১৭ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | রাত ৩:০০

কুড়িগ্রামে বন্যার্তদের পাশে প্রতিবন্ধি পল্লী চিকিৎসক

মমিনুল ইসলাম বাবু (কুড়িগ্রাম)থেকেঃ  ‘খাল ফটোক তুলি কী হইবে? বাহে না খায়া আছি, ভোকোত প্যাট শুকি গেইছে! কিছু দেন। হামাক গুলা বাঁচান।’

বানভাসিদের চোখেমুখে এখন একটাই চাওয়া পেটপুরে কিছু খেতে চান তারা। রোববার কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সেনেরখামার স্কুলে আশ্রয় নেয়া ৪১টি পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলে এমন দুর্দশার কথা জানাযায়।

টানা ৮দিন বন্যার সাথে লড়াই করার পর ঘরবাড়ি ছেড়ে সেনের খামার উচ্চ বিদ্যালয় ও সেনের খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়। স্ত্রী সন্তানসহ গবাদিপশু নিয়ে একটু মাথা গোজার জন্য ঠাসাঠাসি করে দিনযাপন করছেন। খোলা মাঠে রেখেছে গবাদিপশু।

প্রথম দিন তাদের এক প্রকার উপোস করে কেটেছে। একই রকম অবস্থা সদরের মোগলবাসা ইউনিয়নের চরভেলাকোপা স্কুল, গড়েরমাঠ, চর সিতাইঝাড় ফ্লাড শেল্টারসহ নয়ারহাট হাইস্কুলের। প্রত্যন্ত এসব আশ্রয়কেন্দ্রে কেউ খোঁজ নিতেও আসে না বলে আশ্রিতদের অভিযোগ।

ফলে তারা খেয়ে না খেয়ে সময় পার করছে। ব্যক্তিগত ভাবে বন্যার্তদের পাশে দাড়িয়ে দাড়িয়েছেন প্রতিবন্ধি পল্লী চিকিৎসক তারিকুল ইসলাম তারেক। তার ব্যতিক্রম এ উদ্যোগ আলো ছড়িছে। মুখে মুখে তার নাম। গত বুধবার থেকে সেনের খামার স্কুলে আশ্রিত দু’শতাধিক মানুষের খাবার যোগান দিয়ে আসছেন তিনি নির্লস ভাবে।

নিজের প্রতিদিনের আয় ও জমানো টাকা থেকে ইতিমধ্যে খরচ করেছেন ৩০ হাজার টাকা। সেই সাথে বন্যার্তদের চিকিৎসা সেবা এবং ঔষধ সরবরাহ করছেন মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ তারিক। তারিক ভালভাবে কা বলতে পারেন না। শারীরিক ভাবেও কিছু প্রতিবন্ধকথা রয়েছে। কোন বাঁধাই তারেককে আটকাতে পারেনি। সরকার কিংবা ধর্ণাঢ্যরা এগিয়ে না এলেও প্রতিবন্ধি তারিক ভানভাসী মানুষের পাশে দাড়িয়ে।

সেনের খামার স্কুলে আশ্রিত আমিনা (৪০) জানান, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এক ছেলেসহ ৩ সন্তানকে নিয়ে তিনি পার্শ্ববর্তী চর কৃঞ্চপুর এলাকায় থাকতেন। ঘরের ভিতর পানি ঢুকে পড়ায় তারা চৌকিতে বাঁশ জোড়া দিয়ে উঁচু মাচা করে আশ্রয় নেন। কিন্তু ছোট সন্তান রাব্বি (৩) পরপর দুদিন চৌকি ডেবে পড়ে গেলে তারা বাড়ী ছেড়ে এই স্কুলে এসে আশ্রয় নেয় গত মঙ্গলবার বিকালে। রাতে উপোস থাকতে হয়।

