২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | সকাল ১০:০২

পীর হাবিবের ”প্রাণহীন গুমোট হাওয়া”এবং খাঁজকাটা কুমিরের গল্প

 

 

রাতে অফিস থেকে বাসা ফিরছি পায়ে হেঁটে। বেশি না,বড়জোড় এক কিলোমিটারের দূরত্ব হবে। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে ছন্দপতন ঘটে স্মার্টফোনে মেসেঞ্জারের টুংটাং নোটিফিকেশনে। একটু অবাক হলাম প্রখ্যাত সাংবাদিক,কলামিস্ট পীর হাবিবুর রহমানের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দেখে। অবাক হওয়ার কারণ উনি আগে থেকেই আমার ফ্রেন্ডলিস্টে ছিলেন। আবার কেন রিকুয়েস্ট ? আইডি টা চেক করে দেখলাম, নাহ ঠিক আছে। পীর হাবিবেরই আইডি। হয়ত কোন কারণ বশতঃ আনফ্রেন্ড হয়ে গিয়েছিলাম। রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করে উনার টাইমলাইনের সর্বশেষ পোস্টটি দেখে আগ্রহ বেড়ে গেল। যদিও সাম্প্রতিক বাস্তবতা আড়াল করার কথনে পীর হাবিবের টকশো অথবা কলাম আমাকে আর আকর্ষিত করেনা। একদা নিয়মিত তাঁর লেখা পড়তাম। সংবাদ বিশ্লেষণমূলক টকশো আগ্রহ ভরে দেখতাম, শুনতাম।

পীর হাবিবুর রহমান নিঃসন্দেহে প্রথম শ্রেণীর একজন সাংবাদিক। দেশ বিদেশে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি আছে। ৭/৮ বছর আগে বাংলাদেশ প্রতিদিন এর জন্মানুষ্ঠানে স্বল্প সময়ের জন্যে কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। আমাকে মনে রাখার কোন কারণ নেই তাঁর। তবে আমি তাঁর লেখা পড়তাম।

”প্রাণহীন গুমোট হাওয়া বইছে” শিরোনামে বাংলাদেশ প্রতিদিন এ প্রকাশিত লেখাটি রাস্তায় চলতি পথে দেখে নিলাম মাত্র। বাসায় যেয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়ব। এরই মধ্যে পাশ দিয়ে দুজন যাচ্ছেন, টিভি স্ক্রলে দেখা নুসরাতের মৃত্য সংবাদ তাদের আলোচ্য বিষয়। এই মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদ শুনে খুব কষ্ট পাচ্ছি, শুধু আমি নই, পৃথিবীর তাবৎ যেকোন নিষ্ঠুর হৃদয়েও নুসরাতের ঘটনা অতঃপর দুৰ্ভাগ্যজনক নিষ্ঠুর নির্মম মৃত্যু শূন্যতা ও হাহাকার তৈরী করবে।

ভেজা মন নিয়ে বাসায় এসে রাতের খাবার শেষে আবার পীর হাবিবের কলামটা বার কয়েক পড়লাম। তাঁর লেখা, তাঁর উপস্থাপনা বরাবরই নান্দনিক, সুখপাঠ্য। তিনি শুরুটা যেভাবে লিখেছেন তা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ ও সত্য কথন।

”রাজনীতি ও সমাজজীবনেও কি এক অস্থিরতা! কখনোসখনো মনে হয়, প্রাণহীন সমাজজীবনে গুমোট হাওয়া বইছে; যেন কোনো অজানা ঝড়ের পূর্বাভাস লক্ষ্য করছেন অনেকে। এক ধরনের প্রাণহীনতা বিরাজ করছে সমাজজুড়ে। রাজনীতি নিস্তরঙ্গ হয়ে গেছে। সমাজকে এখন আর জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ বলা যাবে না। বুকে পাথর, গলায় ফাঁস, হাত বাঁধা কেউ কেউ অনুভব করছেন। হাত-পা ছুড়ে তাই প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছেন। না হয় অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে শানিত ভাষায় লিখতে ভয় পাচ্ছেন। কণ্ঠ ছেড়ে কথা বলছেন না। চারদিকে সত্যবাবুকে মেরে মিথ্যার জয়গান চলছে”।

