২৪শে মার্চ, ২০১৯ ইং | ১০ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৩:১৬

জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্যতম নির্দশন চারিকাটার ভিত্রিখেল শতনার্থ মন্দির

 

মো. রেজওয়ান করিম সাব্বির, জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি : পাহাড় টিলা ঘোরা সবুজের মধ্যে একটি অপূর্ব স্থানে প্রাচীন ভিত্রিখেল গ্রামে শতনার্থ মন্দিরের অবস্থিত। ভিত্রিখেল গ্রামের পাহাড় কোল ঘোঁষে প্রাচীন আমলে পরস্পর সংলগ্ন দুটি মন্দির দেখা মিলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে মন্দির দুটি শতনার্থ মন্দির নামে পরিচিত। মন্দির দুটির পুরোটাই অক্ষত রয়েছেঅ তবে সেখানে পুজা কিংবা কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। দুটি মন্দিরের মধ্যে খানে আরেকটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। আর সে গুলোর পাশ্বে রয়েছে একটি পুকুর। যে টি সেবায়েত ও পুজারীদের পানি ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।

জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে এপর্যন্ত যে কয়েকটি বই বিভিন্ন লেখক গবেষকেরা প্রকাশ করেছেন তাদের প্রকাশিত গন্থে জৈন্তিয়া রাজ্যের এই পুরার্কীতির কোন ইতিহাস তুলে ধরা হয়নি কিংবা তারা এই পূরার্কীতিটি কখনো তাদের নজরে আসেনি বলে মনে হয়। সম্প্রতি জৈন্তিয়া রাজ্যের অজানা পূরার্কীতির অন্যন্য এই নির্দশনটির কথা উল্লেখ করেন এমফিল গবেষক, ফিল্যান্স সাংবাদিক, লেখক এবং কলামিষ্ট আব্দুল-হাই-আল হাদি প্রকাশিত “সিলেটের পত্নসম্পদ” বইটিতে শতনার্থ মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছেন। মন্দিরের ইতিহাস না পাওয়া গেলেও এই মন্দির নিয়ে একটি লোক কাহিনী রয়েছে তার অন্যতম।

লোক কাহিনী মতে জানাযায়, ১৯৭০ সালে জৈন্তিয়ার দ্বিতীয় রাজা রাম সিংহ এখানে মন্দির দুটি নিজ হাতে নিমার্ণ করেন। চারিকাটা ইউনিয়নের পূর্বভিত্রিখেল গ্রামে। শতনার্থ নামে এক হিন্দু সন্ন্যাসী বসবাস করতেন সেখানে। সে গ্রামের অনতিদুরে ছিল আরেক মুসলিম সুফির বসবাস ছিল। একদিন সন্ধ্যায় হিন্দু সন্ন্যাসী মুসলিম সুফির বাড়ীতে যান এবং সুফিকে বলেন যে, আজ সন্ধ্যায় দুজন রাজার বাড়ীতে যাবেন। মুসলিম সুফি বলেন, সন্ধ্যার সময় পায়ে হেঁঠে রাজার বাড়ীতে যাওয়া সম্ভব নয়। তৎক্ষনিক ভাবে সন্ন্যাসী সুফির জায়নমাজে বসে রাজার বাড়ীতে চলে যান। ঐ দৃশ্য দেখে মুসলিম সুফি অবাক হয়ে যান। সন্নাসী রাজবাড়ীতে উপস্থিত হয়ে রাজ কর্মচারীদের কাছে রাজার সাথে দেখা করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তৎক্ষনাৎ তারা জানান, রাজা মশাই সন্ধ্যা বাতি নিয়ে ব্যস্থ আছেন, তাই উনার (রাজার) সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। একথা শুনে সন্ন্যাসী জানান, আপনাদের কথা টিক নয়, রাজা এখন কোন কোন জায়গায় হাতি রয়েছে তা নিয়ে চিন্তা করছেন।

রাজ কর্মচারিরা অন্দর মহলে গিয়ে রাজা মহাশয়কে কথাটি জানালে তিনি (রাজা) হতবাক হয়ে যান। সত্যিই তিনি সন্ধ্যা বাতির সময় একটি হাতির কথা চিন্তা করেছিলেন। রাজা সন্ন্যাসীকে আপ্যায়নের করানোর আদেশ দেন এবং বলেন যে, একটি কাঠালের মধ্যে যেন সব গুলো কোষ রেখে দেওয়া হয়। এটি সন্ন্যাসী পরীক্ষার জন্য রাজার কৌশল ছিল মাত্র। আপ্যায়নের একপর্যায় সন্ন্যাসী একটি কাঠাল ভাঙ্গেন এবং রাজাকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। সে কাঠাঁলটির মধ্যে কেবল মাত্রকোষ। তা দেখে রাজা অবাক হয়ে যান।

তিনি সন্ন্যাসীকে অনেক আদর আপ্যায়ন করে রাতে খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরদিন রাজা পাথর বোঝাই করে অনেক গুলো হাতিসহ সন্ন্যাসীর বাসস্থানে যান এবং সেখানে একটি মন্দির ও পানি ব্যবহারের জন্য একটি পুকূর খনন করে দেন। পরবর্তী সময়ে রাজা সে সন্ন্যাসীকে রাজদরবার হতে দামী উপহার সামগ্রী পাঠাতেন। সন্ন্যাসী মৃত্যুর পর রাজা সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ব^ তৈরী করেন।

বর্তমানে সেখানে পরপর দুটি মন্দির ঘর ও মন্দির প্রঙ্গনে একটি পুকুর বিদ্যমান রয়েছে। মন্দিরের কিছু অদুরে একজন পুরোহিত বাসবাস করেন। তিনি এই মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে খুব একটা অবহিত নন। তবে তিনি দাবী করেন তারপূর্ব পুরুষেরা প্রজন্মান্তরে মন্দিরের সেবা করে যাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে পুজা অর্চনা তারাই করে থাকেন।

পুরার্কীতি সংস্কার ও সংরক্ষনের অভাবে আমেদের জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্যতম পূরার্কীতি গুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। জৈন্তিয়ার সমৃদ্ধ ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই পুরার্কীতি গুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়নের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করা আবশ্যক ও সময়ের দাবী জানান জৈন্তাপুর উপজেলার সচেতন মহল।

মন্দিরটির অবস্থান যে ভাবে যাবেন, সিলেট দরবস্ত কানাইঘাট সড়কের মধ্যে চতুল বাজারে অবস্থান করে সেখান থেকে সোজা উত্তর দিকে লালাখাল চা বাগানের দিকে যাওয়ার রাস্তা ধরে প্রায় ৫ কিলোমিটার দুরত্বে রাস্তার পশ্চিম দিকে পূর্বভিত্রিখেল গ্রামে শতনার্থ মন্দিরের অবস্থান।

প্রত্নতত্ত্ব সম্পরক জানাতে চাইলে সেভ দ্য হেরিটেজ এন্ড এনভায়রনমেন্টের প্রধান সমন্বয়কারী আব্দুল হাই আল হাদী জানান- প্রত্নতত্ত্ব বাংলাদেশের এক অনুপম সাংস্কৃতিক নিদর্শন। পৃথিবীর যে কয়েকটি স্থান প্রত্নতত্ত্ব জন্য বিখ্যাত, তার মধ্যে জৈন্তাপুর অন্যতম। এগুলোর সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা সত্যিই জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পর্যটন কর্পোরেশনসহ সবাইকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

কিউএনবি/সাজু/১৩ই জানুয়ারি, ২০১৯ ইং/সন্ধ্যা ৬:২০