১৬ই জুলাই, ২০১৯ ইং | ১লা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:১৯

আবার বেসরকারি খাতে পাটকল!

 

ডেস্ক নিউজ : জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার পাটকল রাষ্ট্রীয় খাতে পরিচালনায় মনোযোগী হলেও আবার তা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সক্রিয় চিন্তা শুরু হয়েছে। ব্যবস্থাপনায় গলদ ও অনিয়মের কারণে অব্যাহত লোকসানের মুখে সৃষ্ট শ্রম অসন্তোষকে পুঁজি করে এমন চিন্তার সূত্রপাত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ জুটমিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন খুলনা অঞ্চলের ৯টি পাটকলে ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে গত মার্চ মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কথাবার্তা শুরু হয় বিষয়টি নিয়ে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গত ১ এপ্রিলের এক চিঠিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে। ওই চিঠিতে বলা হয়, চলমান অচলাবস্থার সমাধান হিসেবে ‘পুরাতন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন, বেসরকারি বিনিয়োগ অথবা যৌথভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন’ বলে প্রধানমন্ত্রী মতামত দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি, এক জনপ্রতিনিধির নিকটতম স্বজন এবং একটি শিল্প গ্রুপ পাটকল কেনার বিষয়ে আগ্রহও দেখিয়েছে। সব বিষয়ে একমত হতে পারলে অন্তত দুটি বা তিনটি পাটকল বেসরকারি খাতে আবারও ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বলে সূত্রটি আভাস দিয়েছে।

বিজেএমসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেকটা ইচ্ছা করেই মজুরি-বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা না করে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যাতে সব মহলের মনে হয় বিজেএমসি ব্যর্থ। এরই মধ্যে শ্রমিকরা বিজেএমসি বিলুপ্তির দাবি করেছে। সব অব্যবস্থাপনার দায় যেন বিজেএমসির। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সময়মতো টাকা পাওয়া যায় না। বরাদ্দ না পাওয়ায় ঠিকমতো পাট কেনা যায় না। মিলগুলোর যন্ত্রপাতি পুরনো। আর মিলগুলোর শ্রমিকদের মজুরিও বেশি। নতুন মজুরি কমিশন বাস্তবায়িত হলে এই পাটকলগুলোতে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে শুধু মজুরি-বেতনের অর্থও সংকুলান হবে না। বর্তমানেই উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রি মূল্য বেশ কম। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের পাটকলগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। এ ছাড়া শ্রমিক-কর্মচারীরা মজুরি-বেতন না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে। তারাও চাইছে, তাদের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হোক; এরপর সরকার মিলগুলো যা করার করুক। এটি আর তাদের দেখার বিষয় নয়। নীতিনির্ধারকরা এই অবস্থাটি কাজে লাগাতে চাইছেন।

বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগ খুলনা-যশোর অঞ্চলের আহ্বায়ক ও ক্রিসেন্ট জুটমিল সিবিএর সভাপতি মো. মুরাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরাও শুনেছেন মিলগুলো সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা মিলেমিশে চালাবে। এতে বেসরকারি মালিক লাভবান হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আর ব্যক্তি মালিকের কাছে মিল দিলে সেই মালিক লাভবান হবেন। মিলের সম্পদ বিক্রি করে নিজের দখলে নেবেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এমন কিছু হলে রক্তের বন্যা বইবে। 

এ বিষয়ে নাগরিকদের সংগঠন পাট ও পাটশিল্প রক্ষা কমিটির সম্পাদক খালিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেসরকারি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) ব্যবস্থাপনায় পাটশিল্প ছেড়ে দিলে শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। এর আগে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া পাটকলগুলোর সম্পদ বিক্রি করে বেসরকারি মালিকরা লাভবান হয়েছেন। মিল বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, মিল যথাযথভাবে চালাননি, শ্রমিক ছাঁটাই করেছেন। যেসব পাটকল বেসরকারি উদ্যোক্তারা লিজ নিয়েছিলেন, সেগুলোও চলেনি। এ কারণে সরকার মিলগুলো ফিরিয়ে নেয়।’

পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান শাহ মো. নাসিম ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ সম্পর্কে কনক্রিট (সুনির্দিষ্ট) কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে পিপিপির ভিত্তিতে মিলগুলো পরিচালনা করা যায় কি না তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে।’ ওই পাটকলগুলো পরিচালনার জন্য পিপিপি ভালো পন্থা বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিজেএমসির চেয়ারম্যান জানান, এরই মধ্যে পাটপণ্য বহুমুখীকরণ বিষয়ক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিজেএমসির মিলগুলো নিয়ে একটি ইনডেপথ স্টাডি (নিবিড় সমীক্ষা) করতে হবে। এ জন্য একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা হচ্ছে। ওই স্টাডির পরামর্শের আলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার ছিল পাটকল আর বেসরকারি খাতে না দেওয়ার। সে অনুযায়ী ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় খাতে পাটকল পরিচালনায় মনোযোগী হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। এ কারণে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় বিজেএমসিকে। বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়া একাধিক পাটকল ফিরিয়ে নিয়ে পরিচালনা শুরু করে বিজেএমসি। জানা যায়, বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু করার পরও সরকারি খাতের লতিফ বাওয়ানী জুটমিল লোকসানের মুখে পড়েনি। এ কারণে বিএনপি আমলে পাটকলটি বিক্রি করার তালিকায় রাখা হলে এর শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তারা মিলে সেটি কিনে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন সরকার বিক্রির তালিকা থেকে পাটকলটির নাম বাদ দিয়ে দেয়।খুলনা অঞ্চলের বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতা দাবি করেন, পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব শ্রমিক-কর্মচারীদের হাতে ছেড়ে দিলেও লোকসান গুনতে হবে না।

পাট খাতে গৃহীত নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সরকারগুলোর উদাসীনতা ও উপেক্ষার ফলে পাট ও পাটশিল্পে দুরবস্থা তৈরি হয়। পাটশিল্প ও বিরাষ্ট্রীয়করণ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ হুবহু মানা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির আলোকে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই বেসরকারীকরণ-প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৮২ সাল থেকে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে পাটকলগুলোর তাঁতের সংখ্যা ২৬ হাজার থেকে নামিয়ে আনা হয় ১৬ হাজারে। এতে মোট উৎপাদন কমে যায়। ২০০২ সালে আদমজী জুটমিল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারখানা বিরাষ্ট্রীয়করণ তথা ব্যক্তি মালিকের কাছে বিক্রি করার পর বিজেএমসির ব্যবস্থাপনায় এসে দাঁড়ায় মাত্র ২৭টি মিল। বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু করার আগে পাটশিল্প বেশ চাঙ্গা ছিল। তখন পাটশিল্প লোকসান দেয়নি, লাভ করেছে।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৭ই মে, ২০১৯ ইং/ রাত ৯:১৮