পীর হাবিবের এই কয়েক লাইন পড়ে খুব সাহসী লেখনীর আভাস পাচ্ছিলাম। দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁর কলাম না পড়া, টকশো না দেখার একটা মনস্তাত্বিক অপরাধবোধ হালকাভাবে হলেও অনুভূত হচ্ছিল। কিন্তু লেখার মাঝামাঝিতে প্রচুর স্তুতিবাক্যে আবারো আমি বিভ্রান্ত হলাম। পুরো লেখাটার আমেজটাই যেন হারিয়ে ফেললাম। শেষের দিকে, উপসংহারে, তাঁর বক্তব্যে, গুমোট হাওয়া থেকে বের হয়ে আসার কোন সঠিক দিকনির্দেশনা খুঁজে পেলামনা। প্রকৃত সমাধানের বক্তব্য তাঁর কলম নিংড়ে যদিয়বা বের হয়ে আসত, বর্তমান বাস্তবতায় তা প্রকাশের হিম্মত হয়ত কোন সংবাদ মাধ্যমের নেই। পীর হাবিবের ভাষায় ” চারদিকে সত্যবাবুকে মেরে মিথ্যার জয়গান চলছে” কথাটাকেই আমার মূল সারাংশ মনে হয়েছে।

ছোটবেলায় শোনা ”খাঁজকাটা কুমিরের গল্প”টা হয়ত অনেকেই শুনে থাকবেন। আজ আমার সেই গল্প খুব মনে পড়ছে। স্কুলের চরম দুষ্ট ছাত্রটিকে সাইজ করার জন্যে চালাক শিক্ষক কিভাবে নাস্তানাবুদ হলেন, সেই কথাই বলছি। কুমির নিয়ে শিক্ষক রচনা লিখতে দিয়েছেন। ক্লাসের চিহ্নিত দুষ্ট ছেলেটি ক্লাস পরীক্ষার খাতায় ২/৪ লাইন কুমির সম্পর্কে লিখল। কুমির একটি উভচর প্রাণী। জলে স্থলে কুমির অবাধে চলাফেরা করতে পারে। কুমিরের চারটি পা, দুটি চোখ ..ইত্যাদি আছে ….আর আছে একটি বিশাল লম্বা লেজ। কুমিরের লেজটি খাঁজকাটা, খাঁজকাটা, খাঁজকাটা, —-ছাত্রটির পুরো খাতার সমস্ত পাতা জুড়ে খাঁজকাটা, খাঁজকাটা, খাঁজকাটা লেখা। শিক্ষক পরীক্ষা শেষে দুষ্ট ছাত্রের খাতা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, কুমিরের রচনায তুমি খাঁজকাটা লিখে খাতা ভরে ফেলেছ, এর মানে কি ? ছাত্রটি বলল, স্যার আমিতো পুরো খাঁজকাটা লিখতেই পারিনি। কুমিরের লেজে এত খাঁজকাটা আছে, আরো ডাবল কাগজ আর সময় দিলেও আমি লিখে শেষ করতে পারতাম না .শিক্ষক বুঝলেন, এই ব্যাটা টাউট আছে ,একে ছাড়া যাবেনা। শিক্ষক বললেন যে কোন একটা রচনা পুরো লিখে দিয়েই তোমাকে যেতে হবে। তার আগে তোমার ছুটি নেই। এবারে তুমি লিখবে ”গরু” নিয়ে রচনা।

