২৭শে মে, ২০১৯ ইং | ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | সকাল ৯:১৯

বেদখলে ঢাকার প্রথম পানির ট্যাংক

 

ডেস্ক নিউজঃ  ঢাকা শহরের প্রথম পানি সরবরাহকারী পানির ট্যাংকটি চলে গেছে দখলদারের কবলে। সেখানে এখন চলে নানা অপকর্ম। তার আশপাশের দোকান থেকে তোলা হয় চাঁদা। এ ছাড়া এখানকার লোকদের দ্বারা পরিচালিত হয় ফুটপাতে কাঁচাবাজার। সেখান থেকে ওঠানো হয় মোটা অঙ্কের টাকা। সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের উত্তর দিকে ঢাকা শহরে পানি সরবরাহকারী প্রথম পানির ট্যাংটি অবস্থিত। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে একটি মাজারের সাইনবোর্ড। তিন রুমের একটিতে রাখা হয়েছে একটি খালি চেয়ার। আরেক রুমে চলে গান-বাজনা আর অন্যটিতে থাকার ব্যবস্থা। ভেতরের দেয়ালে লেখা শাখা দায়েরা মূসাবিয়া, কলতাবাজার। ভেতরের অবস্থা এমন হলেও বাইরের অবস্থা একেবারে ভিন্ন। গোলাকার এ ট্যাংকটি ঘিরে এর পূর্ব দিকে আছে হোটেল, উত্তর দিকে আছে লেদের দোকান আর দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে আছে ছোট কয়েকটি দোকান। এসব দোকানে কথা বলে জানা গেছে, দোকানিদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়। তা ছাড়া এখানে যেসব লোক আছে, তারা প্রভাব খাটিয়ে কলতাবাজার লবণের গলিতে বসিয়েছে কাঁচাবাজার। সেখান থেকেও তোলা হয় দোকান ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের চাঁদা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদেরই এক ভাড়াটিয়া দোকারদার বলেন, ‘এই পানির ট্যাংকটি ছিল ওয়াসার; কিন্তু এখন তা ব্যবহৃত হচ্ছে না। এরই সুযোগ নিয়ে কিছু লোক এখানে ব্যবসা খুলেছে। আমাদের কাছ থেকেও প্রতি মাসে টাকা নেয়।’ টাকা দেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে যে বাবা সোহেল ওরফে পাগলা সোহেল আছে, সে খুব সমস্যা করে। তাই দিতে হয়।’ এ বিষয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা কয়েকবার কাউন্সিলরকে জানিয়েছি; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।’ পানির ট্যাংকের পাশে সিটি করপোরেশন মার্কেটের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এখানে নানা প্রকার অপকর্ম হয়। অনেক মহিলাও এখানে আসে। এ ছাড়া এরা যাতায়াতের পথ বন্ধ করে কাঁচাবাজার বসিয়েছে, যা মানুষের ভোগান্তির কারণ।’ কলতাবাজার লবণের গোডাউনের গলিতে যাতায়াতের পথে দেখা যায়, প্রায় ১০টি কাঁচা সবজির দোকান বসেছে। ফলে এই গলিতে সব সময়ই জ্যাম লেগে থাকে। সেখানকার এক কাঁচামাল ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের কয়েকজন দোকানদারকে বাবা সোহেল বসিয়েছে। তাই তাদের প্রতি মাসে ৫০০ করে দিতে হয়।’

এদিকে পানির ট্যাংকের ভেতরে থাকা মোহাম্মদ নবী হক বলেন, ‘এখানে আমরা প্রায় ১০ জন খাদেম থাকি। খাদেমদের প্রধান হলেন মো. সোহেল, যিনি এখানে সপ্তাহে এক দিন আসেন।’ দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদা নেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের খুশি হয়েই তাঁরা এ টাকা দিয়ে থাকেন। আমরা কারো কাছে কোনো দাবি করি না।’ মো. সোহেলের ফোন নাম্বার চাইলে তিনি দিতে অস্বীকার করে বলেন, ‘তিনি ফোন ব্যবহার করেন না।’ জানা গেছে, এই পানির ট্যাংকটি ওয়াসার সম্পত্তি; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই পানির ট্যাংক ব্যবহার করা হয় না। এ সুযোগে স্থানীয় কিছু ছেলে এটি দখলে নেয় এবং এটিকে কেন্দ্র করে চলে চাঁদাবাজি।

স্থানীয় প্রবীণ মো. হায়দার আলী বলেন, ‘এই পানির ট্যাংকটি আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ; কিন্তু এটাকে যেভাবে দখল করা শুরু করেছে, তাতে তো মনে হয় না এটি বেশিদিন টিকে থাকবে। ওয়াসা ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উচিত এটিকে তাদের অধীনে নিয়ে নেওয়া, যাতে এর ইতিহাস সাধারণ মানুষ জানতে পারে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না এটি কী ছিল।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৪২ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার মো. সেলিম বলেন, ‘এই ট্যাংকের মালিক ওয়াসা। তাদের সম্পত্তিতে আমি কী করতে পারি। তা ছাড়া তারা আমার মহল্লার ছেলে। যা করার ওয়াসাকেই করতে হবে। আমি এদের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই।’ তাদের চাঁদাবাজির বিষয়ে জানেন কি না জানতে চাইলে তার সাব জবাব, ‘এসব আমি জানি না।’

বিষয়টি জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসনিক) মো. মাহমুদ হাসান বলেন, ‘আমাদের তালিকাভুক্ত সব সম্পত্তি উদ্ধারের কাজ আমরা শুরু করেছি। যেখানেই এবং যার কাছেই আমাদের সম্পত্তি থাক না কেন, আমরা তা উদ্ধার করব।’ প্রথম পানির ট্যাংকের বর্তমান অবস্থা জানেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা এখনো আমার জানা নেই। তবে এটা যদি অপদখলের শিকার হয়, তাহলে অবশ্যই আমরা এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

ঢাকার প্রথম পানির ট্যাংক নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম পানির ট্যাংকটি আমাদের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নয়। তবে পুরান ঢাকার বেশ কিছু পুরনো বাড়ি, যেগুলোর বয়স শতবর্ষের বেশি, সেগুলো না ভাঙার একটি নির্দেশ দেওয়া আছে। সে ক্ষেত্রে যদি এটি এই ক্যাটাগরিতে পরে তবে এটাও আমরা সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’ খন্দকার মাহমুদুল হাসানের ‘বাংলাদেশের প্রথম ও প্রাচীন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৮৬৪ সালে ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর পৌরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য নবাব পরিবার আর্থিক সহায়তা করে। ফলে ১৮৭৮ সালের ২৪ মে থেকে ঢাকাবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। এই সরবরাহ করার জন্য পানির ট্যাংকটি নির্মিত হয়েছিল। তবে এরও আগে ঢাকা শহরে সাক্কা বা ভিস্তিওয়ালারা গত শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত মশকের সাহায্যে পানি সরবরাহের কাজ করত। সাক্কারা যেখানে বাস করত, তা এখন সিক্কাটুলী নামে পরিচিত।

 

কিউএনবি/অদ্রি আহমেদ/১৫.১১.২০১৮/ দুপুর ১২.২০

Please follow and like us:
0
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial