ব্রেকিং নিউজ
১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:২৪

কর্মই যাকে স্মরণীয় করে রেখেছে

 

শামসুল ইসলাম সহিদ

সাহিত্য ডেস্ক : জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভাল। আর এই কর্মই মানুষকে মানুষের মাঝে স্মরণীয় করে রাখে। দেশের মানুষ এখনো মনে রেখেছে দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া শিক্ষার আলো বঞ্চিত দানবীর রনদা প্রসাদ সাহাকে তার কর্মের গুণে। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেন তার জীবন সংগ্রামের পথচলা।আমদের দেশে সামজিক কর্মকান্ডে অনন্য অবদানের জন্য হাতে গুনা যে কয়েকজন ব্যক্তি রয়েছেন তাদের মধ্যে দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা অন্যতম। অথচ তার নিজ এলাকা মির্জাপুর বাসী সহ অনেকের কাছেই কষ্টদায়ক যে, জাতীয়ভাবে এই মহান ব্যক্তিকে এখনো স্মরন করা হচ্ছেনা।তবে আমরা কিন্তু আশাবাদী।  আজ ৮ নভেম্বর শুক্রবার উত্থান একাদশী। তিথি অনুযায়ী এশিয়া খ্যাত কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার ১২৩ তম জন্মজয়ন্তী। ১৮৯৬ সালের এই দিনে তিনি ঢাকার অদূরে সাভারের কাছুরে মামাবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার লৌহজং নদীর তীর ঘেঁষা মির্জাপুর গ্রামে। মাতার নাম কুমুদিনী সাহা, পিতার নাম দেবেন্দ্র নাথ সাহা।

মানব সেবার এক অনন্য নজীর এশিয়া খ্যাত কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা।একেবারে শুন্য হাতে শুরু করে জীবন সংগ্রামে সফলতা লাভ করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার মনে হলেও কারো জীবনে তা অর্জীত হয়েচে কঠোর পরিশ্রম,অধ্যবসায় আর অদম্য সাহসিকতা ও ধৈর্য্য নিয়ে সামনের দিকে পথ চলে। বলা যায়, জিরো থেকে হিরো।ঠিক এমনই একজন হিরোর গল্প লিখা প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে। কোন সিনেমা কিংবা নাটকের নয়, তিনি হলেন জীবন সংগ্রামে জয়ী এক সফল হিরো। দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, হত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে শিশু কালেই পিতা মাতা হারিয়ে অশিক্ষার অন্ধকারে শুন্য হাতে জীবন সংগ্রাম শুরু এই মহা মনিষ্যির।

মাত্র সাত বৎসর বয়সে দারিদ্র্যতার জন্য টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করেন ভবিষ্যতে তিনি হত দরিদ্র চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু করবেন। মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা দেবেন্দ্রে নাথ সাহা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দারিদ্রের কঠোর কষাঘাত ও সৎ মায়ের অবহেলা ও অনাদারে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকেন রণদা। অভাবের তাড়নায় মানুষের বাড়িতে খাবার চেয়েও খেয়েছেন তিনি। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য দিনমজুরের কাজ থেকে শুরু করে অনেক ধরণের কাজই তিনি করেছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নতুন ভবিষ্যত গড়ার আশায় তিনি কলকাতা পাড়ি জমান। সেখানে বেঙ্গল এম্বুলেন্স কোরে যোগদান করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়ে বীরত্বগাঁথা ভূমিকার জন্য বিভিন্ন মহলে প্রশংসা অর্জন করেন। পরিচয় হয় জর্জ ভি এর সাথে। তার মাধ্যমে তিনি রেলওয়ে বিভাগে টিটি হিসেবে চাকরী নেন। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি চাকরীটি হারান।

১৯৩২ সালে তিনি কলকাতাতে ছোট আকারে লবণ ও কয়লার ব্যবসা শুরু করেন। এ ব্যবসা থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। তিনি বেঙ্গল রিভার নামে একটি জাহাজ ক্রয় করেন। তিনি নারায়ণগঞ্জে ময়মনসিংহ ও কুমিল্লাতে তিনটি পাওয়ার হাউজ ক্রয় করেন। নারায়ণগঞ্জে জর্জ এন্ডারসন কোম্পানীর পাটের বেল তৈরী করেন। পরবর্তীতে তিনি লেদার ব্যবসা শুরু করেন। এভাবে তিনি জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ এলাকা মির্জাপুরে ফিরে আসেন। সদা আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত আরপি সাহা ছেলেবেলার সংকল্পের কথা স্মরণ করে ১৯৩৮ সালে তিনি মির্জাপুর গ্রামের লৌহজং নদীর তীর ঘেঁষে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যা পরবর্তীতৈ ৭৫০ শয্যা বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ‘কুমুদিনী হাসপাতালে’ রূপ নেয়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিজে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হলেও নারী শিক্ষার জন্য তিনি ১৯৪২ সালে মির্জাপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতেশ্বরী হোমস। তাছাড়াও টাংগাইলে কুমুদিনী কলেজ, মানিকগঞ্জে পিতার নামে দেবেন্দ্রনাথ কলেজ প্রতিষ্ঠা সহ মির্জাপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। জীবন সংগ্রামে প্রতিষ্ঠা পেয়ে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হলেও তিনি ভোগ বিলাসে ব্যয় করেননি। অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তাঁর জীবনের অর্জিত সকল অর্থ তিনি উইল করে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল।  তিনি ছিলেন প্রখ্যাত লোক হিতৈষী মানবতাবাদী ও দানবীর। সংস্কৃতির দিকেও তার ছিল বড় ঝোঁক। তিনি প্রায়শই আনন্দ নিকেতনে আয়োজন করতেন যাত্রাপালা সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। যাতে তিনি নিজেও অনেক সময় অভিনয় করতেন।  ১৩৫০ বঙ্গাব্দের ভয়াবহ মন্বন্তরের সময় তিনি লঙ্গরখানা খুলেন। হাজার হাজার দরিদ্র লোক সেখানে প্রতিদিন খাবার গ্রহণ করত।

মহান এ ব্যক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ ই মে তাঁর একমাত্র ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা রবি সহ তাকে এদেশের দোসরদের সহাতায় পাক বাহিনী অপহরণ করে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত তাদের কোন খোঁজ মেলেনি।  পরবর্তীতে তাঁর একমাত্র পৌত্র রাজীব প্রসাদ সাহা কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে রণদা প্রসাদ সাহার অসমাপ্ত কাজগুলো শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি মির্জাপুরে কুমুদিনী মেডিক্যাল কলেজ, কুমুদিনী হ্যান্ডি ক্র্যাফট প্রতিষ্ঠা করেন।

আজ শুক্রবার উত্থান একাদশীতে তাঁর ১২৩ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে মির্জাপুর গ্রামবাসী এবং কুমুদিনী কল্যান সংস্থা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে প্রার্থনা সভা, রণদার প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক অর্পন,আলোচনা সভা, কবিতা আবৃতি, নৃত্য, সঙ্গিত রচনা প্রতিযোগীতা । সকাল সাতটায় রণদা প্রসাদ সাহার মির্জাপুর গ্রামের নীজ বাড়িতে প্রার্থনা সভা এবং তার প্রতিকৃতিতে গ্রামবাসীর পুস্পস্তবক অর্পনের মধ্য দিয়ে জন্ম জয়ন্তীর অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। দিনব্যাপি এই অনুষ্ঠান চলবে।

কিউএনবি/আয়শা/৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং /দুপুর ১:৫৩