বুধবার দুপুরে এলাকার তারিক নামে এক ব্যক্তি খাওয়ার ব্যবস্থা করে। চেয়ারম্যান, মেম্বর কিংবা প্রশাসনের কেউ খোঁজ না নিলেও তারিক ব্যক্তিগত ভাবে তিন বেলা খাবারের যোগান দিয়ে আসছে। একই কথা জানালেন আশ্রিত চর কিষ্ণপুর এলাকার জহুরুল হক (৫৫), রহিমা বেগম(৪০)। এসব অসহায় মানুষের কাছে তারিক যেন সাক্ষাত দেবদূত। কৃঞ্চপুর মাঝেরচরের কাজলী বেগম(২২) এক বছরের মেয়ে রাবেয়া ও ৪ বছরের রহিমাকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।

স্বামী রহিম সাধু প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকে দ’ুপা তার কাজ করেনা। হাতকে পা হিসেবে ব্যবহার করে চলাফেরা করেন। গ্রামের লোকজন এই অসহায় পরিবারকে উদ্ধার করেছে। কাজলী বেগম জানান, তার স্বামী ভিক্ষা করে যা পায় তাই দিয়ে চলে চারজনের সংসার।

ভিটেমাটি ছাড়া তাদের আর কিছু নেই। বন্যার সময় গ্রামের লোকজন তার স্বামী রহিম সাধুকে কোলে করে নৌকায় তুলে ডাঙ্গায় ছেড়ে দেন। সারাদিন ভিক্ষা শেষে আবার ঘাটে এলে লোকজন তাকে বাড়িতে পৌছে দেয়। এরকম আরেকজন বিউটি বেওয়া (৩৫)। মিষ্টি (৬), বিজয় (৮) ও বিপুল (১০) নামে তার ৩ সন্তান রয়েছে।

ছোট মেয়ে মিষ্টি পেটে থাকার সময় স্বামী মজনু ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে গিয়ে স্ট্রোক করে মারা যান। তারপর থেকে তিন সন্তানকে নিয়ে তার জীবনযুদ্ধ। চলতি বন্যায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে এক প্রকার অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে হয়েছে তাদের। ঘরের চাল পর্যন্ত পানি ওঠায় তারা বাড়ী ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেন। সরকারি কোন সহায়তা পাননি এ অভিযোগ বিউটির।

স্থানীয় নির্মল কুমার, মুক্তিযোদ্ধা মন্তাজ আলী জানান, প্রথমদিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে বন্যার্তদের। দ্বিতীয়দিন থেকে তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসে তারিকুল ইসলাম তারেক। সেনের খামার স্কুলের পিছনেই তার বাড়ী। স্থানীয় লোকজন তাকে পাগলা ডাক্তার বলে সম্বোধন করে। পেশায় পল্লী চিকিৎসক।

গরীব মানুষের ডাক পেলেই সে রাত-বিরাতে ছুটে যায় তাদের পাশে। বাবা নুরুল ইসলাম কৃঞ্চপুর মৌজা আওয়ামীলীগের সভাপতি। মা তফিরণ নেছা। ১৬ শতক জমিতে পৈত্রিক নিবাস। তিন ভাইয়ের মধ্যে তারিক দ্বিতীয়। অপর দু’ ভাইয়ের আয়ে মুলত তার নিজের সংসার চলে। আর তারিক স্ত্রী, ২ কন্যা সন্তানকে রেখে দিন-রাত সমাজের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছে।

তারিকুল জানান, প্রতিবছর এখানে বন্যার্ত মানুষ আশ্রয় নেয়। ছোট বেলায় অনেক মানুষকে না খেয়ে থাকতে দেখেছি। তাদের কষ্ট আমাতে খুব নাড়া দেয়। আমার চিকিৎসা পেশা থেকে ৭/৮শত টাকা আয় হয়, তা বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করি। এতেই আমার আনন্দ।

মোগলবাসা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান নূর জামাল বাবলু জানান, সেনের খামার ছাড়াও চরের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এই আশ্রয়কেন্দ্রটি মেইনল্যান্ডে হওয়ায় আশপাশের লোকজন সহযোগিতা করছে। তবে দুরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে সরকারি সহযোগিতা ছাড়া বেসরকারীভাবে সহযোগিতা ক নেই।

 

কুইকনিউজবিডি.কম/বিপুল /৩১.০৭.২০১৬/রাত ০৯:৪৫