ব্রেকিং নিউজ
১৪ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১:৪৫

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে গরীবের ঘরেও লুটপাট

 

এম শিমুল খান,গোপালগঞ্জ : গৃহহীন মানুষের জমি আছে, কিন্তু ঘর নেই বা ঘর তৈরীর সামর্থ নেই তাদের সরকারি অর্থায়নে নিজ জমিতে ঘর করে দেয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প সারা দেশের মতো কাশিয়ানী উপজেলায় চলমান রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এমন মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাশিয়ানীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সুবিধা ভোগীদের। অপরদিকে অধিকাংশ সুবিধা ভোগীদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা।

উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তার কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর অধীনে কাশিয়ানী উপজেলায় ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৪৭১টি ঘরের জন্য ৪ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রতিটি ঘরের জন্য ১ লাখ টাকা করে। উপজেলার ৩ ইউনিয়নের প্রতিটিতে গড়ে ১৫৭ টি করে ঘর নির্মাণ করা হবে। কাজের মেয়াদ গত ৩০ শে জুন শেষ হলেও এখনো কোন ইউনিয়নে নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। তবে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৩ জুনের মধ্যে ৪ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা উত্তোলন করে ইউএনও তা নিজের হাতে রেখেছেন। এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কাজ চলছে উপজেলার কুসুমদিয়া ইউনিয়নের এবং কোন কোন সুবিধা ভোগীর কাজ এখন পর্যন্ত শুরুই হয়নি আবার কোনটির মাত্রই শুরু করেছে বা করবেন।

অভিযোগ রয়েছে ঘর পাইয়ে দেয়ার কথা বলে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ও দালাল চক্র, ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে সম্পূর্ণ নীতিমালা, নকশা ও সিডিউল ছাড়া, নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার। একই পরিবারে দু’টি ঘর দেয়া, ব্যবহারের উপযোগী ঘর থাকা সত্ত্বেও ঘর দেয়া, রডের পরিবর্তে জিআই তার ব্যবহার, কাজ সম্পন্ন না করে বিল উত্তোলন, দরিদ্র মানুষের ওপর নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন খরচ চাপিয়ে দেয়া। সব মিলে কাশিয়ানী উপজেলায় আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের অধীনে জমি আছে ঘর নেই তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ প্রকল্পে ঘর নির্মাণে চলছে দূর্নীতির মহোৎসব।

প্রকল্প নীতিমালায় ঘরের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে পিআইসি কমিটি গঠন করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কাজটি করার কথা। প্রকল্পের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সভাপতি ইউএনও, সদস্য সচিব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। কমিটি অন্য সদস্যরা হলেন উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

গত ৩০ জুনের মধ্যে প্ল্যান, ডিজাইন ও প্রাক্কলন মোতাবেক গুনগত মান বজায় রেখে নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অর্ধেক কাজ সম্পন করতে পারেনি। কাজ সম্পাদনের পর কোন অর্থ উদ্বৃত্ত থাকলে তা ৩০ জুন ২০১৮ ইং তারিখের আগে চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এসব কাজের কোনটাই সঠিক নিয়মে করা হয়নি। এতে একটি ঘর নির্মাণে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

১৭ সেপ্টেম্বর উপজেলার কুসুমদিয়া ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ১৭৫ বর্গফুটের ঘরের নির্মাণ কাজ করছেন কাঠ মিস্ত্রী মারুফ মোল্লা, বাদল মোল্লাসহ চার জন তাদের কাছে কাঠের কথা জানতে চাইলে তারা বলেন চম্বল কাঠ দিয়ে ঘরের (আড়া, বাতা, আঠন) কাজ হচ্ছে। কাঠের দরজা-জানালা তৈরিতে উন্নত মানের কাঠ ব্যবহার করার কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে খুবই নিম্নমানের কাঠ। যেখান ব্যবহার করা হয়েছে চম্বল গাছের নিম্নমানের কাঠ। প্রকল্পের নীতিমালায় জানালায় লোহার রড ব্যবহার করার কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাষ্টিকের সিক। টিনে করা হয়েছে অভিনব প্রতারণা। প্রতিটি টিনের গায়ে ঘসে টিনের নাম্বার পরিবর্তন করা হয়েছে ৩০০ এমএম এর পরিবর্তে ৩৬০ এমএম করা হয়েছে। ২ ঘষে তুলে দিয়ে স্থায়ী মার্কার কলম দিয়ে হাতে দিয়ে ৬ লিখে দিয়েছেন। অর্থাৎ ৩২০ মিলির পরিবর্তে ৩৬০ করা হয়েছে।

