ব্রেকিং নিউজ
২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং | ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:০৩

সুবীর নন্দী : তোর হইবে মেঘের উপর বাসা…

 

বিশেষ উপাখ্যানঃ স্কুলে পড়ি। বাসার উত্তরে নির্জন মাদ্রাসা মাঠে বিকাল বেলা বন্ধুরা সহ খেলি। ক্লাস নাইনের ছাত্র আমরা কয়েকজন। একই স্কুলে সকলে পড়ি। শীত আসলেই ব্যাডমিন্টন কোর্ট কেটে সমানে ব্যাট চালাই । আমাদের খেলায় ছন্দপতন ঘটত মাঝে মাঝে। মাদ্রাসা মাঠে আমাদের ব্যাডমিন্টন কোর্টের অনতিদূরে বিল্ডিঙের ছাঁয়ায় চার পাঁচজন কলেজ পড়ুয়া বড় ভাই আড্ডা দিত। সবুজ দূর্বাঘাসে মোড়া মাঠে বসে তারা গল্প করত, আর মাঝে মাঝেই গলা ছেড়ে গান ধরত। বড় ভাইদের মধ্যে একজন মাহবুব ভাই। খুবই ভরাট ও ক্ল্যাসিক্যাল গলা। উনি গান ধরলেই আমাদের ব্যাট থেমে যেত।

বুকের মাঝে সেই সুর, সেই কথা দমকা হওয়ার মত ধাক্কা মারত। দিগন্ত জোড়া প্রকৃতির মাঝে গোধূলী বেলায় মাহবুব ভাই যখন গলা ছেড়ে গান ধরত, ”সে কথা নয়নে আগুন আল্পনা আঁকে, স্মৃতির পাপিয়া চোখ গেল বলে ডাকে”। আহা কি অপূর্বই না গান। চোখ বন্ধ করে মাহবুব ভাই যখন সুরের টান দিত, ”মন পাখি তুই থাকরে খাঁচায় বন্দি, আমিতো করেছি দুঃখের সঙ্গে সঙ্গী”।

কার গান? কে এই গান গেয়েছে ? কোন শিল্পী। হ্যা পরিচিত গলা, রেডিওতে গানের ডালি বা অনুরোধের আসরে এই শিল্পীর গান অনেক শুনেছি। এই গান গেয়েছেন সুবীর নন্দী। মাহবুব ভাই কেন এই শিল্পীর গান গায় ? এই কথা জানতে চেয়ে অবাক হলাম। মাহবুব ভাই বললেন, বাংলাদেশে এই একজন শিল্পী আছেন যিনি একই সময়ে হৃদয় মন ও রক্তে সুর মিশিয়ে দিতে পারেন। যার গলার স্পেশালিটি আছে। যুগে যুগে সুবীর নন্দী একটাই জন্মায়। হাজারটা নয়।

১৯৮৪ সালে কলেজে পদার্পন করেছি। সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবিরের মহানায়ক মুক্তি পেয়েছে। এই ছবিতে একচেটিয়া গান করে সুবীর নন্দী দেশ কাঁপিয়ে দিলেন। সারাদেশেই, সকল গান প্রেমীদের মুখে মুখে তাঁর গান, পথে ঘাটে মাঠে সব মানুষ গায়, হাজার মনের কাছে, প্রশ্ন রেখে, একটি কথাই শুধু জেনেছি আমি, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই। এই মহানায়ক ছবির সব গানই শুধু গানপ্রেমী নয়, নিষ্ঠুর হৃদয়ে সুরের প্রস্রবণ তৈরী করতে পেরেছে। আমার এ দুটি চোখ পাথরত নয়, তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়।

শরৎচন্দ্রের দেবদাস জীবন্ত হিসাবে আবির্ভুত হল এই দেশে। সুবীরের গলায় ভেসে আসল, ”বল কেবা শুনেছে, এমন পিরিতি কথা, তিলেক না দরশনে, ব্যাকুল ও দুইজনে, আপনা আপনি পরান বাধা”।

জীবনের প্রথম দেখলাম সুবীর নন্দীকে। আমার স্বপ্নের মহানায়ক, মহাগায়ক। এস এস সি পরীক্ষার পর দ্বিতীয় দফায় ঢাকা আসা। স্কুল জীবনের বন্ধু লিটনের মহাখালীর বাসার উঠেছি। সে আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাদুঘর দেখাতে নিয়ে আসল। জাদুঘর দেখা শেষে শাহবাগ মোড়ে পিজির নিচে স্ন্যাক্স এর দোকান ” কোহিনুর” এ সিঙ্গারা খাচ্ছেন সুবীর নন্দী। লাল টকটকে ফর্সা এই মানুষটিকে আমি দেখছিনা, দেখছি তাঁর গলাটাকে। কি করে সম্ভব এই গলা দিয়ে বের হয়,

আমি পথে পথে ঘুরি আমার নেইত কোন ঠিকানা—-

”আমার মাথায় আছে একটা খেয়াল পোকা,
নেইকো সময়, নেই অসময়,যখন তখন মারে ভীষণ টোকা।
তখন পথিক মন, বাঁধন সাধন
ভালবাসা মায়ার বাঁধন–কিছুই মানেনা, কিছুই মানেনা।

মনটা ভীষণ খারাপ। লম্বা জার্নি করে ভোর বেলা বাসায় ফিরে শুনি সুবীর নন্দী আর নেই। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী মারা গেছেন। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ( ০৭.০৫.২০১৯ ইং) ভোররাত সাড়ে চারটায় তিনি মারা যান বলে সিঙ্গাপুর থেকে নিশ্চিত করেছেন তাঁর মেয়ে ফাল্গুনী নন্দী।

বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর নেওয়ার দুই দিন পর সুবীর নন্দীর শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হলেও এরপর অবনতি হতে থাকে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা চলাকালে পরপর তিনবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও একবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল। এরপরই সব শেষ।

— তোর হইবে মেঘের উপর বাসা, ও আমার ঊড়াল পঙ্খীরে যা যা তুই উড়াল দিয়ে যা। সুবীর নন্দীর প্রানপঙ্খী আজ উড়াল দিয়ে চলে গেছে। এই পাখি এখন না ফেরার দেশের উড়াল পঙ্খী। এই পঙ্খী আজ মেঘের উপর বাসা বেঁধেছে। থাকুক সুবীর নন্দী মেঘের উপরে, পরম শান্তিতে ।

লেখকঃ লুৎফর রহমান, কলামিস্ট, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

 

কিউএনবি/রেশমা/৯ই মে, ২০১৯ ইং/বিকাল ৫:৪৮

 

 

 

↓↓↓ফেসবুক শেয়ার করুন