২২শে এপ্রিল, ২০১৯ ইং | ৯ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | রাত ৪:৪৫

পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতা : মানুষ তোমার দিকে

 

সাহিত্য ডেস্ক :    বৃক্ষ নয় বটবৃক্ষ

 

বটবৃক্ষ কাঠগড়ায়, লঙ্কাবৃক্ষ দেবে রায়

কেন সে বৃক্ষ হাজির করা চাই তথ্য ও প্রমাণ

দূর্বাদল বলে জুড়ে করতালি ‘এ তো আদতে বৃক্ষই নয়

ডালপালা মেলে শেকড় ছড়িয়ে বৃক্ষ হওয়ার করছে ভান’

.

ডাঁটাগাছ বলে ঠা ঠা পড়া স্বরে- বললেই হলো

বৃক্ষ হতে হলে সাধনা করা চাই ক্ষেতে খামারে

ধানের মান নিয়ে একবার উদাম জমির গতর খোলো

বৃক্ষ কাকে বলে শিখে নাও দেখে আমারে।

.

লেবুগাছ বলে ভেঁপু বাজিয়ে- বড় আজব কথা

বটের কি ফল হয়, কতটা কাঁটা তার গজায় গতরে

বিজ্ঞ কদলী এতক্ষণে বলে ভেঙে নীরবতা

‘আমার নরম শরীর তবু ফল দিই শত শতরে’

.

সব শুনে বিজ্ঞ কদলী বলে তালপড়া স্বরে-

বটকে যে বৃক্ষ বলে তার কান মলা দাও আচ্ছা করে।

.

.

আমার বাবার পাথর

.

আমার বাবা উচ্চমূল্যে এক মামুলি পাথর কিনেছিলেন

কোনো এক সাধুপুরুষ তাঁকে বলেছিলেন-

‘প্রথম পুত্রের জন্মলগ্নে এই পাথর সোনা হয়ে ফলবে।’

আমার জন্মের পর বাবা সাদাকাগজে মোড়ানো

সেই অদ্ভুত পাথর তীক্ষ্ণ চোখে নেড়ে চেড়ে দেখলেন

সত্যিই সোনা হলো কিনা সেই নিরেট পাথর

কপালের ভাঁজে তার জেগে ওঠে সন্দেহসর্প

তবু বুকের গভীরে তার অগাধ বিশ্বাস

নিশ্চয়ই একদিন হলুদাভ সোনা হবে সেই জমকালো পাথর।

তারপর সাদা-কালো কত জন্মতিথি বয়ে গেল

তবু কাক্সিক্ষত সোনারঙ ফলেনি সেই পাথরের গায়ে

অথচ বুকে রোয়া বিশ্বাসের এক সম্ভাব্য বৃক্ষ ছুঁয়ে

তিনি একদিন অতিলৌকিক পাখি হয়ে গেলেন

.

এখনো প্রতিটি জন্মক্ষণে আমি খুলে দেখি

বাবার তীব্র আকাক্সক্ষাঠাসা সেই জংধরা পাথর

নিশ্চয়ই একদিন অচল পাথর আপাদমস্তক স্বর্ণ হবে …

.

.

শরীরই সাগর

.

শরীরই সাগর-

অমাময় জলের তোড়ে

জীবনের সব রন্ধ্রজুড়ে

তেড়ে আসে কত ক্ষুধানীল হাঙর

.

দ্রষ্টা পাহাড়-

শরীরজুড়ে তার অযুত চোখ

সব চোখে তার আদিম ভুখ

মাটি থেকে আকাশ অবধি

জগতের নীল নীল জলধি

চেতনায় তার সবই খাবার …

.

.

পথ

.

সরে যাচ্ছো ক্রমশ নিমগ্ন এক রক্তলাল পথের দিকে

বহুপথ তোমার সম্মুখে জেগেছে সহসা

সাবলীল ধাঁধার ভঙ্গিমায়

প্রতিটি পথের বাঁকেই লেখা- ‘এদিকেই হেঁটে গেছে কাহ্নপা

আমাকে মাড়ালেই জেগে ওঠে বৃন্দার ছায়াতরু

জেগে ওঠে বুদ্ধময় বোধিবৃক্ষ

কান্তিময় আমার শেষপ্রান্তেই ঘুমায়

নূরপাহাড়ের হেরাগুহা’

রূপদগ্ধ গন্তব্যভোলা তোমার পদদ্বয়

প্রশস্ত এক কাঁটাবন অভিমুখী

যতদূর পাড়ি দাও ততদূর আজ রক্তনদীর অববাহিকা

তোমার পদচিহ্নে রচিত বাল্মীকির আদি আর্র্তনাদভরা

শোকাতুর নীল মহাকাব্য।

.

.

মানুষ তোমার দিকে

.

মানুষ তোমার দিকে বাড়িয়েছি হাত

গোলাপ হত্যার পাপে কলুষিত নয়

এ হাতের একটি আঙুল

নিহত কোনো ভ্রূণের জন্মে

এ হাতের কারসাজি ছিল না কস্মিনকালে

ঘৃণার মন্ত্রসিদ্ধ ছোরায় ধার দিতে দিতে

ধেয়ে যায়নি এ হাত

অপাপবিদ্ধ বৃক্ষের দিকে

ভালোবাসার লবঙ্গ ছুঁয়ে

মানুষ তোমার দিকে বাড়িয়েছি হাত

এ হাতে রাখলে হাত

সমূহ রক্তের দাগ মুছে যাবে নিমিষেই

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা সহসা থেমে যাবে

একটিবার এ হাতে রাখো যদি মায়াময় হাত…

.

.

নিভে যাচ্ছো দৃশ্যতারা

.

বুকের কুসুম থেকে জন্ম নিচ্ছো এতো এতো

বেদনার পাখি, পৃথিবীতে কোথা পাবে এত নীড়?

চেতনা প্রসূণ হতে ঝরে পড়ছো এতো এতো

রক্তরেণু, মৃত্তিকায় জমে গেছে পিপড়ার ভিড়

.

অনুভবের আকাশ থেকে নিভে যাচ্ছো রাশি রাশি

দৃশ্যতারা, অনন্ত কোথায় পাবে ক্ষরণের আলো?

দীপ্ত সূর্য হতে উড়ে যাচ্ছো গোধূলি গোধুম

ময়ূরের পাখা পরে রাত আরও গাঢ় আঠালো

.

নদীর শরীর হতে সরে যাচ্ছো এতো এতো

দূরগামী জল, সমুদ্র কোথায় পাবে এতটা অতল?

বৃক্ষবক্ষ হতে ঝরে যাচ্ছো শত শত পাতার সবুজ

অরণ্যের বুকে ফলে দাহনীল মরুর ফসল…

.

পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতা । কাব্যগ্রন্থ: মানুষ তোমার দিকে । প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ

 

 

কিউএনবি/আয়শা/১৯ই জানুয়ারি, ২০১৯ ইং/বিকাল ৫:৫৫