২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ১১:৩১

সালাম বিনিময়ে সহানুভূতির সৃষ্টি হয়

সালাম’ আরবি শব্দ। অর্থ- শান্তি, আরাম, নিরাপত্তা, আনন্দ। ইসলাম, মুসলমান ও সালাম- এ তিনটি শব্দের মূল ধাতু এক ও অভিন্ন। পরিভাষায় সালাম বলতে বোঝায়, মুসলমানদের পরস্পর সাক্ষাতে অভিবাধন হিসেবে পঠিত বিশেষ দোয়া- আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। অর্থ- আপনার ওপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। এই দোয়া মানবরচিত নয়, বরং আল্লাহপ্রদত্ত। মিরাজের রজনীতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয়তম বন্ধুকে কাছে ডেকে এই শব্দমালা দ্বারা অভিবাধন ও সম্ভাষণ জানিয়েছিলেন।

সালামের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে পারস্পরিক যোগসূত্র হলো, সালামদাতা ও উত্তরদাতা যেন একজন অপরজনের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হলো এবং আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তার দোয়া করল (ফাতহুল বারী : খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ১৩)।
সালামের সূচনা : সালামের সূচনা হয় আমাদের আদিপিতা হজরত আদম আ: থেকেই। যেমন- হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারিম সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা হজরত আদম আ:-কে সৃষ্টি করে বললেন, ‘ফেরেশতামণ্ডলীর একটি দল বসে আছে, তুমি তাদের কাছে যাও এবং তাদের ওপর সালাম পেশ করো। আর তারা তোমার সালামের কী জবাব দেয় তা মন দিয়ে শোনো। কেননা, ওটাই হবে তোমার ও তোমার সন্তানসন্ততির সালাম বিনিময়ের রীতি।’ সুতরাং তিনি (তাদের কাছে গিয়ে) বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’, তাঁরা উত্তরে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ’। তারা ‘ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ শব্দটা বেশি বললেন’ ( বুখারি : খণ্ড ২, পৃষ্ঠা-৯১৯ মুসলিম)।
সালামের গুরুত্ব : ইসলামে সালামের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। হাদিস শরিফে আছে, ‘প্রকৃত মুসলমান সে ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ ইসলাম চায় মানুষ যেন অকপটে একে অপরকে এই নিরাপত্তার ঘোষণা দেয় এবং পরস্পর কল্যাণকামীরূপে সহাবস্থানের আশ্বাস দেয়। তাই ইসলাম সালামের নির্দেশ দিয়েছে। সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে পরস্পর ভালোবাসা, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়। সমাজে শান্তি আসে। অশান্তি দূর হয়। কারো অনিচ্ছাকৃত আচরণে কেউ মনে কষ্ট পেলে সালামের মাধ্যমে তার কষ্ট লাঘব হয়। সহজেই সালামদাতার প্রতি তার মন নরম হয়ে আসে। সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। এটা সালামের মহিমা। সালাম ইসলামের একটি নিদর্শনও বটে।
পবিত্র কুরআনে ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমাদের স্বজনদের সালাম দেবে। এ হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন’ (সূরা নূর : ৬১)। হজরত আবু উমারা বারা ইবনে আজেব রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ্ সা: আমাদের সাতটি আদেশ করেছেন : ১. রোগী দেখতে যাওয়া, ২. জানাজার অনুসরণ করা, ৩. হাঁচির জবাব দেয়া, ৪. দুর্বলকে সাহায্য করা, ৫. নির্যাতিত ব্যক্তির সাহায্য করা, ৬. সালাম প্রচার করা, এবং ৭. শপথকারীর শপথ পালন করা’ ( বুখারি ও মুসলিম)।
