১৪ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৩:০০

চৌগাছার সেই পল্লবী ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অবশেষে আদালতে মামলা : মামলা তুলতে বাদীকে হুমকি

 

রহিম,চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা : যশোরের চৌগাছার পল্লবী ক্লিনিকে প্রসুতির পেটে গজ-ব্যান্ডেজ (মফ) রেখে সেলাই এবং ভুল চিকিৎসার অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। ১৮/০৯/১৮ তারিখে প্রসুতি তাহমিনা খাতুনের স্বামী আলমগীর হোসেন সিনিয়রজু ডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট চৌগাছা আদালত, যশোরে মামলা করেছেন। আদালতে ৪০৬/ ৪২০/ ৪২৭/ ২৬৯ ধারায় মামলা নং সিআর ২১৪/১৮। মামলায় একমাত্র বিবাদি করা হয়েছে চৌগাছার পল্লবী ক্লিনিকের পরিচালক (মালিক) মিজানুর রহমানকে।

বাদি পক্ষের আইনজীবি অ্যাডভোকেট শাহিনা খানম লিলিম বলেন, আদালতের বিচারক বুলবুল আহমেদ বিষয়টি আমলে নিয়ে আগামী ২৩ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চৌগাছা থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে চৌগাছা থানার ওসি খন্দকার শামীম উদ্দিন বলেন, আদালতের কোন কাগজপত্র আমি এখনো হাতে পাননি।

এদিকে ১৯ ও ২০ সেপ্টম্বর বুধ ও বৃহস্পতিবার ভুক্তভোগী প্রসুতি তাহমিনা খাতুনের স্বামী আলমগীর হোসেন তদন্ত কমিটির নিকট তার ছয় পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য দেন। প্রসুতির ভুল চিকিৎসা দেয়ার অভিযোগ তদন্তে যশোরের সিভিল সার্জনের নির্দেশে এ কমিটি গঠন করা হয়। এসময় তথ্য প্রমাণ হিসেবে প্রসুতির জরায়ু দিয়ে বের হওয়া মফের (গজ-ব্যান্ডেজ) ছবিও গ্রহণ করেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

আলমগীর হোসেন লিখিত বক্তব্যে বলেন, ওই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রোগীর আলট্রসোনো রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশনসহ কোন রিপোর্ট সরবরাহ না করায় সেগুলি তারা তদন্ত কমিটির নিকট দিতে পারেননি। তবে যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে করা একটি আলট্রাসোনো রিপোর্ট এবং সেখানকার প্রেসক্রিপশন জমা দিয়েছেন। লিখিত বক্তব্যে প্রসুতি তাহমিনার স্বামী আলমগীর হোসেন আরো বলেছেন সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেওয়ায় এবং সেই বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে পত্রিকায় সরেজমিন রিপোর্ট হওয়ায় ওই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাদেরকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন।বুধবার স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য চৌগাছা হাসপাতালে আসলেও তাদের বলা হয় তোমরা মিডিয়ার সামনে যা বলেছ সেগুলো মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিবে অন্যথায় তোমাদের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকার মানহানি মামলা করব।

গত ২৪ জুলাই তাহমিনা খাতুনকে (২৫) কে পল্লবী ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। সে উপজেলার দিঘলসিংহা গ্রামের জয়নাল আবেদিনের মেয়ে ও মহেশপুরের ভাটপাড়া গ্রামের আলমগীরের স্ত্রী। এ সময় প্রসূতির পেটে গজ-ব্যান্ডেজ (মফ) রেখে সেলাই করা হয়। প্রসুতি তাহমিনার মা জাহানারা বলেন, ক্লিনিক থেকে বাড়িতে গিয়েও ব্লিডিং বন্ধ না হওয়ায় ঐ কিøনিকে আবার আনলে মিজানুর রহমান ঔষধ দিয়ে পরামর্শ দেন বাড়িতে নিয়ে যান, আস্তে আস্তে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যাবে। এর পর ১ মাস ১৩ দিন পরও রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় গত ২রা সেপ্টম্বর রোববার তাহমিনাকে আবারো ওই ক্লিনিকে নিয়ে যান স্বজনরা।

