২১শে মার্চ, ২০১৯ ইং | ৭ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ১০:০৯

কনস্টেবল থেকে পুলিশের উপ-পরিদর্শক উলিপুরে এসআইয়ের দাপটে অস্থির নিরীহ মানুষজন

 

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : জেলার উলিপুর উপজেলায় চাকুরীজীবি একটি পরিবারকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশি তদন্তে বার বার ঘটনা মিথ্যা প্রমানিত হলেও নতুন করে মোটরসাইকেল চুরির একটি মিথ্যা মামলায় ঐ পরিবারটিকে ফাঁসানোর ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। জামিন শুনানীকালে আদালতের বিজ্ঞ বিচারক তদন্তকারী ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রকাশ্য ভৎসনা করেছেন। এদিকে বিপর্যস্ত পরিবারটি পুলিশি হয়রানির প্রতিকার চেয়ে, পুলিশ মহা পরিদর্শক বরাবর আবেদন করলে ঐ অভিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা এস,আই সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

মামলার কাল্পনিক আসামী আব্দুল ওয়াদুদ অভিযোগ করে বলেন, আমার ঢাকা ও দিনাজপুরে চাকুরীরত ৩ প্রকৌশলী পুত্র ও পূত্রবধুদের জড়িয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের ধরে আমার আপন ভাই আব্দুর রশিদ, আব্দুস ছালাম, আব্দুল মাজেদ ও ভাতিজা সোহরাব হোসেন মুকুল একের পর এক চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মিথ্যা মামলা উলিপুর থানায় রুজু করাতে থাকেন। এসব মামলার মধ্যে, ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর একটি ও ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল একটি মামলা তদন্তে মিথ্যা প্রমানীত হওয়ায়, তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। আর একটি মামলা আদালত সরাসরি খারিজ করে দেন। এসব ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে তার ছোট ভাই আব্দুল মাজেদ, অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি উল্লেখ করে গত ১১ আগষ্ট উলিপুর থানায় মোটর সাইকেল চুরির একটি মামলা দায়ের করেন।

ওয়াদুদ আলী জানান, মোটরসাইকেল চুরির মামলাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এস,আই সাইফুল ইসলাম বলেন তাকে মোটা অংকের টাকা না দিলে চার্জসিটে তাদের নাম ঢুকিয়ে দেয়া হবে। এমনকি সন্দেহভাজন আসামী হিসেবে তাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনেরও হুমকি দেন। এ পরিস্থিতিতে পুলিশী হয়রাণীর প্রতিকার চেয়ে পরিবারটি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বর্তমান থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর আবেদন করলেও এস,আই সাইফুল গত ১০ অক্টোবর ২০১৮ সালে, ৫৯ বছর বয়সের অসুস্থ্য ওয়াদুদকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। ঐদিন রাত ৩ টার দিকে এস,আই সাইফুল ইসলাম তাকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন এর কক্ষে নিয়ে এসে মামলার বাদি আব্দুল মাজেদ, ভাতিজা সোহ্রাব হোসেন মুকুলে উপস্থিতিতে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিলে মোটরসাইকেল চুরির মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব দেন। দীর্ঘক্ষণ দর কষাকষির এক পর্যায়ে এস,আই সাইফুল বলে উঠেন, ‘আপনি তো চোর না।

ভাইদের সাথে মীমাংসা হন, আর আপনারা চার ভাই ১৫ হাজার করে ৬০ হাজার টাকা মিল করে দেন, মামলা শেষ।’ এতে ওয়াদুদ রাজি না হলে, পরদিন তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। এদিকে মামলাটির নির্ধারিত শুনানীর দিনে, এস,আই সাইফুল ইসলাম জিজ্ঞাবাদের নামে বৃদ্ধ ওয়াদুদকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। কুড়িগ্রাম চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট হাসান মাহমুদুল ইসলাম দীর্ঘ শুনানী শেষে রিমান্ড না-মন্জুর করে অসুস্থ্য ওয়াদুদের জামিন মন্জুর করেন। এসময় আদালত ‘মামলার বাদী মাজেদের ইতোপূর্বে ওয়াদুুদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করার বিষয়টি আদেশে উল্লেখ করে এস,আই সাইফুল ইসলামকে প্রকাশ্য আদালতে ভৎসনা করেন এবং রিমান্ডের আবেদনটি তার দিকে ছুড়ে মারেন।