আল্লাহ জান্নাতবাসীদের সালাম দ্বারা অভিবাধন জানাবেন, এ দিন জান্নাতিরা আনন্দে মশগুল থাকবে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা উপবিষ্ট থাকবে ছায়াময় পরিবেশে আসনে হেলান দিয়ে। সেখানে তাদের জন্য থাকবে ফলমূল আর যা চাইবে। করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে ‘সালাম’। এ সালাম দুনিয়াতেও উত্তম বাক্য, জান্নাতেও উত্তম বাক্য।
সালামের ফজিলত : ইসলামে সালামের অনেক তাৎপর্য ও ফজিলত রয়েছে। সালাম দেয়া সুন্নত আর সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব। মানে কোনো মুসলমান অপর মুসলমানকে সালাম দিলে এর উত্তর শুনিয়ে দিতে হয়। না দিলে গুনাহ হয়। যে আগে সালাম দেবে তার আমলনামায় নব্বইটি নেকি লেখা হয়, আর যে সালামের জবাব দেবে তার জন্য দশটি নেকি লেখা হয়। হজরত ইমরান ইবনে হোসাইন রা: থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলে কারিম সা:-এর কাছে এসে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’। তখন তিনি বললেন, লোকটির জন্য ১০টি নেকি লেখা হয়েছে। এরপর আরেক ব্যক্তি এসে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’। রাসূলে কারিম সা: তার জবাব দিয়ে বললেন, তার জন্য ২০টি নেকি লেখা হয়েছে। এরপর আরেক ব্যক্তি এসে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’। রাসূলে কারিম সা: তারও জবাব দিয়ে বললেন, লোকটির জন্য ৩০টি নেকি লেখা হয়েছে (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর যতক্ষণ না তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা গড়ে উঠবে ততক্ষণ তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি কাজ বলে দেবো না, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসতে শুরু করবে? (তা হচ্ছে) তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালাম প্রচার করো’ (মুসলিম)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা:কে বলতে শুনেছি, ‘হে লোক সকল! তোমরা সালাম প্রচার কর, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করো, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখো এবং লোকে যখন (রাতে) ঘুমিয়ে থাকে তখন তোমরা নামাজ পড়ো। তাহলে তোমরা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (তিরমিজি)। হজরত আবু উমামা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহর সর্বাধিক নিকটবর্তী মানুষ সেই, যে প্রথম সালাম করে’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)। হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত, ‘যখন কোনো মুসলমান সালাম দেয় এবং অপর মুসলমান উত্তর দেয়, তখন ফেরেশতারা তাদের জন্য সত্তরবার মাগফিরাতের দোয়া করেন’ (এহইয়াউ উলুমিদ্দীন : খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০১১)। রাসূলুল্লাহ সা: কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইসলামে কোন আমলটি সেরা? তিনি বললেন, ‘অন্যকে খাবার খাওয়ানো, পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেয়া’ (আবু দাউদ: ৭০৬)।
যাদেরকে সালাম দেয়া মাকরুহ : এমন জামাতকে সালাম দেয়া মাকরুহ যারা অজু-গোসল করছে, খাচ্ছে, যুদ্ধ করছে, কুরআন তেলাওয়াত বা জিকির করছে, তালবিয়া পাঠ করছে, হাদিস পড়াচ্ছে, ভাষণ দিচ্ছে, ওয়াজ করছে, ওয়াজ-নসিহত বা ভাষণ শুনছে, ফিকহের আলোচনা করছে, পাঠদান করছে, গবেষণা করছে, আজান দিচ্ছে, সালাত আদায় করছে, প্রস্রাব-পায়খানায় লিপ্ত আছে, স্ত্রীর সঙ্গ যাপন করছে, বিচার কাজে লিপ্ত আছে ইত্যাদি। যদি কোনো ব্যক্তি এমন সময় সালাম দেয়, তার সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব নয়।