ছাত্রটি যথারীতি গরু নিয়ে রচনা লেখা শুরু করল। গরু একটি চতুস্পদী গৃহপালিত প্রাণী। গরুর দুটি কান, দুটি চোখ দুটি শিং ইত্যাদি ইত্যাদি আছে। গরু মাঠে ঘাস খায়, পিপাসা লাগলে নদীতে পানি খেতে খায়। নদীতে পানি খাওয়ার সময় হটাৎ করে কখনো কখনো কুমির গরুকে আক্রমণ করে. কামড় দিয়ে নিয়ে যায়। তারপরে ছেলেটি গরু রচনা ভুলে কুমির নিয়ে আবারো লেখা শুরু করল। অতঃপর কুমিরের একটি বিশাল লম্বা লেজ আছে, লেজটিতে খাঁজকাটা, খাঁজকাটা, খাঁজকাটা,খাঁজকাটা।

শিক্ষক আবারো ছাত্রের খাতা দেখে রেগে আগুন। এবারে তিনি কঠিন একটি রচনা দিলেন। এবারের রচনা ”নৌকা” নিয়ে । ছেলেটি রচনা লিখছে, নৌকা নিয়ে। শিক্ষক মনে মনে বলছে, ব্যাটা এবার যাবি কোথায় ? আমার সঙ্গে টাউটামো ? পিওর কাঠের আইটেম দিয়েছি, দেখি কোথায় পাস কুমির আর কোথায় লিখিস খাঁজকাটা, খাঁজকাটা?

ছাত্রের রচনা লেখা শেষ। শিক্ষক আগ্রহ ভরে তৃতীয় ও শেষবারের মত খাতা দেখলেন । আস্তে আস্তে শিক্ষকের মুখের চেহারা বিবর্ণ হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হল। রাগ নয়, এবার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা শিক্ষকের। তিনি ছাত্রটিকে আদুরে গলায় ডেকে বললেন, বাবা কাঠের তৈরী নৌকার রচনা লিখতে দিলাম আর সেখানেও কুমিরের খাঁজকাটা লেজ? ছাত্রটি হেসে শিক্ষককে জবাব দিল, স্যার যে কি কন ? ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি খালি নৌকা ডুবে, নৌকার মানুষগুলো নদীতে ভেসে যায়, কেউ কেউ মরে যায়। মরা মানুষ গুলোকেতো স্যার কুমিরেই খেয়ে ফেলে। আর কুমিরের লেজতো খাঁজকাটা, খাঁজকাটা, খাঁজকাটা———.এই নৌকা রচনায় যত খাঁজকাটা লেখা আসবে, অন্য কোন রচনায় এত খাঁজকাটা আসবেনা স্যার। কত নৌকা ডুবিতে এদেশের মানুষ মরছে হিসাব আছে স্যার?

পাদটীকাঃ আমরা কি সকলই এই খাঁজকাটা গল্পে বন্দি হয়ে আছি ? আমাদের সকলের নিরন্তর প্রচেষ্টা হওয়া উচিত খাঁজকাটা গল্পের ফাদঁ থেকে বের হয়ে আসা। পীর হাবিবুর রহমান চমৎকার একজন লেখক। অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই লেখাতে তিনি অনেক সত্যতা উপস্থাপন করতে পেরেছেন।বাংলাদেশে এখন অসংখ্য সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী আজ খাঁজকাটা গল্পের মত বন্দী হয়ে আছে। জাতির বিবেক খ্যাত এই সকল মানুষ আজ পীর হাবিবের ভাষায় ” চারদিকে সত্যবাবুকে মেরে মিথ্যার জয়গান চলছে” বিষয়টি মেনে নিয়ে ছাপোষা যাপিত জীবনে বন্দী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ”প্রাণহীন গুমোট হাওয়া” থেকে তিন বের হতে চান, আমরা সকলই হতে চাই।

পুনশচঃ নুসরাত আজ মরে গেল।আল্লাহ নুসরাতের আত্মাকে শান্তি দিক। অপরাধীদের দেয়া হোক নজিরবিহীন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

১১.০৪.২০১৯ ইং রাত ১.৫০

লেখকঃ লুৎফর রহমান, কলামিস্ট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

 

↓↓↓ফেসবুক শেয়ার করুন