২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং | ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সকাল ১০:১২

লুৎফর রহমান’র কলামঃ সক্রেটিসের মৃত্যু ও হেমলক

 

“সক্রেটিসের মৃত্যু”নামে একটি চিত্রকর্ম আছে । আজ থেকে প্রায় তিনশ বায়ান্ন বছর আগে (খ্রি. ১৭৮৭) ফ্রান্সের শিল্পী জাঁক-লুই ডেভিড এই ছবিটা আঁকেন। ছবিটার গল্পটা সবারই জানা। সক্রেটিসের সামনে মেলে ধরা হয়েছে হেমলক বিষের পাত্র, সক্রেটিস সেটা নির্দ্বিধায় পান করছেন। ছবির ডান দিকে তার শিষ্যরা শোকে, ক্ষোভে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে। সক্রেটিসের বামে যে লোকটি হেমলকের পাত্র এগিয়ে দিচ্ছে, তার নিজের মুখও লজ্জায় ঢাকা, এমন জ্ঞানী একজন মানুষের মৃত্যু তার মাধ্যমে হচ্ছে, হয়তো সেই কারণেই।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছিল অ্যাথেন্সের কোর্ট। অভিযোগগুলো ছিল, অ্যাথেন্স রাষ্ট্রের দেবতাদেরকে তিনি স্বীকার করেননি, অলৌকিকতাকে ব্যাখ্যা করেছেন নিজস্ব দর্শন অনুসারে, এবং শহরের তরুণ সমাজকে নিজের দর্শন দ্বারা বিপথে চালিত করেছেন। যথেষ্ট গুরুতর অভিযোগ। এমন অভিযোগ কেন আনা হয়েছিল? বিচার ও শাস্তির পটভূমিটা জেনে নিলে সেটা বুঝতে সুবিধা হবে। সময়টা খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৩৯৯ এর মাঝামাঝি। নানাবিধ টানাপোড়েনে অ্যাথেন্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন টালমাটাল। কিছুদিন আগেই অ্যাথেন্স স্পার্টার সাথে যুদ্ধে নিদারুণভাবে হেরে গেছে (পেলোপনেশিয়ানের যুদ্ধ)। অমন ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরে ক্ষমতাশীল দল রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আনতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু জনমত তখনকার অ্যাথেন্সের রাজনীতি তথা গণতন্ত্রের ওপর ক্রমেই ভরসা হারাচ্ছিল। সক্রেটিস নিজেও ছেড়ে কথা বলছিলেন না। শাসকদের সমালোচনা করতে গিয়ে চিরশত্রু স্পার্টাদেরও রাষ্ট্রনীতির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন তিনি। একই সাথে তীব্র সমালোচনার মাধ্যমে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন গণতন্ত্রের নামে অ্যাথেন্সের শাসকগোষ্ঠীর ক্রমেই দমনমূলক হয়ে ওঠার সমস্যাগুলো।

স্বাভাবিকভাবেই এটা হর্তাকর্তাদের ভাল লাগে নি। তাই তাকে উপরের বর্ণিত অপরাধে অভিযুক্ত করা হলো। শুরু হলো বিচার। যথারীতি জুরিবোর্ডের সামনেও দুর্বিনীত আচরণ করলেন তিনি। সক্রেটিসের অন্যতম শিষ্য জেনোফোনের মতে, তিনি যেন ইচ্ছা করেই জুরি আর বিচারকদের ক্ষেপিয়ে তুলছিলেন, এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করছিলেন, যেন তাকে মৃত্যুদণ্ডই দেয়া হয়। সক্রেটিসকে হেমলক বিষ পানে হত্যা করা হয়। কি এই বিষ হেমলক ? সক্রেটিস সম্পর্কে যাদের আগ্রহ আছে তাদের জীবনে হেমলক একটি পরিচিত শব্দ। এখন আমরা জেনে নিতে পারি হেমলক রহস্য।

 

চিত্রঃ হেমলক গাছ

মহান সক্রেটিসকে যে হেমলক বিষপান করানো হয়েছিল সেটি ছিল হেমলক গাছের রস। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Conium maculatum. আইরিশরা এই গাছকে ডাকে Devil’s bread নামে, মানে ‘শয়তানের পাউরুটি’! হেমলক দ্বিবর্ষজীবী গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদ। পাঁচ থেকে আট ফুট লম্বা হয়। ছোট ছোট সাদা রঙের ফুল হয়। ভেজা, স্যাঁতসেঁতে জায়গায় জন্মে । নালার কাছে, নদীর ধারে এদের বেশি দেখা যায়। ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে হেমলক বেশি জন্মে ।

হেমলক গাছ পুরোটাই বিষাক্ত। পাতা,ফুল, ফল, কাণ্ড, শিকড় সবটা জুড়েই কোনিইন (Coniine) নামক বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ছড়িয়ে আছে। কোনিইন হচ্ছে বিষাক্ত অ্যালকালয়েড। কোনিইন নিউরোটক্সিন জাতীয় বিষ। এটি আক্রান্ত প্রাণীর দেহের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। কোনিইন মূলত প্রাণীদেহের ‘নিউরো- মাসকুলার জাংশন’-কে ব্লক করে দেয়। যে সব তন্তু স্নায়ুর সঙ্গে পেশির সংযোগ স্থাপন করে সেগুলোকে নিউরো-মাসকুলার জাংশন বলে। নিউরো-মাসকুলার জাংশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্নায়ুর সঙ্গে পেশির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে, পেশিকোষ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে যেসব পেশি যুক্সে গুলোওপ্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ায় আক্রান্ত প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হৃৎপিন্ড ও মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ না হওয়ায় আক্রান্ত প্রাণী দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

হেমলক উদ্ভিদ মানুষসহ অন্য যে কোনো প্রাণীর জীবনের জন্য হুমকি। বিশেষ করে তৃণভোজী প্রাণী ও বীজ ভক্ষণকারী পাখিরা হেমলকের বিষে আক্রান্ত হয়ে অনেক সময়ই মারা যায়। হেমলকের ছয় থেকে আটটি পাতায় যে পরিমাণ বিষ আছে তা কোনো মানুষের দেহে প্রবেশ করানো হলে মৃত্যু অনিবার্য! হেমলকের রস পান করে মহান দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যু পৃথিবীব্যাপী হেমলক বিষকে পরিচিত করে তুলেছে। শেক্সপিয়ার তার কিং লেয়ার, হ্যামলেট ও ম্যাকবেথ নাটকে হেমলক বিষের কথা উল্লেখ করেছেন। সারা পৃথিবীজুড়ে অনেক টিভি সিরিয়াল ও সিনেমার কাহিনীতে হেমলক বিষ ব্যবহার করা হয়েছে।

 

লেখক পরিচিতিঃ লুৎফর রহমান একজন কলামিস্ট, মিডিয়া সংগঠক ও রাজনীতিবিদ। ‘৮০ এর দশকে একদা যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সহ ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম লড়াই আর উপাখ্যানের ইতিবৃত্ত নিয়ে ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া সহ সংবাদ মাধ্যমে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছেন লুৎফর রহমান। এখন থেকে নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হবে আমাদের সাহিত্য ও সম্পাদকীয় পাতায়।

 

 

কিউএনবি/অনিমা/৩০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং /রাত ১২:৫৮

↓↓↓ফেসবুক শেয়ার করুন