২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | সকাল ১০:২১

আজ সুবীর নন্দীর জন্মদিন : তোর হইবে মেঘের উপর বাসা

 

 

 

১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা শেষে ঢাকা বেড়াতে যাব। লিটন সহ এক সঙ্গে হাই স্কুলে পড়তাম। ক্লাস নাইনে উঠার পর লিটন এর বাবার বদলীর কারণে ওরা চলে গেল ঢাকায়। মহাখালীতে ওদের নিজের বাড়িও আছে।

ঢাকা যাবো, থাকবো কোথায় ? লিটনকে চিঠি লিখলাম, তোদের বাসায় থেকে ঢাকা শহর দেখব। লিটন পাল্টা জবাব দিল, আসবি সমস্যা নেই. কিন্তু বেশি করে টাকা নিয়ে আনিস , চুটিয়ে ঢাকা শহর দেখাবো।

জীবনের প্রথম একা একা ঢাকা যাওয়া। অবশেষে লিটনদের বাসায় পৌঁছে গেলাম। লিটন সহ ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াই, ফুচকা আইসক্রিম খাই। ঢাকা শহরে আমার দিন কাটে আনন্দে।

একদিন দুপুরে দুজনে জাদুঘর দেখতে গেলাম। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর দেখা শেষে আমরা দুই বন্ধু গেলাম পিজির নিচে কোহিনুর স্ন্যাক্স এ সিঙ্গাড়া খেতে। কোহিনুর এর কলিজা সিঙ্গারা নাকি ঢাকার নাম্বার ওয়ান সিঙ্গাড়া।

সৌম্য সুন্দর শুভ্র গায়ের রঙের একজন সুপুরুষকে ঠেলে আমরা দুজন সিঙ্গারা কিনে খাওয়া শুরু করলাম। কিছুক্ষন আগে যে সুপুরুষ মানুষটিকে ঠেলে আমরা কোহিনুর এ ঢুকেছি , হটাৎ তার দিকে তাকিয়ে দেখি , অরে ইনি যে সুবীর নন্দী।

মুখের মধ্যে সিঙ্গাড়া আটকে গেল।অপলক নেত্রে চেয়ে আছি আমার স্বপ্ন পুরুষ সুবীর নন্দীর দিকে। রেডিওতে গানের ডালি অথবা অনুরোধের আসরে যার গান নিয়মিত শোনার জন্যে ব্যাকুল হয়ে থাকতাম। শুনতেও পেতাম তাঁর গান। যে কথা নয়নে আগুন আল্পনা আঁকে, স্মৃতির পাপিয়া চোখ গেল বলে ডাকে অথবা বন্ধু তোর বরাত নিয়ে আমি যাব।

ঢাকার শাহাবাগ মোড়ে পিজির নীচে কোহিনুর কনফেকশনারি এন্ড স্ন্যাক্স এখনও আছে। এখনও কলিজার পরিমান কম হলেও সেই স্বাদের সিঙ্গারা পাওয়া যায়। রেডিও, টেলিভিশন ইউটিউবে আমরা এখনো শুনি সুবীর নন্দীর গান। পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই কিংবা পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা যাকে ঝর্ণা বলো। কিন্তু সুবীর নন্দী নামক সুপুরুষটি এখন আর নেই। তিনি আছেন মেঘের উপর বাসায়।

সুবীর নন্দীর জন্মদিন আজ। মরেও যিনি অমর হয়ে আছেন আমাদের আনন্দ বেদনার কাব্যময় জীবনে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে চলুন একটু ঘুরে আসি তাঁর বায়োগ্রাফিতে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত ও দেশ বরেণ্য জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর ৬৬তম জন্মদিন আজ। প্রয়াত এই শিল্পী ১৯৫৩ সালের ৩০ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানায় নন্দীপাড়া নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

সুবীর নন্দীর নানার বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাদেআলিশা গ্রামে। তার পিতা-সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সঙ্গীতপ্রেমী। তার মা পুতুল রানী চমৎকার গান গাইতেন কিন্তু রেডিও বা পেশদারিত্বে আসেননি কখনও।

ছোটবেলা থেকেই সুবীর ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে। তবে সঙ্গীতে তার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশবকাল চা বাগানেই কেটেছে। পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত বাগানেই ছিলেন। চা বাগানে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি স্কুল ছিল, সেখানেই পড়াশোনা করেন।

তবে পড়াশোনার অধিকাংশ সময়ই তার কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে। হবিগঞ্জ শহরে তাদের একটি বাড়ি ছিল, সেখানেই ছিলেন তিনি। পড়েছেন হবিগঞ্জ সরকারী হাইস্কুলে। তারপর হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুবীর নন্দী সেকেন্ড ইয়ারে পড়তেন।

১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণি থেকেই গান করতেন সুবীর নন্দী। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ বাবর আলী খান থাকলেও লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাশ।

সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। এ গান রচনা করেন মোহাম্মদ মুজাক্কের এবং সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম।

৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রে। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। এছাড়া তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করেছেন।

বরেণ্য এই শিল্পীর গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, আমার এ দুটি চোখ, বন্ধু হতে চেয়ে, আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, চাঁদের কলঙ্ক আছে, দিন যায় কথা থাকে, একটা ছিল সোনার কন্যা, হাজার মনের কাছে, পাহাড়ের কান্না, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার প্রভৃতি।

যিনি মানুষের হৃদয় জয় করা ছাড়াও ভূষিত হয়েছিলেন একুশে পদক, চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচচাস পুরস্কারসহ বিভিন্ন পদকে।

সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে ভুগছিলেন। পরবর্তিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তাকে সিঙ্গাপুর নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় চলতি বছরের ৭ মে তার মৃত্যু হয়।

সুবীর নন্দী আজ জরা ব্যাধি রোগ শোক, সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার এই ধরাধাম থেকে অনেক দূরে, পরপারে। তিনি বাসা বেঁধেছেন নীলাচল আকাশে, মেঘের উপরে।

ও আমার উড়ল পঙ্খীরে

যা যা তুই উড়াল দিয়া যা

আমি থাকব মাটির ভরে,

আমার চোক্ষে বৃষ্টি পরে

তোর হইবে মেঘের উপরে বাসা ।

লেখক পরিচিতিঃ লুৎফর রহমান একজন কলামিস্ট, মিডিয়া সংগঠক ও রাজনীতিবিদ। ‘৮০ এর দশকে একদা যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সহ ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম লড়াই আর উপাখ্যানের ইতিবৃত্ত নিয়ে ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া সহ সংবাদ মাধ্যমে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছেন লুৎফর রহমান। এখন থেকে নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হবে আমাদের সাহিত্য ও সম্পাদকীয় পাতায়।

 

কিউএনবি/অনিমা/৩০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং /বিকাল ৫:৫৮

↓↓↓ফেসবুক শেয়ার করুন