এ সময় ডা. মিজানুর তাদের কাছ থেকে ফের বন্ড নিয়ে ওই রোগীকে দুইবার জরায়ু ওয়াশ করে দেয়।ওয়াশের সময় রোগীর জরায়ু থেকে রক্তাক্ত মফ বেরিয়ে আসে।এরপর অন্য একটি ক্লিনিকে তাদের আলট্রসোনো করানো হয়।ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা মেডিকেল কলেজের গাইনি কনসালটেন্ট ডা. রবিউল ইসলামের চৌগাছা শহরের চেম্বারে দেখালে তিনি রোগীকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন।সেখানে ৭ সেএপ্টম্বর থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি ছিল।বর্তমানে তার যশোর সদর হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা চলছে।তদন্ত কমিটির নিকট হাসপাতালে স্বাক্ষ্য দিতে এসে তাহমিনা, তার মা জাহানারা বলেন, এখনো তার পুঁজ-রক্ত আসছে।

২০১৬ সালে রেজিষ্ট্রেশন ফেল হওয়া এই ক্লিনিকে ২০১৬ সালে ৭ই অক্টোবর উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের হাফিজুরের স্ত্রী মাফিজা (২৫) নামে এক প্রসূতির সিজার করা হয়।সে সময়ও প্রসূতির পেটে গজ-ব্যান্ডেজ (মফ) রেখে সেলাই করা হয়।

দীর্ঘদিন তার পেটের যন্ত্রনা বন্ধ না হলে স্বজনরা তাকে যশোরের নূর মহল ক্লিনিকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে পেটে মফ রয়েছে বলে জানতে পারেন। পরে সেখানে পুনরায় অপারেশন করে রোগীর পেট থেকে মফ বের করা হয়। বিষয়টি বিভিন্ন পত্রপ্রত্রিকায় প্রকাশিত হলে পল্লবী ক্লিনিকের মালিক মিজানুর রহমান মোটা অংকের টাকা দিয়ে রোগীর স্বজনদের ম্যানেজ করেন।

এর আগে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি উপজেলার খড়িঞ্চা গ্রামের বাসিন্দা ও চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্ত্রী আসমা খাতুন (২৭)কে পল্লবী ক্লিনিকে সিজার করা হয়।সে সময় রোগীর পেটের মধ্যে ব্যান্ডেজের বান্ডিল রেখেই সেলাই করা হয়।পরে

তার অবস্থার অবনতি হলে যশোর কুইন্স হাসপাতালে নিলে সেখানে আল্ট্রাসনো করলে রোগীর পেটে গজের বান্ডিল রয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। রোগিকে বাঁচাতে পুনরায় অপারেশন করে গজের বান্ডিলটি বের করা হয়। আসমা খাতুনের স্বজনরা জানিয়েছেন আর দু’এক দিন অতিবাহিত হলেই রোগীকে বাঁচানো যেতনা বলে জানিয়েছিলেন ডাক্তার। এ ঘটনায় যশোর সিভিল সার্জন বরাবর অভিযোগ করেছিলেন রোগীর স্বজনরা।

এসব বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.সেলিনা জানান, পল্লবী ক্লিনিকের প্যাথলজিষ্টদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন বৈধ কাগজ পত্র নেই।যতদুর জানি তাদের সার্বক্ষণিক কোন এমবিবিএস চিকিৎসকও নেই।

এ কারণে যশোরের সিভিল সার্জন পরিদর্শনে এসে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে এক মাসের মধ্যে বৈধ কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।রেজিষ্ট্রেশন মেয়াদোত্তীর্ণের বিষয়ে তিনি বলেন সরকারীভাবে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইনের মাধ্যমে দেশের সকল ক্লিনিকের রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্নের নির্দেশনা রয়েছে।

 

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/সকাল ১১:৫৩