১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং | ১লা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | দুপুর ২:৩০

অপূর্ণই রয়ে গেলো নায়ক রাজের ইচ্ছে…

 

বিনোদন ডেস্ক : ঢাকাই চলচ্চিত্রের মহীরুহ নায়করাজ রাজ্জাকের শেষ ইচ্ছা অধরাই রয়ে গেল। নায়করাজ চেয়েছিলেন ২০১৭ সালেই নতুন ছবির নির্মাণ কাজ শুরু করবেন। তা আর হলো না। তিনি চলে গেছেন দূর আকাশে। রুপালি পর্দার এই মহান তারকা প্রস্থানের পরও দূর আকাশে তারকা হয়ে আছেন। দূরাকাশ থেকে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। 

এমন কালজয়ী মানুষের মৃত্যু নেই, প্রস্থান হতে পারে না। তার শরীর চলে গেছে, আত্মা আর কর্ম জড়িয়ে আছে ১৬ কোটি মানুষের নিঃশ্বাস আর বিশ্বাসে। তার আদর্শ আর কর্মময় জীবন হয়ে থাকবে চলচ্চিত্র জগতের পাথেয়। 

২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই এ পত্রিকার সঙ্গে ছিল তার আত্মিক সম্পর্ক। পত্রিকার যে কোনো অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও ফোনে শুভকামনা জানাতে ভুলতেন না। নানা সময় তার অসুস্থতার মধ্যেও পত্রিকাটির খোঁজখবর নিতেন তিনি। 

২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি জীবনের ৭৬তম বসন্তে পা দিয়েছিলেন ঢালিউডের এই শ্রেষ্ঠ রাজা। নতুন বসন্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে উচ্ছ্বাসিত রাজা বলেছিলেন, ‘এই জীবনে আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। এক জীবনে অনেক পেয়েছি। সাড়ে সাত কোটি থেকে আজ ষোলো কোটি মানুষের হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা আর দোয়া পেয়েছি। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই এখনো আমাকে পরম মমতায় মনের গভীরে ঠাঁই দিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্র আমাকে একাধিকবার জাতীয় সম্মান দিয়েছে। স্বাধীনতা পদক দিয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাওয়ার নেই আমার।’

অবারিত প্রাপ্তির কথা বলতে গিয়ে উচ্ছ্বাস আবেগে জড়িয়ে আসছিল রাজার কণ্ঠ। তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি বলে ওঠেন, ‘আমি তো একজন সফল শিল্পী, বাবা আর মানুষ। সৃষ্টিকর্তা আমাকে মর্যাদার শীর্ষ আসনে বসিয়েছেন। তার কাছে কৃতজ্ঞ। যখন ভাবি আমি বাঙালি আর বাংলাদেশের শিল্পী, তখন খুব গর্ব হয়। পরিবার, দেশ আর মানুষের ভালোবাসায় আজ আমি গর্বিত রাজ্জাক। আমার জীবন ধন্য, পরিপূর্ণ। 

ছিয়াত্তরে দাঁড়িয়ে নায়করাজ বলেছিলেন, ইচ্ছা আছে নিয়মিত ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর। কিন্তু ভালো গল্প, চরিত্র আর ছবি কোথায়। আমাদের গর্বের চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে বুকের ভেতর এখন শুধু আহাজারির শব্দ। হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, সব শেষ হয়ে গেল। আর সহ্য হয় না। এই শিল্পের আর ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। তার কথায় ভালো ছবি পেলে দর্শক সিনেমা হলে অবশ্যই ছুটে যায়। এর প্রমাণ ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’সহ অনেক ছবি। 

নতুন প্রজন্মের যারা নির্মাণে আসছে তারা ভালো করছে। দুঃখ একটাই। তারা বিদেশি পুরস্কার আর উৎসবের জন্যই ছবি বানায়। তাদের বলব, তোমরা মেইনস্ট্রিমে আসো। চলচ্চিত্রকে বাঁচাও। ভিন্নধারা আর মূলধারা বলে কিছু নেই। তোমরা যদি এগিয়ে আস তাহলে কিছু বাজে লোক যারা চলচ্চিত্রকে ধ্বংসে মত্ত তারা পালাতে বাধ্য হবে। 

হতাশার সুরে নায়করাজ বললেন, ‘যৌথ প্রযোজনার নামে এখন স্মাগলিং শুরু হয়ে গেছে। প্রোপার যৌথ নির্মাণে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু নিয়মনীতি না মেনে এ দেশের মেয়েদের অশ্লীলভাবে পর্দায় উপস্থাপন করাটা তো বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে না। তাই তো দর্শক আজ দেশীয় ছবি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।’ 

নতুন জীবনের ঊষালগ্নে দাঁড়িয়ে নায়করাজ তার নতুন ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘এ বছরই নতুন ছবি নির্মাণের কাজ শুরু করব। সামাজিক বক্তব্য আর পারিবারিক গল্পের ছবি বানাব। আমাদের দেশে সামাজিক সমস্যার অন্ত নেই। এগুলো আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়। আজ আর একান্নবর্তী পরিবার দেখি না। নারী নির্যাতন চলছেই। এমন বিষয় নিয়ে এ বছরই জনসচেতনতামূলক ছবির নির্মাণ কাজ শুরু করব।’ 

তার কথায়, ‘এখন তো আর শক্তি নেই, বুদ্ধি দিয়ে যদি চলচ্চিত্র, সমাজ আর দেশের মানুষকে বাঁচাতে পারি, তাহলেই আমার জীবন পূর্ণতা পাবে।’ সবার দোয়া চাই, যেন আমার আগামী দিনগুলো সুস্থতা আর সমৃদ্ধিতে ভরে থাকে। 

নায়করাজের শেষ ইচ্ছার পূর্ণতায় বাদ সাধলো নিয়তি। তার স্বপ্ন অধরা রেখেই তাকে কেড়ে নিল পৃথিবী থেকে মৃত্যুদূত। নায়করাজ সব সময়ই চাইতেন চলচ্চিত্রের কাজ করতে করতেই যেন ক্যামেরার সামনে তার মৃত্যু ঘটে। তার সেই ইচ্ছা পূর্ণতা না পেলেও তিনি যেন এখনো গেয়ে ওঠেন-‘আমার মতো এত সুখী নয়তো কারও জীবন, কী আদর, স্নেহ, ভালোবাসায় জড়ানো মায়ার বাঁধন’…। আজ নায়ক রাজের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা…নায়ক রাজ আপনি যেখানেই আছেন জানি রাজার আসনেই সমাসীন আছেন…চিরদিন ভালো থাকুন, এই দোয়াই করি।

 

 

 

কিউএনবি/রেশমা/২১ শে আগস্ট, ২০১৯ ইং/রাত ৮:৫৯