২১শে জুলাই, ২০১৯ ইং | ৬ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:৩১

আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে : অটিস্টিক যুবক আবিদের যত কথা

 

বিশেষ প্রতিবেদনঃ  গত ২ এপ্রিল ছিল দ্বাদশ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস । অটিজম বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়েছে।

অটিজম শিশুদের বিকাশগত একটি সমস্যা। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা সাধারণত অপরের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না, তারা অতিরিক্ত জেদী হয়ে থাকে এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও গুটিয়ে রাখার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ নেই। তবে, গবেষকরা মনে করেন, জেনেটিক, নন-জেনেটিক ও পরিবেশগত প্রভাব সমন্বিতভাবে অটিজমের জন্য দায়ী। শিশুর বিকাশে প্রাথমিক পর্যায়ে এটি সৃষ্টি হয়। এ পর্যন্ত পরিচর্যাই এর একমাত্র বিকল্প।

অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্কদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে ২ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো: ‘নারী ও বালিকাদের ক্ষমতায়ন, হোক না তারা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন’।

এক সময় অটিজম ছিল একটি অবহেলিত জনস্বাস্থ্য ইস্যু। এ সম্পর্কে সমাজে নেতিবাচক ধারণা ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা ও স্কুল সাইকোলজিস্ট সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নিরলস প্রচেষ্টায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ২০০৭ সালে এ বিষয়ে দেশে কাজ শুরু করেন।

সায়মা সম্প্রতি এ অবহেলিত জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে তাঁর অবদানের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছেন।

বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শিশু অটিজম নামের এই নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত। ইতোমধ্যে এ সম্পর্কে পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজন ও সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসা ও যথার্থ পরিচর্যার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

 

 

অটিস্টিক যুবক আবিদ মুহাম্মদ ইসলাম । ২৯ বছরের এক টগবগে যুবকের গল্প হত ভিন্নরকম। কিন্তু আবিদ মুহাম্মদ ইসলামের সঙ্গে গত ২রা এপ্রিল দ্বাদশ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। আবিদের কথা যেন পৃথিবীর তাবৎ অটিস্টিক মানুষের কথা। আবিদ বাঁচতে চায়। খুব ভালভাবে বাঁচতে চায়। সকলের মত হাসিখুশি ,সুখ, দুঃখ নিয়ে বাকি জীবন পাড়ি দিতে চায়। কিন্তু ভবিষ্যৎ বলে দিবে আবিদ ও আবিদের মত অটিস্টিক মানুষদের কি হতে পারে।

আবিদের মা এর দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে। আবিদ পাশে হুইল চেয়ারে বসে আছে। লম্বা সাড়ে ৫ ফুট দীর্ঘাকার আবিদ জবুথবু হয়ে বসে মা এর কথা শুনছে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় কোথাও ভুলভাল হলে আবিদ সহাস্যে মা’কে সংশোধন করে দিচ্ছে। মা এবং অটিস্টিক যুবক আবিদের কথা যেন এক সাগর দুঃখ কষ্ট, নিদারুন যাতনার কথা।

সুলতানা রেদোয়ানা লিপা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী একজন ছাত্রী । আশির দশকে ক্যাম্পাস মুখরিত করা এই ছাত্রীর পরিবারের ইচ্ছায় বিয়ে হয় লেখাপড়ার মাঝপথে। স্বামী সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ বিমানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৯সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর লিপার কোলজুড়ে আগমন ঘটে আবিদ মুহাম্মদ ইসলামের। জন্ম থেকেই আবিদের শারীরিক ও মানসিক অস্বাভাবিকতা এড়িয়ে যায়না হতভাগ্য পিতামাতার।

সিঙ্গাপুরের মত দেশে জন্ম নেয়া আবিদের চিকিৎসার কোন ত্রুটি হয়না। এরপরেও আরও উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায় তার মা নিয়ে যান আমেরিকায়, সম্পূর্ণ নিজ প্রচেষ্টায়। । সেখানেও আবিদকে সাড়িয়ে তোলার নিদারুন এক যুদ্ধ শুরু করেন সুলতানা রেদোয়ানা লিপা। কিন্তু মানসিক উৎকর্ষতা কিছুটা লাভ করলেও আবিদের স্থায়ী অবস্থান হয় হুইল চেয়ারে। আবিদের জীবন এখন হুইল চেয়ারের দুই চাকা ঠেলে পার করার এক নিরন্তর সংগ্রাম যেন।

আবিদের মা লিপা বলেন, পৃথিবীর সকল প্রতিবন্ধী শিশু কিশোর যুবক যুবতীরা আমার সন্তানতুল্য। এই ২৯ বছর আবিদকে নিয়ে আমার যুদ্ধ আমি থামাতে চাইনা। আমি বাংলাদেশের অটিস্টিকদের জন্যে কাজ করে যেতে চাই। দেশ বিদেশে আমার সমগ্র কষ্টের অর্জিত অভিজ্ঞতা এদেশের অটিস্টিকদের জন্যে কাজে লাগাতে চাই।

 

কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, অটিস্টিকদের নিয়ে কাজ করছেন যশোরে এঞ্জেলা গোমেজ। গাজীপুরে তাঁর বার বিঘা জমি অটিস্টিকদের পুনর্বাসন সেন্টারের জন্যে দান করতে চেয়েছেন। এখানে আবিদের মত মানুষদের জন্যে আমি বাকি জীবন উৎস্বর্গ করতে চাই সেখানে। এজন্যে সরকার সহ সকলের সার্বিক সহানুভূতি কামনা করেছেন সুলতানা রেদোয়ানা লিপা ।

উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের পাঁচতলায় বন্দি আবিদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় তার বেঁচে থাকার আকুতি এবং তার মায়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এ মুহূর্তে দরকার সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহানুভূতি সহ সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ।

 

কিউএনবি/রেশমা/১৬ই  এপ্রিল, ২০১৯ ইং/রাত ১:৩১