এ ঘটনার পর এস,আই সাইফুল ওয়াদুদের উপর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে পরিকল্পনা মাফিক ওয়াদুদের জামিন বাতিলের জন্য থানায় গোপনে তিনটি ভূয়া ডায়রী লিপিবব্ধ করেন। এমনকি ওয়াদুদকে সহযোগিতা করার অপরাধে পৌরসভার নারিকেল বাড়ি গ্রামের বেয়াই আব্দুস ছালামের বাড়িতেও পুলিশি অভিযানের নামে বাড়ির গেট ভাংচুর করে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিতর্কিত এস,আই সাইফুলের বিরুদ্ধে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ঐ বির্তকিত এস,আই সাইফুল ৬ বছরের অধিক সময় ধরে এ থানায় কর্মরত আছেন। কন্সটেবল থেকে এ,এস,আই, আবার এস,আই পদে পদোন্নতি পেয়ে এ থানাতেই থেকে যান। অভিযোগ রয়েছে, ইতোমধ্যে তিনি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের কাছ থেকে একটি মাইক্রোবাস কিনে ভাড়ায় খাটাচ্ছেন। যার নম্বর রংপুর-ছ-১১-০০৬৯।

এছাড়াও উপজেলার কামালখামার গ্রামের শাহ্ আলমের স্ত্রী ফেরেজা বেগমকে একটি শিশু অপরহরণ মামলায় জড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ১০ হাজার টাকা আদায় করেন। উপজেলার বামনাছড়া গ্রামের আলহাজ্ব আতাউর রহমান মঞ্জু অভিযোগ করেন, গত ২৩ জানুয়ারী উলিপুর-বজরা সড়কের পাশে তার নিজের জমির গাছ কাটার সময় ওই এস,আই পিকআপ ভ্যানসহ সেখানে হাজির হয়ে হুমকি-ধামকি দিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন। মঞ্জু হাজি ঘটনাটি তাৎক্ষনিক পুলিশের এআইজি পদে ঢাকায় কর্মরত তার ভাগ্নে কামরুল আহসান মৃদুলকে জানালে তিনি জেলার উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। এরই প্রেক্ষিতে এস,আই সাইফুলকে ওই রাতে তাৎক্ষনিক পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়।

এদিকে, পুলিশের মহা-পরিদর্শক এর নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুলিশ সুপার পদে পদন্নোতি প্রাপ্ত) মিনহাজুল আলম বিষয়টি তদন্ত শুরু করেন। গত ১৬ ও ২৭ জানুয়ারী অভিযোগকারী ওয়াদুদ ও তার প্রকৌশলী পুত্রদের তদন্তকারী কর্মকর্তার কার্যালয়ে স্বশরীরে ডেকে নিয়ে স্ববিস্তার ঘটনার বর্নণা শোনেন বলে তারা সাংবাদিকদের জানান এবং বলেন একজন এস,আইয়ের এমন বেপরোয়া আচরণে পুলিশের ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এ ব্যাপারে এস,আই সাইফুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, আমার তো বদলী হয়েছে এখন আর কি হবে।

আমি এখন ডিসি প্রশিক্ষনে টাঙ্গাইলে আছি। ওয়াদুদকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও চাপ দিয়ে অর্থ আদায়ের বিষয়টি নিয়ে কথা হয় থানার অফিসার ইনচার্জ মোয়াজ্জেম হোসেনের সাথে। তিনি গভীর রাতে তার কক্ষে, হাজত থেকে ওয়াদুদকে ডেকে নিয়ে অর্থের জন্য চাপ দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজুল আলম সাংবাদিককে জানান, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে উভয় পক্ষের স্বাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে এবং তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।

 

 

কিউএনবি/আয়শা/৫ই মার্চ, ২০১৯ ইং /বিকাল ৪:৫২