যে মহিলাদের সঙ্গে বিয়ে হারাম, তাদের মাহরাম বলা হয়। আর যাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ, তাদের গাইরে মাহরাম বলা হয়। মাহরাম সব মহিলাকে সালাম দেয়া সুন্নাত, যেমন নারী নারীকে বা পুরুষ পুরুষকে সালাম দেয়া সুন্নত। গাইরে মাহরাম ছোট বা অশীতিপর বৃদ্ধা হলে সে ক্ষেত্রেও পুরুষরা তাদের সালাম দেয়া সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। পক্ষান্তরে পূর্ণ যুবতী বা যাদের প্রতি যৌন আকর্ষণ তৈরি হয়ে ফেতনা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাদের সালাম দেয়া বা তাদের সালামের জবাব দেয়া মাকরুহ। আর পর্দার আড়াল থেকে সর্বাবস্থায় সালাম দেয়া জায়েজ; কারণ সেখানে ফেতনার আশঙ্কা থাকে না। (সূরাহ নূর : ২৭, মিশকাত : ৩৯৭, ফাতাওয়া শামী ১/৪১৪)।
সালাম দেয়ার নিয়ম : রাসূলে কারিম সা: ছোট-বড় সবাইকে সালাম দিতেন। কখনো তার আগে কেউ সালাম দিতে পারেনি। নবীজীর সাথে দেখা হলে সাহাবায়ে কেরাম রা: নবীজীকে আগে আগে সালাম দেয়ার অনেক চেষ্টা করতেন, তার পরও দেখা যেত নবীজীই আগে সালাম দিয়ে ফেলেছেন। সাহাবায়ে কেরাম পরস্পরের সাথে দেখা হলেই সালাম দিতেন। তাঁরা সদাইপাতির জন্য নয়, শুধু সালাম বিনিময়ের জন্যও বাজারে যেতেন। তাই একজন মুসলমানের সাথে অন্য মুসলমানের সাক্ষাৎ হওয়ামাত্রই সালাম বিনিময় করা। রাসূলে কারিম সা: বলেন, ‘কথাবার্তার আগেই সালাম করবে’। তিনি আরো বলেন, ‘যখন তোমাদের কারো কোনো মুসলিম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয়, তখন সে যেন তাকে সালাম করে। এরপর যদি তাদের উভয়ের মাঝে কোনো বৃক্ষ, প্রাচীর বা পাথরের আড়াল পড়ে। এরপর সাক্ষাৎ হলেও যেন তারা সালাম করে।’ সালামের সবচেয়ে ছোট বাক্য হচ্ছে, ‘আসসালামু আলাইকুম’। বর্ধিত করে, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’। সালামের জবাব শুনিয়ে দেয়া ওয়াজিব। সালামের উত্তরে সালামদাতার বাক্যের চেয়ে বাড়িয়ে বলা উত্তম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন তোমাদের অভিবাদন করা হয় (সালাম দেয়া হয়), তখন তোমরাও তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন কর অথবা এরই অনুরূপ কর।’ (সূরাহ নিসা : ৮৬)।
হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘ছোটরা বড়দের সালাম দেবে, পথচারী বসা ব্যক্তিকে এবং কমসংখ্যক লোক বেশিসংখ্যক লোককে সালাম দেবে।’ (মিশকাত) আরোহী পদচারীকে সালাম দেবে। অন্য ধর্মাবলম্বীকে সালাম দেয়া যাবে না। তবে তারা সালাম দিলে তাদের উত্তরে শুধু ‘ওয়া আলাইকা’ বলতে হবে। অন্য দিকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে অন্য কোনো সম্ভার্ষণ ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সালাম কোনো ফ্যাশনের নাম নয়, এটা আল্লাহ প্রদত্ত দোয়া এবং প্রিয় নবীজীর সুন্নাত। তাই সহি-শুদ্ধ করে সালাম দিতে হবে। অনেকে বিকৃত উচ্চারণে সালাম দেয়। যেমন, স্লামালেকুম, সালামালাইকুম, সামুকুম ইত্যাদি। এমনটি করা মারাত্মক গুনাহ।
সালামের পর একটি আদব হলো মুসাফাহা করা। মুসাফাহা মানে হাত মিলানো। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘এক মুমিনের সাথে আরেক মুমিনের দেখা হলে তারা যদি সালাম বিনিময় করে এবং মুসাফাহা করে, তাহলে তাদের গুনাহ গাছের শুকনো পাতার মতো ঝরে যায়।’
আসুন আমরা রাসূলে কারীম সা:-এর সুন্নাত-আদর্শ অনুসরণ করি। সালামের প্রচলন বাড়াই। পরস্পরে সালাম বিনিময় করে একটি হিংসা-বিভেদ, গর্ব-ঘৃণামুক্ত সমাজ গড়ে তুলি। সর্বোপরি পরস্পরের জন্য দোয়া ও কল্যাণ কামনা করে আমাদের নেকির খাতা সমৃদ্ধ করি।

কুইকনিউজবিডি.কম/টি এন /০৮.০৩.২০১৬