১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | সকাল ৭:২৭

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখনো বিভক্ত বিশ্বসম্প্রদায়

 

ডেস্ক নিউজঃ  রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের উপায় নিয়ে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মতপার্থক্য এক বছরেও বদলায়নি। চীন, রাশিয়াসহ বেশ কিছু দেশ মনে করে, এ সংকট সমাধানের তাগিদ দিয়ে জাতিসংঘে প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির কোনো যুক্তি নেই। তবে পশ্চিমা অনেক দেশই মনে করে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার এযাবৎ যতটা নমনীয় হয়েছে তা আন্তর্জাতিক চাপের কারণেই।২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে মিয়ানমার নিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল ১৩৫-১০ ভোটে। সেদিনের ভোট দেওয়ার যন্ত্রে ‘ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা’র বোতাম চেপেছিল ২৬টি দেশ। এক বছর পর গত শুক্রবার রাতে ওই একই কমিটিতে মিয়ানমার নিয়ে নতুন একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে ১৪২-১০ ভোটে। এদিনও ‘ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা’র বোতাম চেপেছে ২৬টি দেশ।

মিয়ানমার নিয়ে প্রস্তাবে গত বছরের তুলনায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা সাতটি বাড়লেও এবার সদস্য দেশগুলোর ভোটে অংশগ্রহণের হার বেড়েছে। জানা গেছে, ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ভোটে (হ্যাঁ, না বা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকার বোতাম চাপা) অংশ নিয়েছিল ১৭১টি দেশ। গত বৃহস্পতিবার ভোটে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ছিল ১৭৮। এসব দেশের বাইরেও বেশ কিছু দেশ আছে যারা ভোটিং মেশিনে কোনো বোতামই চাপেনি বা তাদের কোনো প্রতিনিধি ভোটের সময় সেখানে উপস্থিত ছিল না।দুই বছরে ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর ভোট দেয়নি কিন্তু এবার দিয়েছে এমন সাতটি দেশের সব ভোট প্রস্তাবের পক্ষে আসেনি। গত শুক্রবার মিয়ানমার নিয়ে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে মিয়ানমার, চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, বুরুন্ডি, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও জিম্বাবুয়ে। বুরুন্ডি গত বছর ভোটিং মেশিনে বোতাম চাপেনি। অন্যদিকে সিরিয়া গত বছর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও গত শুক্রবার ‘ভোট দেওয়া থেকে বিরত’ থাকার বোতাম চেপেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত শুক্রবার রাতে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে ভোটের আগে তৃতীয় কমিটিতে সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই ভোটেও বাংলাদেশ বিরুদ্ধে ভোট না দিয়ে ‘ভোট দেওয়া থেকে বিরত’ থাকার বোতাম চেপেছে।৫৭ দেশের ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে এর সভাপতি হিসেবে এবারের প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপন করেছিল বাংলাদেশ। ওই প্রস্তাবের সমর্থক ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৮টিসহ মোট ১০৩টি দেশ। ভোটের হিসাবে দেখা গেছে, ওআইসির আনা প্রস্তাবে ভোটের সময় ওআইসি সদস্য তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান পক্ষে, বিপক্ষে বা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা—কোনো বোতামই চাপেনি। বলিভিয়া, কিউবা, কঙ্গো, ডমিনিকা, ইরিত্রিয়া, এসওয়াতিনি, গ্রানাডা, নাউরু, সিসিলি ও ত্রিনিদাদ টোবাগোও এমনটি করেছে।

প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ইসরায়েল। সার্ক অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ‘ভোট দেওয়া থেকে বিরত’ থাকার বোতাম চেপেছে ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। জাপানও ‘ভোট দেওয়া থেকে বিরত’ থেকেছে।ভারতের অবস্থান হলো তারা সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের বিষয়ে ও ওআইসির প্রস্তাবকে সাধারণত সমর্থন করে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—দুই দেশেরই সীমান্ত লাগোয়া প্রতিবেশী হিসেবে দেশটি প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো দিকেই অবস্থান নিতে চায় না। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারত এই দুই দেশকেই সহযোগিতা করছে।

ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা অন্য দেশগুলোরও প্রায় অভিন্ন মনোভাব। তবে এমন প্রস্তাবের ঘোর বিরোধী চীন ও রাশিয়া। এই দেশ দুটি মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার বিরোধিতা করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকেই সমস্যা সমাধান করার সুযোগ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, চাপ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও তারা আমলে নিচ্ছে না।তবে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান হলো, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো তাদের ওপর নৃশংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তারা দেশে ফিরতে আগ্রহী হবে না।

এদিকে গত বছরের মতো এবারও মিয়ানমার ইস্যুতে ভোটে আসিয়ান সদস্যরা (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট) নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভোট দিয়েছে। ওই জোটের ১০টি সদস্যের মধ্যে প্রস্তাবের পক্ষে চারটি দেশ (ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া), বিপক্ষে চারটি দেশ (লাওস, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম) এবং দুটি দেশ (সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড) ‘ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা’র বোতাম চেপেছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা হিসেবে আসিয়ানের একটি দলের মিয়ানমার সফরের কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো গত শুক্রবার মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে গৃহীত প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করলেও এটি কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। সাধারণ পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ‘ভেটো’ ক্ষমতা নেই। তাই এ প্রস্তাব গ্রহণ করা গেছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার বাধায় এমন প্রস্তাব গৃহীত হবে না। তাই মিয়ানমার নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনার পরও জাতিসংঘকে ওই দেশটির বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের সম্মতি পেতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গুরুতর অপরাধগুলোর তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নিলেও ভবিষ্যতে মিয়ানমারে বিচার করতে নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনার যে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে তা ভবিষ্যতে আরো বিস্তৃত পরিসরে ও সফলভাবে এগিয়ে নিতেও নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা প্রয়োজন।এদিকে গত শুক্রবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, গত ১৪ মাসে মিয়ানমারে সংঘাতে প্রায় ৬৬৯টি শিশুকে হত্যা এবং ৩৯টি শিশু বিকলাঙ্গ হয়েছে। এর আগেও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা শিশুদের হত্যা, ধর্ষণ ও বিকলাঙ্গ হওয়ার তথ্য জানিয়েছে।

 

 কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/১৮.১১.২০১৮/ সকাল ১০.০৫