেস্ক নিউজ : আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিয়েছেন এবং তার গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ তথা সৎকর্মের আদেশ ও অন্যায় কাজে বাধা দেওয়া। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)

মানুষের মাঝে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তার পদ্ধতি কী হবে, তা-ও পবিত্র কোরআনে বাতলে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। বলেছেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো সুন্দর পন্থায়।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

তাই একজন দাঈর দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করার জন্য কিছু গুণ অর্জন করা আবশ্যক। তা হলো—

আল্লাহর ভয় থাকা : একজন দাঈর প্রধান গুণ হলো মুত্তাকি হওয়া। আল্লাহকে ভয় করা। এ ছাড়া কোনো মানুষের জন্য পরিপূর্ণ হকের ওপর টিকে থাকা সম্ভব নয়। অন্যকে হকের পথে ডাকা তো অনেক দূরের বিষয়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ২৮)

ইসলাম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা : একজন দাঈর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিনের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা। আল্লাহ বলেন, ‘…আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ব তারা বলে, আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর বিবেকসম্পন্নরাই উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭)

দ্বিনের জ্ঞান অর্জন না করে কেউ যদি উম্মতের পথপ্রদর্শক হয়ে যান, তবে এর মাধ্যমে উম্মাহর বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘…তিনি এর (কোরআনের) মাধ্যমে অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং এ দিয়ে অনেককে হিদায়াত দেন। আর এর মাধ্যমে কেবল ফাসিকদেরকেই পথভ্রষ্ট করেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬)

সত্যবাদী হওয়া : যিনি আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করবেন, তাঁকে অবশ্যই সত্যবাদী হতে হবে। নতুবা তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবেন না। বক্তাদের সত্যবাদী হওয়ার অর্থ হলো তিনি বানোয়াট কথা ও কোরআন-হাদিসের নামে মিথ্যাচার করবেন না। পবিত্র কোরআনে মানুষকে সত্যবাদীদের সঙ্গী হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

ধৈর্যশীল হওয়া : ধৈর্য মহৎ গুণ। আল্লাহর পথের আহ্বানকারীদের এই মহৎ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। নতুবা দাওয়াতের কাজে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। কেননা আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দিতে গেলে অনেক বিপদ আসতে পারে, সেক্ষেত্রে ধৈর্যের সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে হবে। আল্লাহ বলেন,

‘সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। যাদের ওপর কোনো বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমরা ফিরে যাব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৬)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ধৈর্যশীল তারা তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ১০)

কোমল স্বভাবের অধিকারী হওয়া : ভদ্রতা ও কোমলতা আদর্শ মানুষের গুণ। দ্বিনের দাঈর মধ্যে অবশ্যই এ গুণ থাকা বাঞ্ছনীয়। এ গুণের অধিকারী দাঈগণ দাওয়াতি কাজে সহজে মানুষের মাঝে প্রভাব ফেলতে পারেন। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে কোমলতা অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেরাউনের সঙ্গে কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা মুসা ও হারুন (আ.)-এর উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা উভয়ে ফেরাউনের নিকটে যাও, নিশ্চয়ই সে সীমালঙ্ঘন করেছে। অতঃপর তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলো। সম্ভবত সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীতি অবলম্বন করবে।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৪৩-৪৪)

রাসুল (সা.)-কে আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহর রহমতে তুমি তাদের প্রতি (অর্থাৎ স্বীয় উম্মতের প্রতি) কোমল হৃদয় হয়েছ। যদি তুমি কর্কশভাষী ও কঠোর হৃদয়ের অধিকারী হতে, তাহলে তারা তোমার পাশ থেকে সরে যেত। কাজেই তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও ও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন তুমি সংকল্পবদ্ধ হবে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

দ্বিনি কাজে একনিষ্ঠ হওয়া : দ্বিনি কাজে একনিষ্ঠতা ছাড়া কখনো দাওয়াতি কাজে সফলতা আসবে না। আর ইখলাস বা একনিষ্ঠতা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ১১)

কথায় ও কাজে মিল থাকা : আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো যা নিজেরা করো না? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।’ (সুরা : সফ, আয়াত : ২-৩)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন আমাকে মিরাজের রাতে নিয়ে যাওয়া হয় তখন আমি কিছু লোককে দেখলাম, যারা আগুনের কাঁচি দ্বারা নিজেদের ঠোঁট কাটছিল। আমি বললাম, হে জিবরাঈল! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আপনার উম্মতের বক্তাগণ, যারা মানুষকে ভালো কাজের জন্য আদেশ করত এবং নিজেদের ভুলে যেত, অথচ তারা কোরআন তিলাওয়াত করত। কিন্তু তারা চর্চা করত না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২২১১)

অন্যত্র তিনি বলেন, ‘কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এতে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। আর সে তা নিয়ে ঘুরতে থাকবে যেমনভাবে গাধা আটা পিষা জাঁতার সাথে ঘুরতে থাকে। জাহান্নামিরা তার নিকট একত্র হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবে, আপনি কি আমাদের ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করতেন না? সে বলবে, হ্যাঁ। আমি তোমাদের ভালো কাজের আদেশ করতাম; কিন্তু নিজে তা করতাম না। আর খারাপ কাজ থেকে তোমাদের নিষেধ করতাম; কিন্তু আমি নিজেই তা করতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৬৭)

► ওয়াজ করে কি পারিশ্রমিক নেওয়া যাবে

► ওয়াজ-নসিহত নবীদের উত্তরাধিকার

► বক্তা বেড়ে যাওয়া কিয়ামতের আলামত

► ওয়াজ মাহফিলের করণীয় ও বর্জনীয়

কিউএনবি/রেশমা/৩রা ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং/রাত ১২:২৬

↓↓↓ফেসবুক শেয়ার করুন