১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | রাত ১১:১০

জাবিতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কর্মসূচি অব্যাহত

 

ডেস্ক নিউজ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির অপসারণের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুধবার রাতে ক্যাম্পাসে সব ধরনের মিছিল সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।  এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে বারটার দিকে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন তারা। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের দাপ্তরিক কার্যক্রম।  এদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ভিসির বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ জমা দেয়া হবে বলে জানান আন্দোলনকারীরা। শুক্রবার বিকাল তিনটায় রাজধানীর শাহবাগে একটি মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।

অপরদিকে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীদের শাস্তি পেতে হবে প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আশাব্যঞ্জক বলে মন্তব্য করেছেন তারা।  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়ায় তারা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। ভিসিপন্থীরাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। উভয়পক্ষই তদন্তের দাবি জানান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আনীত অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত সমাধান চান।  প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার পর থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নতুন ও পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে প্রবেশে বাধা দেয়। এতে বন্ধ হয়ে পড়ে সব ধরনের দাফতরিক কার্যক্রম। পরে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুর সাড়ে বারোটায় পুরাতন প্রশাসনিক ভবন থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি প্রান্তিক গেট হয়ে ভিসির বাসভবনের রাস্তায় কিছুক্ষণ অবস্থান নেয়। যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। পুরাতন প্রশাসনিক ভবনে এসে মিছিলের সমাপ্তি হয়।

সেখানে ‘উপাচার্য অপসারণ মঞ্চে’ এসে সমাবেশ করেন আন্দোলনকারীরা। সমাবেশে বক্তারা হল বন্ধের প্রতিবাদ, ছাত্রলীগের হামলার বিচারসহ দুর্নীতির অভিযোগে ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে পদত্যাগের দাবি জানান। সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি মাহাথির মুহাম্মাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক শোভন রহমান প্রমুখ। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সন্ধ্যায় ভিসির বাসভবনের সামনে কনসার্টের আয়োজন করেন আন্দোলনকারীরা। কনসার্ট করতে তাদের কেউ কোনো ধরনের বাধা দেয়নি বলে জানিয়েছেন তারা। এর আগে বুধবার রাতে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে সব ধরনের সভা, সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাকে অযৌক্তিক দাবি করে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন আন্দোলনকারীরা।

এর আগে রোববার রাতে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা সাক্ষাৎ করেন। মন্ত্রী তাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। এ বিষয়ে আন্দোলনকারী অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনু বলেন, আমরা অভিযোগ লিখছি। ৭-৮ তারিখের মধ্যে অভিযোগ দেয়ার কথা ছিল। আমরা আজ (বৃহস্পতিবার) মিটিং করে অভিযোগের বিষয়টি চূড়ান্ত করব। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রাপ্ত তথ্যপ্রামণসহ অভিযোগ জমা দেব। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ভিসিপন্থী এবং ভিসিবিরোধী সবাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তদন্তেরও দাবি সবার।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভিসিপন্থী সংগঠন ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং উন্নয়নের পক্ষে জাহাঙ্গীরনগর’র আহ্বায়ক পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক এ এ মামুন যুগান্তরকে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ভিসির দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তার সঙ্গে আছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তিনি দুর্নীতি করেননি। আমরা চাই আনীত অভিযোগের তদন্ত হোক। ভিসিও চান তদন্ত হোক। প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তারা বিষয়টি দেখবেন। সরকার যেহেতু এই অভিযোগের বিষয়টি দেখছেন সেখানে এ নিয়ে মন্তব্য করব না।  আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যে হুশিয়ারি দিয়েছেন তাকে আমরা ইতিবাচক বলেই মনে করি। তিনি সারা দেশে ঘটে যাওয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন। আমাদের আন্দোলনও দুর্নীতির বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের আন্দোলনের দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে নজর দিয়েছেন এজন্য আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা আশা করছি তিনি শিগগিরই একটি কমিটি করে বিষয়টার একটা সুরহা করুক।’

তবে কোনো দুর্নীতি তদন্তের দায়-দায়িত্ব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নয়; এটা রাষ্ট্রের কাজ এবং রাষ্ট্রকেই জাবির দুর্নীতির বিষয়টি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে বলে দাবি করেছেন আন্দোলনের আরেক সংগঠক সুস্মিতা মরিয়ম। শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি মরিয়ম আরও বলেন, ‘ছাত্রলীগের যে নেতারা টাকা পেয়েছেন তারাই মিডিয়ার সামনে স্বতঃফূর্তভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তারাই স্বীকার করেছেন কিভাবে টাকা ছড়ানো হয়েছে। দুর্নীতির প্রমাণ করা আন্দোলনকারীদের কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রী এসবই বোঝেন। তিনি যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের এই জাগরণের মর্মার্থ বুঝতে পারেন আমরা তাকে সাধুবাদ জানিয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলমান থাকবে বলে মন্তব্য করেছন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধ জাহাঙ্গীরনগর’র মুখপাত্র অধ্যাপক রায়হান রাইন। তিনি বলেন, ‘আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, চিত্রাঙ্কন, গান-নাটকের মাধ্যমেও আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে যাব।’ জাবির আন্দোলনের সমর্থনে আজ শুক্রবার বিকাল তিনটায় রাজধানীর শাহবাগে একটি মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও নগরিকদের সমাবেশ’ শিরোনামে ভিসির অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে জাবির মেগা প্রকল্পের অর্থ ভাগবাটোয়ারা বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেয়া শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের নামে একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সাদ্দাম দাবি করা ওই আইডি থেকে বলা হচ্ছে, ‘আমি যে কথা মিডিয়াতে বলেছিলাম সেটি নিছক রাজনৈতিক স্বার্থে।  সেই কথাকে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করার চেষ্টা করবেন না।’ কিন্তু স্বীকারোক্তি দেয়া আরেক নেতা হামজা রহমান অন্তরের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে এসে এ বিষয়ে কথা বলেন সাদ্দাম। বৃহস্পতিবার বিকালে লাইভে তিনি বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়।  এখনও সেটি ফিরে পাইনি। একটি দুষ্কৃতকারী মহল আমার নামে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভ্রান্তি এবং গুজব ছড়াচ্ছে। তাই এসব নোংরা গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন।’

এই সাদ্দাম ও হামজা রহমান অন্তর তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর অনুসারী ছিলেন। জাবির মেগা প্রকল্প ঘিরে সাদ্দামের সঙ্গে গোলাম রাব্বানীর একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। পরে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে তিনি এই প্রকল্প থেকে টাকা পাওয়ার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন। পরে শাখা ছাত্রলীগের আরেক সহসভাপতি নিয়ামুল হাসান তাজও মিডিয়াতে টাকা পাওয়ার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন। এরপর ভিসির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন আরও বেগবান হয়।

 

কিউএনবি/আয়শা/৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং /সন্ধ্যা ৬:৪৫