উন্মুক্ত ক্রয় পদ্ধতিতে ১৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ঘর ও ল্যাট্্িরন নির্মাণে ২১টি পিলার দেয়ার কথা। এর মধ্যে মূল ঘরে ১২টি বারান্দায় ৫টি ও ল্যাট্রিনে ৪টি। ঘরের জন্য (৪ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ৪ ইঞ্চি প্রস্থ) ১৬ বর্গ ইঞ্চির পিলারের উচ্চতা ১২ ফুট বারান্দায় ও ল্যাট্রিনের পিলারের উচ্চতা ১০ ফুট। প্রতিটি পিলার তৈরিতে উন্নত মানের গ্রেডের রড ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে নন গ্রেডের নিম্নমানের রড।

পিলারের উচ্চতা ১২ ফুটের পরিবর্তে ১০ ফুট এবং ১০ ফুটের পরিবর্তে ৮ ফুট করা হয়েছে। তাছাড়া পিলার মেশিনে তৈরি করার কথা থাকলেও হাতে তৈরি হচ্ছে।নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করায় ঘর নির্মাণের আগেই ফাটল ধরেছে। নীতিমালায় ঘরের মেঝেতে বালু বাবদ পাচঁ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেই বালু দিতে হচ্ছে সুবিধা ভোগীদের।

এ বিষয়ে কুসমুদিয়া গ্রামের মিনা বেগম বলেন, বালুর কথা বললে আমাদের বলেন বালু আপনাদের দিতে হবে বালুর জন্য কোন বরাদ্দ নেই। মেঝে বালু ভরাট করতে আমাদের সাড়ে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে।

কুসুমদিয়া গ্রামের নিজামুল কাজী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দকৃত ঘর পেতে আমি মো: সৈয়দ মেম্বারকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। ঘরে যে সব জিনিস ব্যবহার করছে তা দেখার মানুষ নেই। আমরা বললে আমাদের কথার কোন মূল্য দেয় না। তাছাড়া ঘরের কাজ শেষ হওয়ার আগেই মেঝের ইট ধ্বসে গেছে আর আমি নিজের টাকায় মেঝে বালু ভরাট করেছি।

উপজেলার চাপ্তা গ্রামের আশিক শেখ বলেন, বিল্লাল মেম্বার ঘর এনে দেয়ার কথা বলে গত দেড় বছর আগে আমার এবং আমার দুই মামার কাছ থেকে ১২ হাজার করে টাকা নিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদেরকে ঘর এনে দিতে পারেননি। আমি বিষয়টি কাউকে বলতে পারছি না।

কাশিয়ানী সদর ইউনিয়নের পোনা কাদিরপাড়া এলাকার বাসিন্দা নিরালা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার আমাদের ঘর না দিলেই খুশি হতাম। ফ্রি ঘর দেয়ার কথা থাকলেও স্থানীয় মহিন মুন্সীকে ঘর পাইতে ১২ হাজার টাকা দেয়া লাগছে। এছাড়া আমার বাড়ি পর্যন্ত ঘর নির্মাণের মালামাল আনতে এবং ঘরের মধ্যে বালু কিনে ভরাট করতে প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

ঘর দেয়ার জন্য টাকা নেয়ার ব্যাপারে মহিন মুন্সীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না। পরে হিসাব-কিতাম করে বলতে পারবো।উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আলাউদ্দিন অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন, কে বা কারা সুবিধা ভোগীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন তা আমরা অবগত নই।এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এস এম মাঈন উদ্দিন বলেন, মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর দপ্তরের বরাদ্দকৃত ঘর অক্টোবর মাসের মধ্যে হস্তান্তর করবো। আর সঠিক নিয়মে কাজ হচ্ছে।

 

 

 

কিউএনবি/সাজু/১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং/বিকাল ৪:৪৯