ব্রেকিং নিউজ
১৭ই জানুয়ারি, ২০১৯ ইং | ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:৩৬

উন্নয়নের অভিযাত্রায় ইসলামের খেদমত

 

ধর্ম ও জীবনঃ  বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটা সময় অতিবাহিত হয়েছিল যে রাজনীতির হীন স্বার্থে সর্বত্র এ প্রচারণা চালানো হয়েছিল—‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ইসলাম ধর্ম থাকবে না।’ এমন প্রচারণাও চালানো হতো—‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি হবে।’ কিন্তু এই অপপ্রচারে সর্বসাধারণ কান দেয়নি। সুদীর্ঘ এক দশক ধরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায়। বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের পাশাপাশি সরকার ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য বহু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও জনগণকে ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে জনগণের নৈতিক মান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতি-২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে এক লাখ ১১ হাজার হজযাত্রীর স্থলে ২০১৮ সালে এক লাখ ২৭ হাজার ব্যক্তিকে হজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

কওমি মাদরাসার দুই হাজার ২০ জন ব্যক্তিকে সরকারিপর্যায়ে আরবি গণশিক্ষা মাদরাসায় প্রথমবারের মতো চাকরি দেওয়া হয়েছে। কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে কওমি আলেম-উলামাদের ইমাম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের ইমাম ও মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে ওই ফান্ডে ২৮ কোটি টাকা জমা করা হয়েছে। ইমাম ও মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে এর সদস্যদের এককালীন সাহায্য ও সুদমুক্ত ঋণদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকার কওমি মাদরাসার সনদপ্রাপ্তদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় (ইসলাম) শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলেম-উলামার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আট হাজার ৭২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ে এক হাজার ২০০ ও উপজেলা পর্যায়ে ৮০০-এর বেশি মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থাসহ প্রতিটি মসজিদ তৈরিতে ১৫ কোটি টাকা খরচ হবে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা। ৪০ শতক জমির ওপর ছয়তলাবিশিষ্ট প্রতিটি ভবন একই মডেলের হবে। তবে উপকূল অঞ্চলের মসজিদগুলো চারতলা ভবনবিশিষ্ট হবে, যার নিচতলা ফাঁকা রাখা হবে। ওই মসজিদ যাতে সাইক্লোন শেল্টার স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সে ধরনের ব্যবস্থা থাকবে। ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ৫৬০টি মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ৯টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ১০০টি মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে শুরু করা হয়। পরবর্তী সময় পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট মসজিদ নির্মাণের কাজ ২০২০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ শেষ হবে। এই মসজিদগুলোতে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা অজু করা ও নামাজ পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। ওই মসজিদে থাকবে গ্রন্থাগার, সম্মেলনকক্ষ, গবেষণাকক্ষ ও শিশু শিক্ষা কার্যক্রম কক্ষ। তা ছাড়া বিদেশি পর্যটকদের পরিদর্শনের ব্যবস্থা, মেহমানদের আবাসন ব্যবস্থা, ইমাম ও হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সুবিধা ওই মডেল মসজিদে থাকবে। এতে সারা দেশে আট হাজারের বেশি আলেম-উলামার কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের মসজিদের ইমামরা মসজিদ কেন্দ্রে শিশু ও বয়স্ক শিক্ষার্থীদের বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, আরবি, নৈতিক ও মূল্যবোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদানের মাধ্যমে দেশে শিক্ষা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট আট বছরে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে ৫৫ লাখ ২০ হাজার, সহজ কোরআন শিক্ষাস্তরে ৩৯ লাখ ২৭ হাজার এবং বয়স্ক শিক্ষাস্তরে এক লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ জনসহ সর্বমোট ৯৬ লাখ ৬০০ জন শিক্ষার্থীকে সাক্ষরতার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। গত ২৮ মার্চ ২০১৭ মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় বরাদ্দ প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি উপজেলায় দুটি করে মোট এক হাজার ১০টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষক হিসেবে পাঁচ হাজার ৫০ জন আলেম-উলামার কর্মসংস্থান হচ্ছে।

২০১০ ও ২০১১ সালে হজ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করে।২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো সরকার কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতিস্বরূপ দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমান মর্যাদা প্রদান করেছে। পাশাপাশি ৭৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ১০০টি বেসরকারি মাদরাসা ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। ২০১০ সালে বর্তমান সরকার মাদরাসা শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের ৮০টি মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু করেছে। সরকার ২০১০ সালের ২০ জানুয়ারি সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা করে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অর্থাৎ যেসব এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, সেসব এলাকার প্রতি উপজেলায় দুটি করে মোট এক হাজার ১০টি দারুল আরকাম এবতেদায়ি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে মাদরাসা শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আইসিটি ও বিজ্ঞান বিষয়। মাদরাসায় আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু, কামিলকে মাস্টার্সের সমমান মর্যাদা প্রদান, যুগোপযোগী নতুন কারিকুলাম প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্মকে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।

দেশের তরুণরা যাতে ইসলামের জ্ঞান নিয়ে নিজেদের জীবন গড়তে পারে, সে উদ্দেশ্যে সরকার ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছে দেশের প্রথম আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। তা ছাড়া ৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনের ডিজিটাল ভার্সনসহ এর ওয়েবসাইট .িয়ঁত্ধহ.মড়া.নফ প্রস্তুত করা হয়েছে।ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৬০ হাজার ৬৪৫টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, দুস্থ ব্যক্তির মধ্যে মোট ৯১ কোটি ৭৫ লাখ ১৪ হাজার ৩০০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আট হাজার ৭০০ ধর্মীয় নেতাকে ধর্মীয় ও নৈতিকতাসহ আর্থ-সামাজিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় ২৬ হাজার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে ৪৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক ও নৈতিকতা শিক্ষা, ১৭ হাজার ৪০০টি কোরআন শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে ৩১ লাখ ২৯ হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীকে পবিত্র কোরআন শিক্ষা এবং ৭৬৮টি বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে এক লাখ ৬৯ হাজার বয়স্ক ব্যক্তিকে সাক্ষরতা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে।ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির মাধ্যমে ২২ হাজার ৬৪৭ জন ইমামকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ১০ হাজার ৭৫৮ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমামদের রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ এবং এক হাজার ১১১ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমামকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ৩২.২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চার হাজার নতুন মসজিদ পাঠাগার স্থাপন এবং দুই হাজার ৫০০ মসজিদ পাঠাগারে পুস্তক সংযোজন করা হয়েছে।

ওয়াকফ অধ্যাদেশ সংশোধন আইন ২০১৩-এর ওয়াকফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে তালিকাভুক্ত ২১ হাজার ৪৭৩টি ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে। ইসলামিক প্রকাশনা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় ৮৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫৩টি পুস্তকের চার লাখ ৮৪ হাজার ২৫০ কপি মুদ্রণ করা হয়েছে।এভাবেই ইসলাম ও মুসলমানদের সার্বিক উন্নয়নকল্পে আওয়ামী লীগ সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র : (১) ‘উন্নয়নের ৯ বছর’, শ্রাবণ প্রকাশনী, শাহবাগ, ঢাকা।

(২) ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের এক দশক’, আইসিএলডিএস ও তথ্য মন্ত্রণালয়।

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/ ৩০.১১.২০১৮/ দুপুর ১২.৫৫